Published : 26 Jul 2026, 01:10 AM
ঢাকার এক বিউটি পার্লার, একটি বিয়ে, আর ছোটবেলার এক ভয়ের গল্প ঘিরে তৈরি 'দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড' সিনেমা দিয়ে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত সিনেমাটি উৎসবের ৮৩তম আসরের 'অরিজোন্তি' প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে যাচ্ছে।
আগামী ২ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর ইতালির ভেনিসে বসবে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এই চলচ্চিত্র উৎসবের আসর।
গ্লিটজের সঙ্গে যখন সিনেমাটি নিয়ে কথা হচ্ছিল, তখন সিনেমার পোস্ট-প্রোডাকশন পর্বের একদম শেষ ধাপে রুবাইয়াত হোসেন। মিক্সিং টেবিল থেকে সবে উঠে এসেছেন তিনি।
উৎসবে অংশ নেওয়া নিয়ে তিনি বলেন, "সিনেমটি একদমই শেষ পর্যায়ে। তো আমরা খুব সৌভাগ্যবান যে, আমাদের সিনেমাটি শেষও হয়নি, শেষ হওয়ার আগেই আমরা ভেনিস উৎসবে নির্বাচিত হয়েছি। আমি খুব ভালো ফিল করতেছি,"
চলচ্চিত্রটি তৈরির পুরো সময় রুবাইয়াতের মধ্যে ছিল স্বজন হারানোর শোকের ছায়া। কাজ চলাকালীন তিনি বাবাকে হারান।
রুবাইয়াত বলেন, "আব্বুকে হারানোর পর ভীষণ বিষণ্নতায় ভুগছিলাম। রক্তচাপ এত কমে যে যে, মাঝে মাঝেই জ্ঞান হারাতাম। মনে হচ্ছিল শুটিং করতেই পারব না। কিন্তু পুরো সিনেমাটা যেভাবে শেষ হল, এটাকে আমার অলৌকিক বা মিরাকেল মনে হয়। মনে হয়েছে অদৃশ্য কোনো সাহায্য পাচ্ছিলাম। কাজটা শেষ করতে গিয়েই আমি সুস্থ হয়ে উঠেছি।"

সিনেমটির অর্থায়ন সম্পর্কে তিনি বলেন, বাবার জীবদ্দশায় দেড় থেকে দুই লাখ ইউরোর বেশি তোলা সম্ভব হয়নি। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বেশ কয়েকটি ফান্ড থেকে একসঙ্গে সাড়ে চার থেকে থেকে ৫ লাখ ইউরোর অর্থায়ন চলে আসে।
বাবার স্মৃতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমার জীবনের সবকিছুই আব্বুকে কেন্দ্র করে ছিল। আব্বুকে দেখানোর একটা চ্যালেঞ্জ ছিল যে, আমি পারি। তিনি বলতেন আমার অনেক সাহস। কিন্তু আজ আমার সব থেকে কষ্টের বিষয়, আব্বু ভেনিসের এ অর্জনটা দেখে যেতে পারলেন না।"
'মেহেরজান', 'আন্ডর কনস্ট্রাকশন' ও 'মেইড ইন বাংলাদেশ' এর পর এটি রুবাইয়াতের চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। আগের কাজের চেয়ে এটি একেবারেই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তৈরি বলে জানান তিনি।
"এর আগের তিনটা সিনেমার চেয়ে এটার মূল পার্থক্য হলো, এটি আমি সম্পূর্ণ নিজের জন্য বানিয়েছি। ফান্ডিং ছিল, প্রযোজক ছিল, কিন্তু উৎসব নিল কি নিল না, বা কার ভালো লাগল— তা নিয়ে না ভেবে প্রথমবার একদম নিজের সন্তুষ্টির জন্য কাজ করেছি। সিনেমাটি শেষ হওয়ার আগেই আমরা বেশ কিছু উৎসবে যাওয়ার প্রস্তাব পেয়েছি, এটা ভালো লাগার।"
প্রায় ২০ বছর ধরে এ সিনেমার ভাবনায় কাজ করছেন পরিচালক। শৈশবে পার্লারে শোনা এক গল্প ও স্মৃতি তাকে তাড়া করে ফেরাত।
রুবাইয়াত বলেন, “সিনেমাটি দিয়ে আমরা বিউটি বলতে কী বুঝি, সেটাকে প্রশ্ন করতে চেয়েছি। রূপচর্চার এই প্রক্রিয়ার নিচে যে কতটা যন্ত্রণা লুকিয়ে থাকে, তা দেখানোর চেষ্টা করেছি। সমাজ যেভাবে পার্লারের মাধ্যমে একটি মেয়েকে কৃত্রিম ছাঁচে 'নারী' হিসেবে ম্যানুফ্যাকচার করে, ছবিটিতে সেটাই দেখানো হয়েছে।"
পাশাপাশি শৈশবে বিয়েবাড়িতে কনেদের কান্নার যে ভীতিপ্রদ স্মৃতি তার মনে গেঁথে ছিল, সেটিকেও সিনেমার একটি স্তর হিসেবে যুক্ত করেছেন তিনি।

