মিয়ানমারে যুদ্ধ: সীমান্তের বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ
কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের এক লাখের বেশি মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
মিয়ানমারে যুদ্ধের জেরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হতাহতের ঘটনা এবং আতঙ্কের প্রেক্ষাপটে সীমান্তবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলা প্রশাসন।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহিন ইমরান এবং বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ মুজাহিদ উদ্দিন বলেছেন, ইতোমধ্যে তারা সংশ্লিষ্ট উপজেলার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন।
বান্দরবন জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়ন, কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়ন ও টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের সীমান্তের ওপারে মঙ্গলবারও থেমে থেমে গোলাগুলি চলছে।
দুই জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত সংলগ্ন ওইসব এলাকায় এক লাখের বেশি বাসিন্দা এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আপাতত নিরাপদ দূরত্বে স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টারে তাদের রাখা হবে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহিন ইমরান বলেন, “মিয়ানমারে সংঘাত বেড়েছে। সেখান থেকে ছোড়া গুলি, মর্টার শেল এসে সীমান্তের এপারে বাড়িঘরে পড়ছে। এর প্রেক্ষিতে সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার নিদের্শনা রয়েছে।”
উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে নিদের্শনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে মঙ্গলবার বেলা ২টা পর্যন্ত কাউকে সরানো হয়নি জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, “পরিস্থিতি বিবেচনা করে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।”
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ মুজাহিদ উদ্দিন বলেন, “সীমান্ত পরিস্থিতি উত্তেজনাকর। প্রাথমিক অবস্থায় ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্তের বাসিন্দাদের নিরাপদে আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা কাজ করছেন।”
তিনি বলেন, উত্তর ঘুমধুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। লোকজনকে আনতে স্থানীয় চেয়ারম্যান সহযোগিতা করছেন।
ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের (৪, ৫, ৬) সদস্য খালেদা বেগম বলেন, “সোমবার থেকে স্থানীয় লোকজন কক্সবাজার ও ঘুমধুম এলাকায় যার যার আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। এখন ঘরে ঘরে দুয়েকজন করে পুরুষ আছেন।
“যারা বাড়িতে আছেন তারাও বাইরে বের হচ্ছেন না। বাজারের দোকান-পাট বন্ধ। রাস্তায় আগের মত লোকজনের চলাচল নেই। আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে শুনেছি। কিন্তু কোথায় কোন প্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র করা হয়েছে আমি জানি না। তবে লোকজন আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি যাচ্ছে বেশি।”
ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের সচিব এরশাদ উল্লাহ হক সাংবাদিকদের বলেন, “সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলি থেমে নেই। ঘুমধুম ইউনিয়নের একেবারে সীমান্তঘেঁষা বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হচ্ছে। সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলো হল তুমব্রু কোণারপাড়া, তুমব্রু মাঝেরপাড়া, ভাজাবনিয়া পাড়া, তুমব্রু বাজারপাড়া, চাকমা হেডম্যান পাড়া, তুমব্রু পশ্চিমকূল পাড়া, ঘুমধুম নয়াপড়া, ঘুমধুম পূর্বপাড়া ও ঘুমধুম মধ্যমপাড়া।
মূলত এসব পাড়ার বাসিন্দাদের মাইকিং করে সরে যেতে বলা হচ্ছে। এসব পাড়ায় আনুমানিক ২০০ পরিবার রয়েছে বলে জানান তিনি।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইনে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র বিদ্রোহী আরাকান আর্মির যুদ্ধ চলছে গত কয়েকদিন ধরেই। এর প্রভাব পড়ছে সীমান্তের এপারের জনগোষ্ঠীর মধ্যেও।
ওপারের যুদ্ধের গুলি ও মর্টার শেল এপারে এসে পড়ায় তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে থাকছেন।
সোমবার দুপুরে মিয়ানমার থেকে আসা গোলায় বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের জলপাইতলী এলাকায় নারীসহ দুজন নিহত হন।
ঘুমধুম ইউনিয়নের মধ্যমপাড়ায় মঙ্গলবার সকালেও একটি মর্টার শেল এসে পড়ে এক বাড়ির উঠানে। তবে সেখানে কেউ হতাহত হননি।
