আশ্রয়কেন্দ্র নয়, আত্মীয় বাড়ি ছুটছে আতঙ্কিত সীমান্তবাসী

জেলা প্রশাসক বলেন, “তুমব্রু বা আশপাশে ২৪০টির মত পরিবার রয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, এরই মধ্যে দেড়শর মত পরিবার আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি চলে গেছেন।”

বান্দরবান প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 6 Feb 2024, 03:32 PM
Updated : 6 Feb 2024, 03:32 PM

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনা ও বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যে সীমান্তবর্তী লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে মাইকিং করা হলেও তারা একটু দূরে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতেই ছুটছেন বলে জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।

কয়েকদিনের ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার সকালে উখিয়ার পালংখালী সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর শতাধিক সদস্য প্রবেশ করে এবং গোলার আঘাতে কয়েকজন আহতও হয়। এতে গোটা সীমান্তজুড়েই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

এই অবস্থায় ঘুমধুম ইউনিয়নের একেবারে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে মাইকিং শুরু করে প্রশাসন। আশ্রয়কেন্দ্র খোলার পাশাপাশি বাসিন্দাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়। এর মধ্যেই বিকালে সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনে যান জেলা প্রশাসক শাহ মোজাহিদ উদ্দিন এবং পুলিশ সুপার সৈকত শাহীন।   

সোমবার ইউনিয়নের জলপাইতলী গ্রামে মর্টার শেলের আঘাতে নারীসহ দুজন নিহত হলেও মঙ্গলবার এদিকের সীমান্তের পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত ছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

ঘুমধুম ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, উত্তর ঘুমধুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আশ্রয়কেন্দ্রে হিসেবে ব্যবহার করতে বলেছে প্রশাসন। এই স্কুলে ২৫০ পরিবারকে রাখার টার্গেট করা হয়েছে। সেখানে যদি জায়গা না হয় আরেকটা স্কুল কচুবনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কেও আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার জন্য বলা হয়েছে।

“কিন্তু মানুষজন তো যাচ্ছে না। ১০ পরিবারও যাবে বলে মনে হয় না। যার যার আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতেই বেশি যাচ্ছে দেখলাম। আমার এলাকা থেকে কিছু গেছে শুনলাম, তবে নিশ্চিত না। চেয়ারম্যানও ফোন করে বলেছেন, এলাকাবাসীদের নিরাপত্তার জন্য আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে থাকতে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে আগ্রহী না।”

যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে কেন যেতে চাইছে না- জানতে চাইলে স্থানীয় এই জনপ্রতিনিধি বলেন, “এখন শীতকাল। ঠান্ডার মধ্যে কাপড়-চোপড়ের বিষয় আছে। যার যার পরিবারে শিশু-বাচ্চা আছে। হুট করে একটা জায়গায় গিয়ে কেউ গাদাগাদি করে থাকতে চায় না।

“এ কারণে স্থানীয় লোকজন কক্সবাজার উখিয়া, কুতুপালং যার যেখানে আত্মীয়-স্বজন আছে সেদিকেই ছুটছে। তারপরও আমরা প্রশাসনের নির্দেশে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার কথা বলেছি।”

জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সফরের কথা উল্লেখ করে আনোয়ারুল ইসলাম জানান, সোমবার সীমান্তের ওপার থেকে আসা মর্টারের আঘাতে যিনি মারা গেছেন তার পরিবারকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

“আজকে ঘুমধুম এলাকা অন্যান্য দিনের তুলনায় মোটামুটি শান্ত ছিল। এখন পালংখালী এলাকার দিকে বেশি গোলাগুলি চলছে শুনলাম।”

তবে ইউনিয়নের অন্য এলাকা থেকে কিছু পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে গেছে বলে জানিয়েছেন আরেক জনপ্রতিনিধি।

৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আলম বলেন, “আমার এলাকা এবং ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ২০টি পরিবারের মত গেছে শুনলাম। গতকাল গোলার আঘাতে দুজন মানুষ মারা যাওয়ায় বেশি আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। মানুষের মধ্যে ভয় ঢুকে গেছে। আবার সীমান্তের ওপারে বিমান হামলা হয় কি-না এই আতঙ্ক আছে।

“আজকে ডিসি, এসপি পরিদর্শনে এসে বলে গেছেন, আশ্রয়কেন্দ্রে যারা যাবেন তাদের জন্য থাকা-খাওয়া যাবতীয় বিষয় যা লাগে তাদের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। আজকে পরিস্থিতি শান্ত ছিল বলা যায়। মাঝে মধ্যে গোলাগুলির শব্দ শোনা গেলেও আমাদের এলাকা থেকে অনেক দূরে। তবুও আবার কখন কী হয় ঠিক নাই।”

ধুমধুম বেতবুনিয়া বাজার এলাকার বাসিন্দা জামাল মিস্ত্রি বলেন, “ঘুমধুম এলাকা হলেও আমরা সীমান্ত এলাকা থেকে সামান্য দূরে। তারপরও গোলাগুলি হলে স্পষ্ট শব্দ শুনা যায়। আমাদের পরিচিত মানুষজনও আশ্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে শুনলাম।”

দুপুরে প্রায় একই ধরেনর কথা বলেছিলেন ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের (৪, ৫, ৬) সদস্য খালেদা বেগম বলেন, “সোমবার থেকে স্থানীয় লোকজন কক্সবাজার ও ঘুমধুম এলাকায় যার যার আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। এখন ঘরে ঘরে দুয়েকজন করে পুরুষ আছেন।”

বিকালে ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের সামনে জেলা প্রশাসক শাহ মোজাহিদ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, “তুমব্রু বা আশপাশে ২৪০টির মত পরিবার রয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, এরই মধ্যে দেড়শর মত পরিবার আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি চলে গেছেন। বাকি যারা আছেন তারাও যেন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান।

“জলপাইতলীর ৪০ থেকে ৪৫টি পরিবারের সন্ধান আমরা পেয়েছি। সেখান থেকে ৩০ থেকে ৩৫টি পরিবার এরই মধ্যে সরে গেছে এমনটা নিশ্চিত হয়েছি। বাকি যারা আছেন তারা যেন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। আমাদের আশ্রয়কেন্দ্রও খোলা আছে।”

আরও পড়ুন:

Also Read: মিয়ানমারে যুদ্ধ: সীমান্তের বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