মিয়ানমারে যুদ্ধ: রাখাইনের যে খবর পাচ্ছেন ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা

“যে খবরাখবর পাচ্ছি তাতে, রাখাইনের পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। সেখানে আরাকান আর্মি ও সেনাবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে।”

শংকর বড়ুয়া রুমি, কক্সবাজার প্রতিনিধিজসীম মাহমুদ, টেকনাফ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 Jan 2024, 06:26 PM
Updated : 30 Jan 2024, 06:26 PM

মিয়ানমারের বিভিন্ন রাজ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনীর ভয়াবহ লড়াইয়ের খবর রাখাইন রাজ্যের স্বজনদের মাধ্যমে পাচ্ছেন এপারের কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা।

স্বজনদের নিয়ে তাদের মধ্যে কাজ করছে ভয়। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যোগযোগের সমস্যার কারণে অনেকে আবার সঠিক খবরও পাচ্ছেন না।

যেটুকু খবর মিলছে, তাতে রাখাইনের পরিস্থিতি খুব নাজুক চেহারা পেয়েছে বলে ক্যাম্পবাসী রোহিঙ্গাদের ধারণা। সেখানে লড়াইয়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের বসতিতে নিয়মিত অগ্নিসংযোগও করা হচ্ছে।

আরাকান আর্মির সদস্যরা রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে আশ্রয় নিয়েছে এমন সন্দেহ থেকে হেলিকপ্টারে অনবরত গুলিবর্ষণ করা হচ্ছে। তাতে অনেকে হতাহত হচ্ছেন; কিন্তু চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। প্রাণ বাঁচাতে অনেকে বাড়িঘরও ছেড়েছেন।

সংঘাতের মধ্যে রাখাইন রাজ্যে মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অনুপ্রবেশ রোধে এরই মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থা নিয়েছে বিজিবি। ক্যাম্পের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বেড়েছে। 

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বসবাস করা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বলে মনে করছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মঙ্গলবার বিকালে বলেন, “আমরা বিভিন্ন সূত্র, অসমর্থিত মাধ্যম থেকে যে খবরাখবর পাচ্ছি তাতে, রাখাইনের পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। সেখানে আরাকান আর্মি ও সেনাবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে।

“এখানে যারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আছেন, তাদের স্বজনরা সেখানে রয়েছেন। ফলে সেখানকার যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া এখানে পড়বে, এটাই তো স্বাভাবিক।”

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে মিয়ানমারের ক্ষমতা নেয় দেশটির সেনাবাহিনী। এরপর থেকেই জান্তাবিরোধী বিভিন্ন বিদ্রোহী ও সশস্ত্র জাতিগত গোষ্ঠী মিয়ানমারের উত্তর, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তর–পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে লাগাতার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরের শেষ দিক থেকে মিয়ানমারের তিনটি জাতিগত বিদ্রোহী বাহিনী একজোট হয়ে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণ শুরু করে। বাহিনীগুলো হল- তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি-টিএনএলএ, আরাকান আর্মি-এএ এবং মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি-এমএনডিএএ।

তারা শান, রাখাইন, চীন ও কেয়াহ রাজ্যে লড়াই চালাচ্ছে। বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও সেনাপোস্ট দখল করে ইতোমধ্যে তারা সাফল্য দেখিয়েছে।

আরাকান আর্মি (এএ) এই জোটের অন্যতম অংশ। মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনের সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর একটি সশস্ত্র বাহিনী এটি। তারা রাখাইনের বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই করছে।

মিয়ানমারের প্রায় ৬০০ সেনা মিজোরামের লঙ্গটলাই জেলায় আসাম রাইফেলসের শিবিরে আশ্রয় নিয়ে আছে। মিয়ানমারের বিদ্রোহী আরাকান আর্মির (এএ) যোদ্ধারা সেনাবাহিনীর শিবির দখল করার পর এসব সেনা ভারতে পালিয়ে যায়।

রাখাইনে সেনা ও বিদ্রোহীদের মধ্যে লড়াইয়ের প্রভাব পড়ছে সীমান্তের এপারের জনগোষ্ঠীর মধ্যেও। শনিবার সংঘর্ষের খবরের মধ্যে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের উলুবনিয়া এলাকার নুরুল ইসলামের বাড়িতে একটি গুলি এসে পড়লে আতঙ্ক তৈরি হয়।

স্থানীয়রা বলছেন, টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উলুবনিয়া, তুলাতুলি ও কাঞ্জরপাড়া সীমান্ত, উখিয়া উপজেলার পালংখালির আনজুমান পাড়া এবং নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা তুমব্রু ও ঘুমধুম এলাকায় বেশি গোলাগুলির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।   

