Published : 23 Aug 2022, 09:47 PM
মৌলভীবাজারের অধিকাংশ চা বাগানের শ্রমিক কাজে যোগ না দিয়ে দিনভর মিছিল-সমাবেশ এবং সড়ক-রেলপথ অবরোধ করে ধর্মঘটে শামিল হয়েছেন। এর বাইরে সকালে কয়েকটি বাগানে শ্রমিককে পাতা তুলতে দেখা গেলেও দুপুরের পর তারাও আর কাজে যোগ দেননি।
এদিকে মঙ্গলবার সকালে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান প্রধানমন্ত্রীর বার্তা নিয়ে বাগানে বাগানে গিয়ে শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু একটি ছাড়া প্রায় সব বাগানের শ্রমিক আন্দোলনে অনড় থেকেছেন।
বিকালে জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান বলেন, “সকাল থেকেই আমি নিজে বাগানে বাগানে গিয়ে শ্রমিকদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা পৌঁছে দিয়েছি, কাজে ফেরার জন্য তাদের বুঝিয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “চা শ্রমিকদের বাইরে কিছু শ্রমিকসন্তান আছেন, যারা ছাত্র-যুব সংসদ বলে দাবি করছেন। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর কোনো নির্দেশনা নেই। তাই সাধারণ শ্রমিকদের বুঝানো হচ্ছে।”
তিনি দাবি করেন, কথা বলার পর দুপুরে শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগানের শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন।
চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা বিজয় হাজরা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী আমাদের বিষয়টি দেখবেন বলেছেন, এটা আমাদের জন্য বড় বিষয়। শ্রমিকরা অনেকে কথা শুনছেন, আবার অনেকে শুনছেন না।”

মৌলভীবাজারে মোট ৯২টি নিবন্ধিত চা বাগান রয়েছে। সকাল থেকে শ্রীমঙ্গলের ফুলছড়ি চা বাগান, জেরিন চা বাগান, জুলেখানগর চা বাগান, কমলগঞ্জের কুরমা চা বাগান, চাম্পারায় চা বাগানের শ্রমিকরা কাজে যোগ দেন।
জুড়ি উপজেলার কাপনা চা বাগানের শ্রমিকরা সকালে যোগ দেন। দুই ঘণ্টা পর শ্রমিকদের একটি অংশ কুরমা, চাম্পারায় ও কাপনা চা বাগান থেকে শ্রমিকদের তুলে নিয়ে যায়।
শ্রীমঙ্গলের কিছু শ্রমিককে বাগানের সেকশনে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। তারা বলছেন, তারা নেতাদের নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন।
ফুলছড়ি চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি লক্ষ্মণ বাউরি বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা শুনে আমাদের চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতারা কাজ করার অনুমতি দিয়েছেন; তাই আমরা কাজ করছি।”
শ্রীমঙ্গল গারো লাইনের সাধারণ চা শ্রমিক জননী মৃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা কতটা সুখে আছি আপনারা একবার দেখে যান। ১২০ টাকা মজুরি, সপ্তাহে কিছু আটা। আটা তো সকালের নাস্তাতেই শেষ। তাহলে চাল, ডাল, তেল, লবণ, মরিছ, সবজি, মাছ ১২০ টাকায় কিভাবে সম্ভব?”
ফুলছড়ি চা বাগানের শ্রমিক নেতা বিশ্বজিৎ সিং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মজুরি বাড়ানোর জন্য আন্দোলন করতে হচ্ছে এটাই তো দুঃখজনক। আমরা পরিশ্রম করবো, পরিশ্রমের অর্থ দিবে মালিক। এটাই তো হওয়ার কথা ছিল।”
জুড়ি থানার ওসি সঞ্জয় কুমার চক্রবর্তী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উপজেলায় ১১টি চা বাগানের মধ্যে কাপনা চা বাগানে সকালে কাজ শুরু হয়। দুই ঘণ্টা কাজ করার পর একটা অংশ তাদের বাগান থেকে তুলে নিয়ে আসে।”

