১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সংকট যখন সবার, সমাধান কেন শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য

নবম জাতীয় বেতন কাঠামো সরকারি চাকরিজীবীদের স্বস্তি দিলেও, এর সার্বিক মূল্যস্ফীতি ও ব্যয়ভার বইতে হবে অনানুষ্ঠানিক খাতের সাধারণ মানুষকেও। 

সংকট যখন সবার, সমাধান কেন শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য

উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হলেও বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের বিশাল জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে সুরক্ষাহীন। প্রতীকী ছবি

মো. মামুন-অর-রশিদ মো. মামুন-অর-রশিদ

Published : 18 Sep 2026, 09:27 AM

Updated : 18 Sep 2026, 09:55 AM

বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদিত হলো এমন এক সময়ে, যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা ও জ্বালানির চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং কর্মসংস্থানের স্থবিরতা সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন করে তুলেছে। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। গত এক দশকে মূল্যস্ফীতি তাদের বেতনের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়েছে। 

এবার একটু অন্যদের দিকে নজর দেয়া যাক। পোশাকশ্রমিক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, এনজিওকর্মী, শিক্ষক, নিরাপত্তাকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, পরিবহনশ্রমিক ও দিনমজুর সবাই একই বাজার থেকে চাল, ডাল, তেল ও ওষুধ কেনেন। সবাই বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও শিক্ষার বাড়তি খরচ বহন করেন। অথচ তাদের আয় সমন্বয়ের জন্য রাষ্ট্রের কোনো সামগ্রিক ব্যবস্থা নেই। সংকট যখন সবার, তখন রাষ্ট্রের সমাধান কেন একটি নির্দিষ্ট চাকরিজীবী শ্রেণির মধ্যে সীমিত থাকবে?

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন রাষ্ট্রীয় রাজস্ব থেকে দেওয়া হয়। ওই রাজস্বের বড় অংশ আসে জনগণের দেওয়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর থেকে। একজন দিনমজুর হয়তো আয়কর দেন না, কিন্তু সাবান, মোবাইল সেবা বা অন্য পণ্য কিনলে ভ্যাট ও অন্যান্য পরোক্ষ কর দেন। ফলে সরকারি কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি সরকার ও তার কর্মচারীদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; জনগণের অর্থ কার কল্যাণে কীভাবে ব্যয় হবে, এটি ওই সিদ্ধান্তেরও বিষয়।  

নতুন কাঠামোর সুবিধা সরাসরি পাবেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কিন্তু অর্থ জোগাতে কর বাড়লে, সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে কিংবা সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হলে তার প্রভাব পড়বে সবার ওপর। বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে চাহিদা বাড়বে, তাই দাম অবশ্যই বাড়বে; এমন সরল সিদ্ধান্ত টানা ঠিক নয়। তবে সরবরাহ সীমিত থাকলে এবং বাজারে দুর্বল তদারকি থাকলে বাড়তি চাহিদা মূল্যচাপ তৈরি করতে পারে। তখন আয় অপরিবর্তিত থাকা বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষকে একই পণ্যের জন্য আরও বেশি ব্যয় করতে হবে। 

শুধু মাসিক বেতনের অঙ্ক দিয়ে সরকারি ও বেসরকারি কর্মীদের অবস্থান তুলনা করাও যথেষ্ট নয়। চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত বেতন ও বার্ষিক বৃদ্ধি, উৎসব ভাতা, অবসরসুবিধা, পেনশন, ছুটি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুযোগও বিবেচনায় নিতে হবে। সরকারি চাকরি তুলনামূলক নিরাপদ। অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক খাতের অনেক কর্মীর নিয়োগপত্র, নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি বা পেনশন নেই। প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে, অসুস্থ হলে বা মন্দা এলে তাদের আয় দ্রুত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একই মূল্যস্ফীতির মুখে তারাই বেশি অরক্ষিত। 