গোলাগুলির ঘটনায় আতঙ্কে সোমবার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম এলাকায় কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘ছুটি’ দিয়ে দেওয়া হয়। তবে মঙ্গলবার স্কুলগুলো ফের খুলেছে বলে জানান নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ত্রিরতন চাকমা।

২০২২ সালের অগাস্টের শেষ ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে মিয়ানমারের যুদ্ধবিমান ও ফাইটিং হেলিকপ্টার থেকে বাংলাদেশের সীমানার ভেতর গোলাবর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল। অনেক মানুষ আতঙ্কে সীমান্ত ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছিল। তখন দেশটির রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে এর প্রতিবাদ, নিন্দা ও উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল ঢাকা।

এবারও লাগাতার সংঘর্ষের মধ্যে ‘সর্বোচ্চ সতর্ক’ থাকার নির্দেশ দিয়েছে বিজিবি। সম্প্রতি বিজিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সম্প্রতি পুরো মিয়ানমারে সংঘাতময় পরিস্থিতি চলছে। যার প্রভাব বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যেও এসে পড়েছে। প্রতিনিয়ত সেখানকার অস্থিতিশীল অবস্থা ও সংঘাতময় পরিস্থিতির খবর পাওয়া যাচ্ছে।”

রাখাইনে গ্রামে-গ্রামে অগ্নিসংযোগ, অবরুদ্ধ দশা

মঙ্গলবার টেকনাফ ও উখিয়া বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসকারী অন্তত ১০ জন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে লড়াইয়ের মধ্যে অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। সে কারণে অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে যাচ্ছেন। কিন্তু অধিকাংশই কোথাও যেতে পারছেন না। তারা কার্যত অবরুদ্ধ দশায় পড়েছেন।

টেকনাফের জাদিমুরা ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের উপ-কমিউনিটি নেতা (সাব-মাঝি) মোহাম্মদ আয়াজ বলেন, “আগে বার্মার মানুষের খোঁজ-খবর নিতাম। বার্মার মানুষ সরাসরি গুলি মারছে মুসলমান পাড়ায়। এক পাড়া থেকে অন্যপাড়ায় পালিয়ে যাচ্ছে… মানুষগুলো খুব অসুবিধায়। রাস্তাঘাটে বা কোথাও বের হতে পারছে না। খুব অসুবিধায় আছে। খেতে পারছে কি-না জানি না।

“তারা বাংলাদেশে আসবে কি-না জানি না। তারা কোনোদিকে বের হতে পারছে না। সেখানে বার্মার সরকার আছে।”

২০১৭ সাল থেকে পরিবার নিয়ে টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস মোহাম্মদ আলম।

তিনি বলেন, “কয়েক দিন ধরে ওই রাজ্যের একাধিক গ্রামে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে জান্তা সরকারের সেনারা। সশস্ত্র বিদ্রোহীদের কাছ থেকে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিতে অনেক গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে অনেক রোহিঙ্গার হতাহতের খবর আসছে আমাদের কাছে।”

তবে নেটওয়ার্ক না পাওয়ায় ঠিকমত যোগাযোগও রাখতে পারছেন না বলে জানান মোহাম্মদ আলম।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি পিস ফর হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, “মিয়ানমার অভ্যন্তরে অব্যাহত সংঘর্ষে সেখানকার বেশকিছু রোহিঙ্গা বসতি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। আরাকানে বসবাসকারি রোহিঙ্গাদের দেওয়া তথ্য মতে, এরই মধ্যে কয়েক শত রোহিঙ্গা হতাহত হয়েছেন। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ছোড়া গুলি ও গোলাবর্ষণে কয়েকটি গ্রামের বসতি সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে।

“অনেকে নিজের গ্রামে বন্দি অবস্থায় রয়েছেন। এতে খাদ্যসহ জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণেরও সংকট দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তাদের (রোহিঙ্গা) নিজ এলাকা ছাড়া কোথাও যাতায়ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

আরাকানে এখনও পাঁচ থেকে ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে জানিয়ে মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আশ্রিত আত্মীয়-স্বজনরা চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছে। অথচ তারা কোনো খবর পাচ্ছেন না।

লেদা শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ হারেস বলেন, “রাখাইনে ব্যাপক যুদ্ধ চলছে। অনেকে সেখান থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলোতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। খাবার ও চিকিৎসার নাকি খুব সংকটে রয়েছেন।”

কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা নুরুল আমিন বলেন, তার ছোট ভাই মিয়ানমারের গুদুছড়া এলাকায় বসবাস করেন। ভাই তাকে বলেছেন, জান্তা সেনারা তাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। অনেকে মারা গেছেন। কেউ কেউ আহত হয়েছেন।