কুলাউড়া থানার ওসি আব্দুস ছালেক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, এ উপজেলার ১৭টি চা বাগানের মধ্যে তিনটিতে কাজ করেছেন শ্রমিকরা।
কমলগঞ্জ কুরমা চা বাগানের কর্মকর্তা রূপক দাশ বলেন, “সকালে কাজে যোগ দেয় শ্রমিকরা। কিছুক্ষণ কাজ করার পর তাদের তুলে নিয়ে আসে অপর একটি অংশ।”
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চা শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছেন। এরপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না।
এর পেছনে অন্যকোনো কারণ থাকতে পারে বলে ধারণা করেন ইউএনও। তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে নজরদারি শুরু করা হচ্ছে।
“বাগানগুলোতে চা শ্রমিক নয় এমন মানুষদের আনাগুনা রয়েছে কি-না বিষয়টিও নজরদারিতে আনা হচ্ছে।”
চা বাগান বন্ধ থাকায় পর্যটন শিল্পেরও অনেক বড় ক্ষতি হচ্ছে উল্লেখ করে ইউএনও বলেন, “আন্দোলনের সংবাদ শুনে পর্যটক আসছেন না। এতে পর্যটক নির্ভর শ্রীমঙ্গলের ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।”

ফিনলে টি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তাহসিন আহমদ চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সকাল থেকে তাদের বিভিন্ন বাগানে শ্রমিকরা কাজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেন। কিন্তু একটা অংশ এসে আপত্তি দেওয়াতে তারা আর বের হননি।
তিনি দাবি করেন, তাদের কোম্পানির অধীনস্ত শ্রীমঙ্গল ভাড়াউড়া চা বাগান এবং হবিগঞ্জের ফয়জাবাদে কাজ হয়েছে।
ভরা মৌসুমে শ্রমিকরা কাজে না আসায় ক্ষতি হচ্ছে উল্লেখ করে তাহসিন আহমদ বলেন, “গত ১০ থেকে ১২ দিন কোনো পাতা উঠানো হলো না। এটি শুধু বাগান মালিকের নয়, রাষ্ট্রের ক্ষতি। এর প্রভাব দীর্ঘ।”
আরও পড়ুন:
চা শ্রমিকদের এক ঘণ্টার অবরোধে সিলেটের পথে ট্রেন চলাচল ব্যাহত
সিলেটে পঞ্চায়েত ও চা শ্রমিক নেতাদের বৈঠক, কর্মবিরতি থাকছেই
মজুরি বৃদ্ধির দাবি: হবিগঞ্জে চা শ্রমিকদের ধর্মঘট অব্যাহত
সিলেটের ২৩টির মধ্যে কাজে ফিরেছেন চার বাগানের শ্রমিক
চা শ্রমিক ইউনিয়ন কাজে ফিরছে ১২০ টাকা মজুরিতেই
চা শ্রমিকের মজুরি বেড়ে ১৪৫ টাকা, আন্দোলন প্রত্যাহার
মজুরি ৩০০ টাকা করতে দুদিন সময় দিয়ে রাস্তা ছাড়ল চা শ্রমিকরা
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে চা শ্রমিকদের অবরোধ, দীর্ঘ যানজট
শ্রমিক ধর্মঘট: মৌলভীবাজারে ফিনলে টি’র ৫ বাগানের জিডি
কর্মবিরতির মধ্যে শ্রম অধিদপ্তরের সঙ্গে বৈঠকে চা শ্রমিকরা
বাগানে বাগানে মিছিল, এমপিকে স্মারকলিপি চা শ্রমিকদের
ভরা মৌসুমে শ্রমিক ধর্মঘটে শঙ্কায় চা বাগান
মজুরি বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান চা শ্রমিকরা
১২০ টাকায় কীভাবে সংসার চলে, প্রশ্ন চা শ্রমিকের
অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে চা শ্রমিকরা
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চা বাগানে দ্বিতীয় দিনের মতো কর্মবিরতি