চাঁদপুরের ‘বড়স্টেশন মোলহেড’: বিনোদনকেন্দ্র পরিচয়ে চাপা পড়েছে গণহত্যার ইতিহাস

“বড় রেলস্টশন ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধান ক্যাম্প ও নির্যাতন কেন্দ্র। ৭ থেকে ৮টি আলাদা নির্যাতন কক্ষ ছিল ওই ক্যাম্পে।

আল ইমরান শোভনচাঁদপুর প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 March 2024, 03:32 AM
Updated : 22 March 2024, 03:32 AM

একাত্তরে চাঁদপুর ও আশপাশের এলাকায় কোনো বধ্যভূমি তৈরি করতে হয়নি পাকিস্তানি সেনাদের। কেননা পাশেই ছিল পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদী। হাজার হাজার মুক্তিকামী বাঙালিকে ধরে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হতো নদীতেই।

গণহত্যার সেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে তিন নদীর মিলনস্থলে আজও দাঁড়িয়ে আছে ‘বড়স্টেশন মোলহেড’। শহীদদের রক্তমাখা এ স্থানটির পবিত্রতা রক্ষায় তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি; এমনকি নতুন প্রজন্মের অনেকেই এর ইতিহাসও জানে না। স্থানটি এখন পরিণত হয়েছে জেলার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে।

এ স্থানটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ‘রক্তধারা’ নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ করলেও বেশিরভাগ মানুষই এটিকে পর্যটন স্পটের একটি অংশ মনে করেন। জেলার ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রকাশিত বইয়েও স্থানটিকে উল্লেখ করা হয়েছে ‘শ্রেষ্ঠ নৈসর্গিক বিনোদন স্থান’ হিসেবে। নেই একাত্তরে হাজারো মানুষের ‘বধ্যভূমি’ হওয়ার স্মৃতি।

রক্তধারা স্মৃতিস্তম্ভের সামনে কথা হয় কলেজ ছাত্র জাহিদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, “এখানে আসলে, দাঁড়িয়ে ছবি তুলি। আমার জানামতে সব পর্যটন কেন্দ্রেই বিশেষ স্থাপনা কিংবা চত্বর তৈরি করা হয়। সেরকম স্থাপনা ভেবেই সবাই শুধু ছবি তোলে, কেউই মনে হয় সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানে না।” 

স্বপ্নতরু সামাজিক সংগঠনের সভাপতি গিয়াসউদ্দিন বলেন, “এক সময় আমিও মনে করতাম ‘রক্তধারা’ স্মৃতিস্তম্ভটি পর্যটন কেন্দ্রের জন্য তৈরি করা হয়েছে। পরে এটির সম্পর্কে জানতে পারি।

তার অভিযোগ, “স্মৃতিস্তম্ভটির চারপাশ অপরিচ্ছন্ন থাকে। বিশেষ দিবস ঘিরে শুধু বছরে দুই একবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়।” 

নতুন প্রজন্মকে এ স্থানটির ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন করতে বধ্যভূমির ইতিহাস নিয়ে একটি জাদুঘর তৈরির দাবিও জানান তিনি।

গণহত্যার স্মারক ‘রক্তধারা’

চাঁদপুরে পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত ত্রিকোণাকার অংশটিই মোলহেড নামে পরিচিত। এর পাশেই রেলওয়ের ‘বড়স্টেশন মোলহেড’। এই স্থানে গণহত্যার ইতিহাস অবশ্য শত বছরের বেশি পুরানো।

১৯২১ সালে এখানেই ব্রিটিশ শাসকদের হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের শত শত চা শ্রমিক। ১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বড় স্টেশনেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কয়েকটি নির্যাতন কেন্দ্র (টর্চার সেল) স্থাপন করে।

নৌকা-লঞ্চ-স্টিমার ও রেলগাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহনে যারা চাঁদপুরে পৌঁছাতো, সন্দেহ হলে তাদের এবং জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে স্বাধীনতার পক্ষের লোকজন ও নারীদের এসব টর্চার সেলে নিয়ে এসে অমানুষিক নির্যাতন করে হাত-পা বেঁধে জীবন্ত, অর্ধমৃত অথবা হত্যা করে মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর খরস্রোতে ফেলে দিতো।

শহীদদের সেই স্মৃতি রক্ষায় ২০১১ সালে চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বড়স্টেশন মোলহেড এলাকায় নির্মিত হয় ‘রক্তধারা' স্মৃতিস্তম্ভ। 

তৎকালীন জেলা প্রশাসক প্রিয়তোষ সাহার উদ্যোগে এবং চাঁদপুর পৌরসভার তৎকালীন মেয়র নাসির উদ্দিন আহমেদ, চাঁদপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্টজনদের সহযোগিতায় স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তিতে স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মিত হয়। এর নকশা করেছেন চঞ্চল কর্মকার।