“দিনে ভয়ে কেউ বাড়ি থাকার সাহস করছেন না। পাহাড়ে লুকিয়ে থাকছে। সুবিধাজনক সময়ে বাড়ি গিয়ে সামান্য খাবার-কাপড় নিয়ে আবার পাহাড়ে লুকিয়ে থাকছে। এভাবেই তাদের দিন কাটছে।”

আহতদের চিকিৎসায় সংকট

লড়াইয়ের মধ্যে অনেকে আহত হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকা, পর্যাপ্ত চিকিৎসাকেন্দ্র না থাকায় চিকিৎসা নিতে পারছেন না বলেও রোহিঙ্গারা জানাচ্ছেন।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি পিস ফর হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়ের জানান, লড়াই শুরুর পর থেকে তিনি রাখাইনের অনেক রোহিঙ্গা ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেছেন। 

“তারা বলছে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় হতাহতদের অনেকে চিকিৎসা নিতে পারছেন না।”

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “আমি যতটুকু জানি, মিয়ানমারে আরও পাঁচ থেকে ছয় লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। বিশেষ করে মংডু, বুচিডং এসব অঞ্চলে বেশি। বুচিডং এলাকায় রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে যুদ্ধ হয়েছে।

“বিশেষ করে বোমা বর্ষণের কারণে হতাহত হয়েছে। সঠিক সংবাদ না পেলেও আমরা শুনেছি যে, বুচিডংয়ের টাউনশিপ হাসপাতালে জায়গা হচ্ছে না আহত-নিহতদের কারণে।”

উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১০ এর শরণার্থী মোহাম্মদ মুছা বলেন, রাখাইন রাজ্যের বুচিডং অঞ্চলে বেশ কিছুদিন ধরে মুসলমানদের পাড়ায় পাড়ায় ব্যাপক আক্রমণ হচ্ছে বলে তাদের কাছে খবর আসছে।

“ওই অঞ্চলে আমার অনেক আত্মীয়-স্বজন আছে। তাদের কাছ থেকে নিয়মিত তথ্য পাই। তারা আমাদের জানাচ্ছে, মুসলিম গ্রামগুলোতে প্রতিপক্ষ যোদ্ধারা আশ্রয় নিচ্ছেন এই অভিযোগে মিয়ানমার সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার নিয়ে আক্রমণ করছে।

“হেলিকপ্টার নিয়ে অগ্নেয়াস্ত্র, বিভিন্ন ধরনের বোমা ও গ্রেনেডসহ নানা ধরনের মারাত্মক মরণাস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে। এতে অনেক মানুষের অঙ্গ উড়ে যাচ্ছে। আবার অনেকের শরীর ঝাঁজরা হয়ে করুণ মৃত্যু হচ্ছে। আবার যারা আহত হয়ে বেঁচে আছেন তারাও হাসপাতালে জায়গা না থাকায় চিকিৎসা নিতে পারছেন না। এভাবে চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে বলে আমরা শুনতে পাচ্ছি।”

যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন

এ সপ্তাহের শুরুতেও রাখাইনে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে যোগাযোগ করতে পারতেন কক্সবাজারের ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গারা। কিন্তু দু-তিন ধরে সেভাবে আর যোগাযোগ হচ্ছে না বলে জানালেন তারা।

টেকনাফের জাদিমুরা ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সাব-মাঝি মোহাম্মদ আয়াজ বলেন, “এখন নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়েছে। কারো বিদেশেও খবর নেওয়ার নেই, বাংলাদেশেও খবর নিতে পারছে না।”

টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম, “একসময় অবৈধ সিম ব্যবহার করে কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদের খোঁজ নিতেন। এখন ওখানে সিম ব্যবহার করা একেবারে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। অন্য দেশের সিম ধরা পড়লে বড় অঙ্কের জরিমানা করা হচ্ছে।”

“এ অবস্থায় সেখানে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। সবাই খুব চিন্তার মধ্যে আছে।”

আরাকানের বেশির ভাগ জায়গায় মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় সঠিক সময়ে সেখানকার খোঁজ-খবর নেওয়া যাচ্ছে না বলে জানান এআরএসপিএইচর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়েরও।

সতর্ক প্রশাসন

বিজিবি কক্সবাজার-৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মি এবং দেশটির সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত মিয়ানমার দিক থেকে ছুড়া বেশ কিছু মর্টার শেল ও গুলি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে পড়েছে। এতে সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছে।”

তবে এ নিয়ে বিজিবির সদস্যরা পুরো সীমান্ত এলাকাজুড়ে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নতুন করে কোনো রোহিঙ্গার যাতে অনুপ্রবেশ না ঘটে এ ব্যাপারে বিজিবি সতর্ক রয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তের পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হচ্ছে।”

যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবির প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানান সাইফুল ইসলাম চৌধুরী।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক (এডিআইজি) মো. আমির জাফর বলেন, “এপিবিএন মূলত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছে। ক্যাম্পের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা দেখভাল করাই তাদের মূল কাজ।

“উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশকারী কোনো রোহিঙ্গা যাতে প্রবেশ করতে না পারে এ ব্যাপারে এপিবিএন সতর্ক রয়েছে। এরই মধ্যে ক্যাম্পের প্রবেশ পথগুলোতে কড়া নজরদারি নেওয়া হয়েছে।”

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনুপ্রবেশ ঠেকানোর বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবানের পুলিশ সুপার সৈকত শাহীন বলেন, “অনুপ্রবেশের বিষয়ট মূলত দেখে থাকে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি। তারা সেটি করছেন। আমরাও এলাকায় এলাকায় মানুষকে সতর্ক থাকতে বলেছি। পাশাপাশি আমাদের গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।”

প্রত্যাবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা

প্রত্যাবাসনের আলোচনার মধ্যেই ২০২৩ সালের মে মাসে রাখাইনের পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখতে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের নেতৃত্বে রোহিঙ্গাদের ২০ সদস্যের একটি দল মিয়ানমার গিয়েছিল।

তারা ফিরে এসে জানিয়েছিলেন, সেখানে যে গ্রাম তারা রেখে এসেছিলেন, সেসব কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। সবকিছু পাল্টে গেছে। সেখানে সারিবদ্ধ ক্যাম্প তৈরি হয়েছে। সেখানকার রোহিঙ্গারা এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করেন।

এখনকার পরিস্থিতিতে সেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনেকটাই ঝুঁকির মধ্যেই পড়ল বলেও মনে করছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

তিনি বলেন, “যেটা জানতে পারছি, সেখানের অবস্থা ভালো না। যুদ্ধ চলছে। আরাকান আর্মি শহর দখল করছে, এলাকা দখল করছে- সেটি আমরা শুনতে পারছি। আমরা তো চাই এই যুদ্ধ থেমে যাক। কারণ এখানকার এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে এই লড়াই বা যুদ্ধ অন্তরায়। প্রত্যাবাসনের শর্তেই বলা আছে, সেখানকার পরিস্থিতি শান্ত ও নিরাপদ থাকতে হবে।”

কমিশনার বলেন, “এই অবস্থায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ধীর লয়ে হলেও যে আলোচনা চলছিল সেটি বিঘ্নিত হতে পারে। ফলে যুদ্ধের খবর আমাদের এখান থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে দুঃসংবাদ।

“মিয়ানমারের সঙ্গে যে আলোচনা চলছিল সেটির একটি ছন্দপতন হবে। তারপরও আমরা চাইব, দ্রুতই যুদ্ধ থেমে যাক এবং মিয়ানমার তাদের দেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিক।”

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন এআরএসপিএইচ এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের।

তিনি বলেন, “স্বদেশে ফেরা বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি আরাকানকে রোহিঙ্গা শূন্য করতে রোহিঙ্গা বসতিতে হামলা চালাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। যাতে আরাকান রাজ্য দ্রুত রোহিঙ্গা শূন্য হয়ে পড়ে।”

[এ প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বান্দরবান প্রতিনিধি উসিথোয়াই মারমা এবং জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাফর আহমেদ।]

আরও পড়ুন:

Also Read: মিয়ানমারের গুলি এসে ভেদ করল টেকনাফের বাড়ির দরজা

Also Read: মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে ফের গোলাগুলি, এপারে আতঙ্ক

Also Read: সীমান্তে ‘সর্বোচ্চ সতর্ক’ থাকার নির্দেশ বিজিবি মহাপরিচালকের

Also Read: মিয়ানমার সীমান্তে লাগাতার গোলাগুলি, নাইক্ষ্যংছড়ির ৫ স্কুলে ‘ছুটি’

Also Read: বিদ্রোহী জোটের হামলায় বহু এলাকা হাতছাড়া, কোণঠাসা মিয়ানমার জান্তা

Also Read: মিয়ানমারে পেরে উঠছে না জান্তা বাহিনী, সমর্থন হারাচ্ছেন মিন অং হ্লাইং

Also Read: ভারতে পালাচ্ছে মিয়ানমারের সেনারা, উদ্বিগ্ন মিজোরাম

Also Read: প্রত্যাবাসন: রাখাইন ঘুরে ‘উন্নতি’ দেখেছে আরআরআরসি, রোহিঙ্গারা হতাশ

Also Read: জরুরি অবস্থার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা মিয়ানমার জান্তা সরকারের