এদিকে মিয়ানমারে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সংখ্যা বাড়ছেই।
শনিবার রাতে বিদ্রোহীরা বিজিপির একটি ফাঁড়ি দখল করে নিলে রোববার সকালে পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ১৪ সদস্য। এরপর তিন দিনে সেই সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ২৬৪ জনে পৌঁছেছে।
তাদের মধ্যে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি), সেনাবাহিনী, ইমিগ্রেশন সদস্য, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা রয়েছেন। তাদের নিরস্ত্র করে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি।
বাংলাদেশ সরকার বলে আসছে, মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর এই সদস্যদের ফেরত পাঠানোর জন্য আলোচনা চলছে। তবে কীভাবে সেটা করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
স্থানীয়রা বলছেন, এখনও তারা গোলাগুলি ও মর্টার শেলের আওয়াজ শুনতে পারছেন। সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে গুলি হচ্ছে; আবার বিদ্রোহীরাও পাল্টা গুলি চালাচ্ছে।
এ পরিস্থিতির মধ্যে বেশ কিছু চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের মানুষের মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখায় জড়ো হওয়ার তথ্য দিয়েছেন এপারে থাকা তাদের স্বজনরা।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে মিয়ানমারের ক্ষমতা নেয় দেশটির সেনাবাহিনী। ২০২৩ সালের অক্টোবরের শেষ দিক থেকে মিয়ানমারের তিনটি জাতিগত বিদ্রোহী বাহিনী একজোট হয়ে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণ শুরু করে।
বাহিনীগুলো হল- তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি-টিএনএলএ, আরাকান আর্মি-এএ এবং মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি-এমএনডিএএ। তারা শান, রাখাইন, চীন ও কেয়াহ রাজ্যে লড়াই চালাচ্ছে। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও সেনাপোস্ট দখল করে ইতোমধ্যে তারা সাফল্য দেখিয়েছে।
আরাকান আর্মি (এএ) এ জোটের অন্যতম অংশ। মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনের সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর একটি সশস্ত্র বাহিনী এটি। তারা রাখাইনের বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই করছে।
পুরনো খবর
ঘর ছাড়ার আতঙ্ক উসকে দিল মিয়ানমারের যুদ্ধের গোলায় মৃত্যু
অনুপ্রবেশের শঙ্কা শরণার্থী কমিশনের, শূন্যরেখায় মানুষের ভিড়
মিয়ানমারের হেলিকপ্টার থেকে গুলি, বিজিপি ক্যাম্পে আগুন
মিয়ানমারে যুদ্ধ: রাখাইনের যে খবর পাচ্ছেন ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা
মিয়ানমার থেকে আসা গোলায় বান্দরবানে নিহত ২
মিয়ানমারের যুদ্ধ ছেড়ে সশস্ত্র অনুপ্রবেশ, বাড়ি ছাড়ছেন স্থানীয়রা
বাংলাদেশে ঢুকেছে মিয়ানমারের ৬৮ সীমান্তরক্ষী: বিজিবি
মিয়ানমার থেকে আসা গুলিতে দুজন আহত, শিক্ষার্থীশূন্য স্কুল
মিয়ানমারের ১৪ সীমান্তরক্ষী পালিয়ে বাংলাদেশে
দুদিন পর নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে গোলাগুলি, অটোরিকশায় লাগল গুলি
নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে এসে পড়ল ৩ মর্টার শেল
অভ্যুত্থানের ৩ বছরে প্রথমবার বেকায়দায় মিয়ানমারের জান্তা প্রধান
জান্তা আমলে মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে: ভলকার তুর্ক
মিয়ানমারের ওপর আবার যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা
মিয়ানমার সীমান্তে লাগাতার গোলাগুলি, নাইক্ষ্যংছড়ির ৫ স্কুলে ‘ছুটি’
সীমান্তে ‘সর্বোচ্চ সতর্ক’ থাকার নির্দেশ বিজিবি মহাপরিচালকের
মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে ফের গোলাগুলি, এপারে আতঙ্ক
মিয়ানমারের গুলি এসে ভেদ করল টেকনাফের বাড়ির দরজা
মিয়ানমারে যুদ্ধ: রাখাইনের যে খবর পাচ্ছেন ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা
তুমব্রু সীমান্তে রাতেও গোলাগুলি, পরিদর্শনে ডিসি-এসপি
জান্তা আমলে মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে: ভলকার তুর্ক
বিদ্রোহী জোটের হামলায় বহু এলাকা হাতছাড়া, কোণঠাসা মিয়ানমার জান্তা
মিয়ানমারে পেরে উঠছে না জান্তা বাহিনী, সমর্থন হারাচ্ছেন মিন অং হ্লাইং
ভারতে পালাচ্ছে মিয়ানমারের সেনারা, উদ্বিগ্ন মিজোরাম
প্রত্যাবাসন: রাখাইন ঘুরে ‘উন্নতি’ দেখেছে আরআরআরসি, রোহিঙ্গারা হতাশ
জরুরি অবস্থার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা মিয়ানমার জান্তা সরকারের
নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে এসে পড়ল ৩ মর্টার শেল
মিয়ানমারে যুদ্ধ: স্থল সীমান্তের পাশাপাশি নৌপথেও নিরাপত্তা জোরদার