বড়স্টেশন ছিল প্রধান ক্যাম্প

চাঁদপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার এম এ ওয়াদুদ বলেন, ব্যাপক হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে মেঘনা তীরের প্রাচীন চাঁদপুর শহরটিকে একাত্তর সালে ‘কসাইখানায়’ পরিণত করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী।

স্থানীয় শান্তি কমিটির সহায়তায় নরপশুরা চাঁদপুর শহর ও শহরতলীতে হত্যা, লুট, নারী নির্যাতন এবং বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।

ওয়াদুদ বলেন, “শহরের পাশেই পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদী থাকায়, স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের হত্যার পর লাশ গুম করতে বা লাশ কেটে মাটি চাপা দিতে কোনো বধ্যভূমি তৈরি করতে হয়নি পাকিস্তানি সেনাদের।

“বহু মুক্তিকামী মানুষকে টর্চার শেষে চোখ ও হাত-পা বেঁধে জীবন্ত অবস্থায় মেঘনা নদীর তীরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। কাউকে কাউকে হাত-পা বেঁধে জীবন্তও নদীতে ফেলে দিত হানাদার বাহিনী।

স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত নারী মুক্তিযোদ্ধা ডা. সৈয়দা বদরুন নাহার চৌধুরী বলেন, “শুধু চাঁদপুর শহর নয়, আশপাশের এলাকা থেকেও মুক্তিকামী মানুষকে ধরে এনে বড়স্টেশন নদী তীরে নির্যাতন করে হত্যা করা হতো।“

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু নঈম পাটওয়ারী দুলাল বলেন, “বড় রেলস্টশন ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধান ক্যাম্প ও নির্যাতন কেন্দ্র। ৭ থেকে ৮টি আলাদা নির্যাতন কক্ষ ছিল ওই ক্যাম্পে। 

“বিভিন্ন স্থান থেকে পাকিস্তানিদের দোসর রাজাকার-আল বদররা বাঙালিদের ধরে নিয়ে যেত আশপাশের ক্যাম্পে। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের পর মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক চিহ্নিত হলে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হত বড়স্টেশন টর্চারিং সেলে।”

লাশ ভাসাত ডোম দিয়ে

জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার এম এ ওয়াদুদ বলেন, ১৯৭১ সালের ৮ এপ্রিল তৎকালীন কুমিল্লা জেলার চাঁদপুর মহকুমা পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর পাকিস্তানি কসাই বলে পরিচিত মেজর ইফতেখারের নেতৃত্বে কুমিল্লা থেকে চাঁদপুর আসে পাকিস্থানি বাহিনী। ৯৬টি সাঁজোয়া যানের বিরাট বহর চাঁদপুর শহরে প্রবেশ করে মেজর ইফতেখার ও সেনাদল প্রথমেই চাঁদপুর টেকনিক্যাল স্কুলে ঘাঁটি করে।

সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই তারা চাঁদপুর রেলস্টেশনের (বড়স্টেশন) অফিস সমূহ, রেলওয়ে গেস্ট হাউস, নূরিয়া হাইস্কুল, আক্কাস আলী হাইস্কুল, বে শিপিং কর্পোরেশন, ওয়াপদা রেস্ট হাউস, পুরানবাজারের পুলিশ ফাঁড়ি এবং পৌরসভার দাতব্য চিকিৎসালয়ে তাদের ক্যাম্প স্থাপন করে। প্রতিটি ক্যাম্পের পাশেই ছিল একটি করে নির্যাতন কক্ষ।

“বড়স্টেশন টর্চার সেলের দায়িত্বে ছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর মেজর শওকত। তিনি চাঁদপুরবাসীর কাছে এখনও ‘জল্লাদ শওকত’ হিসেবে পরিচিত। সেখানে প্রতিদিন হিন্দু-মুসলিম নারীদের ধরে এনে ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হত। ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে লাশ লোহার তার দিয়ে গেঁথে নদীবক্ষে ফেলে দেয়া হতো, যাতে লাশ ভেসে না উঠে।” ওয়াদুদ যোগ করেন।

'চাঁদপুর পরিক্রমা : ইতিহাস ও ঐতিহ্য' নামের বই থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখানে পুরানবাজার হরিজন কলোনির কালা ডোম, ছুনুয়া ডোম, ভোলানাথ ডোম ও গয়াপ্রসাদ ডোমকে দিয়ে লাশ নদীতে ভাসানো এবং রক্ত ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করানো হতো।