নারীদের প্রধান ভূমিকা
'দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড' সিনেমাটির মিউজিক কম্পোজার ছাড়া প্রতিটি বিভাগের প্রধানই নারী।
চিত্রগ্রহণ করেছেন পর্তুগালের লিওনর তেলেস (বার্লিনে গোল্ডেন বিয়ার বিজয়ী), গ্যাফার ছিলেন ফ্রেদেরিকা আর গোমেস, সম্পাদনায় ফ্রান্সের রাফায়েল মার্তা হোলগার এবং প্রোডাকশন ডিজাইনে ভারতের জোনাকী ভট্টাচার্য।
নারী দল নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা জানিয়ে রুবাইয়াত বলেন, "নারীরা ভালো সিনেমা বানাতে পারে না, এমন ধারণার ভুল প্রমাণ হলো এই সিনেমা। সাউন্ড মিক্সার, সাউন্ড ডিজাইনার থেকে শুরু করে প্রতিটা বিভাগের নারী টেকনিশিয়ানদের দক্ষতা ও কাজের গতি ছিল বিস্ময়কর।"
চলচ্চিত্রটির মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনীন চৌধুরী করিম। দেড় বছর এই প্রজেক্টে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার পর অডিশনের মাধ্যমে তাকে প্রধান চরিত্রে বেছে নেওয়া হয়। প্রথম কাজ হলেও জাইনীনের দুর্দান্ত অভিনয়ের প্রশংসা করেন পরিচালক।
এছাড়া সহ-অভিনেত্রী হিসেবে রয়েছেন রিকিতা নন্দিনী শিমু ও সুনেরাহ বিনতে কামাল। সুনেরাহর পুরো সিনেমায় কোনো সংলাপ নেই, তবে তার পেশাদারিত্বের প্রশংসা করেছেন পরিচালক।

শিমুর জন্য এটি দ্বিতীয়বার ভেনিস উৎসবে যাওয়ার ঘটনা। এর আগে 'ওয়ানস আপন আ টাইম ইন ক্যালকাটা' সিনেমার মাধ্যমে গিয়েছিলেন তিনি।
চলচ্চিত্রে অতিথি চরিত্রে দেখা যাবে আজমেরী হক বাঁধন ও দামীর খান।
আন্তর্জাতিক কলাকুশলীদের ঢাকায় এনে গত বছরের জুন-জুলাইয়ে মাত্র ২৬ দিনে রুবাইয়াত হোসেনের নিজস্ব বাসভবন এবং নির্মিত সেটে সিনেমাটির দৃশ্যধারণ শেষ করেন।
সিনেমাটি যৌথভাবে প্রযোজনা করেছে ফ্রান্স, পর্তুগাল, নরওয়ে, জার্মানি ও বাংলাদেশের খনা টকিজ।
পরিচালক জানিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যেই ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে সিনেমাটির আন্তর্জাতিক প্রিমিয়ার সম্পন্ন হবে। আগামী বছরের মধ্যে সাধারণ দর্শকরা সিনেমাটি দেখতে পাবেন।