ঐতিহাসিক স্থানটির রক্ষায় চাই উদ্যোগ

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বড়স্টেশন মোলহেড স্থানটি রক্ষায় দ্রুত উদ্যোগ চান সচেতন নাগরিকরা। তাদেরই একজন চাঁদপুর সরকারি কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফ হোসেন।

আরিফ বলেন, “দীর্ঘদিন আগেই রক্তধারা স্তম্ভটি তৈরি করা হয়েছে। তবে এটি আসলে কিসের জন্য তৈরি করা হয়েছে, মূলত আমিও জানতাম না। পরে এর সম্পর্কে পড়াশুনা করে জানতে পারি। কিন্তু সবাই তো তা পারছে না। তাই বড়স্টেশন বধ্যভূমি নিয়ে যদি এখানে একটি জাদুঘর কিংবা স্মৃতি সংরক্ষণ কক্ষ করা যায়, তাহলে সবাই খুব সহজে জানতে পারবেন।“

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চাঁদপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রহিম বাদশা বলেন, “চাঁদপুরের বড়স্টেশন এলাকা নিয়ে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের অনেকেই জানে না। এমন কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার, যাতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এই বধ্যভূমির ইতিহাস জানতে পারে।”

চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি শাহাদাত হোসেন শান্ত বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের বধ্যভূমির স্মৃতিকে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যই রক্তধারা স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু যারা ঘুরতে আসে তারা সবাই তিন নদীর সংযোগস্থলকে মুখ্য মনে করে আসে। এতে প্রকৃত ইতিহাস আড়াল হয়ে যায়। 

“এজন্য রক্তধারার পাশে একটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি যাদুঘর তৈরি করা যেতে পারে। যাতে মুক্তিযুদ্ধের চিত্র প্রদর্শনী থাকবে এবং বিভিন্ন সময়ে সভা সেমিনারেরও আয়োজন করা যাবে।”

আরও পড়ুন:

Also Read: মুক্তিযুদ্ধে নড়িয়া-পালং: গ্রামের পথে পথে পড়েছিল মৃতদেহ

Also Read: ১৯৭১: ৫৩ বছর ধরে শরীরে গুলি বইছেন রাশিদা

পাকিস্তানিদের আতঙ্ক হয়ে উঠেছিল ‘পলাশডাঙ্গা যুব শিবির’

মুক্তিযুদ্ধে আতাইকুলা: চোখের সামনে স্বামী-সন্তানকে হত্যা, শোকগ্রস্ত নারীদের ধর্ষণ

টাঙ্গাইলে মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর: যেখানে ‘ইতিহাস কথা কয়’ 

মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিতে আদমজীর ‘যমঘর’

‘ময়না প্রতিরোধ যুদ্ধের’ পর পুরো নাটোর হয়ে ওঠে ‘বধ্যভূমি’

শূন্যরেখা ঘেঁষা নাকুগাঁও বধ্যভূমি, বিলীনের পথে গণহত্যার স্মৃতি

বিলোনিয়া যুদ্ধ: ইতিহাস ‘জানে না’ শিক্ষার্থীরা, নেই উদ্যোগও

১৯৭১: বহলায় একসঙ্গে ৪২ জনকে হত্যা করে হানাদাররা

১৯৭১: কাইয়ার গুদামে হত্যার পর লাশ ফেলা হত কুশিয়ারায়

বাবুর পুকুর গণহত্যা: মেলেনি স্বীকৃতি-ভাতা, ভেঙে পড়ছে স্মৃতিস্তম্ভ

‘সদ্য বাবা হলে যে আনন্দ, বিজয়ের খবর ছিল তার চেয়েও আনন্দের’

রাজাকারে ধরে নেয় দুই ভাইকে, তাড়নায় যুদ্ধে যান ১৩ বছরের স্বপন

১৯৭১: তীর-ধুনক নিয়েই রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও

১৯৭১: পানপট্টির সম্মুখ যুদ্ধে মুক্ত হয়েছিল পটুয়াখালী

জরাজীর্ণ গ্রন্থাগার-জাদুঘর, বীরশ্রেষ্ঠকে ‘স্মরণ’ কেবল মৃত্যুদিনে

একাত্তরে বরগুনা কারাগার হয়ে ওঠে গণহত্যা কেন্দ্র

কুমার নদে গাড়াগঞ্জ যুদ্ধ: ফাঁদে ফেলে হত্যা করা হয় ৮০ হানাদারকে

৬৩ জনের গণকবর লুপ্ত, স্মৃতি বলতে ‘মানকচু’

মুক্তিযুদ্ধে ডাকরায় ছয় শতাধিক হিন্দুকে হত্যার স্মৃতি তাড়া করে আজও