ন্যায্যতার প্রশ্নটি এখানেই। দার্শনিক জন রলসের বণ্টনমূলক ন্যায়বিচারের ধারণায় বৈষম্য তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অবস্থার উন্নতি ঘটায়। অমর্ত্য সেনের সক্ষমতা দৃষ্টিভঙ্গিও মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন শুধু আয় বৃদ্ধির হিসাব নয়; মানুষ খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সুযোগ বাস্তবে পাচ্ছে কি না, সেটিই মূল কথা। একটি নীতি সরকারি কর্মীর ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে পারে। কিন্তু তার অর্থায়ন বা বাজারগত প্রভাবে যদি কম আয়ের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর খাবার, চিকিৎসা বা শিক্ষার সুযোগ কমে, তবে নীতিটি সামগ্রিক কল্যাণের দাবি করতে পারে না।

রাষ্ট্রীয় নীতিতে সংগঠিত গোষ্ঠীর দাবি সাধারণত বেশি দৃশ্যমান হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রশাসনের অংশ; তাদের সংগঠন আছে, দাবি জানানোর পথ আছে এবং রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কাজ তাদের ওপর নির্ভরশীল। বিপরীতে দিনমজুর, গৃহকর্মী, রিকশাচালক ও ছোট প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সংখ্যায় বেশি হলেও বিচ্ছিন্ন। তাদের সম্মিলিত দরকষাকষির শক্তি কম। ফলে সম্পদ প্রয়োজনের ভিত্তিতে নয়, প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের ভিত্তিতে বণ্টিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। 

এ সিদ্ধান্তের পেছনে প্রশাসনিক সন্তুষ্টি বা রাজনৈতিক স্থিতি নিশ্চিত করার বিবেচনা ছিল, কোনো প্রমাণ ছাড়া তা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। তবে সিদ্ধান্তের সময়, সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এবং বৃদ্ধির মাত্রা বিবেচনায় সরকারের কাছে অর্থায়ন, মূল্যস্ফীতি ও অন্য শ্রমজীবীদের সুরক্ষার পূর্ণ হিসাব চাওয়া যৌক্তিক। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পাশাপাশি জনগণের জানার অধিকার আছে; বছরে অতিরিক্ত ব্যয় কত হবে, অর্থের উৎস কী, ঋণ ও মূল্যস্ফীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব কতটুকু এবং সামাজিক সুরক্ষার কোনো কর্মসূচি কমবে কি না।

বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে, এই পরিচিত যুক্তিও সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হবে। ২০১৫ সালের বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মীদের বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। তবু পরবর্তী সময়ে সেবা খাতে ঘুষ বন্ধ হয়নি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০২৫ সালের খানা জরিপ অনুযায়ী, জরিপভুক্ত পরিবারের ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ অন্তত একটি সেবা খাতে ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে; গড়ে পরিবারপ্রতি ঘুষের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ১২৪ টাকা।

দুর্নীতি শুধু কম বেতনের ফল নয়। অবৈধ ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ, ধরা না পড়ার নিশ্চয়তা, রাজনৈতিক সুরক্ষা এবং শাস্তির দুর্বলতা এর সঙ্গে যুক্ত। বেতন বৃদ্ধি নিম্ন আয়ের একজন সৎ কর্মীকে প্রয়োজনীয় স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু জবাবদিহি ও শাস্তির ব্যবস্থা কার্যকর না হলে শুধু বেতন বাড়িয়ে ঘুষ কমানো যায় না। তাই নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সেবার সময়সীমা, সম্পদ ঘোষণার কার্যকর ব্যবস্থা, ডিজিটাল লেনদেন, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং দুর্নীতির নিশ্চিত শাস্তি যুক্ত করা দরকার। 

অন্য দেশের অভিজ্ঞতা হুবহু বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়, তবে নীতিগত কিছু শিক্ষা দেয়। ২০২৩ সালে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আইএমএফ কর্মসূচির মধ্যে পাকিস্তান নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মীদের জন্য ৩৫ শতাংশ এবং উচ্চ গ্রেডের জন্য ৩০ শতাংশ সাময়িক ভাতা দিয়েছিল। অর্থাৎ তাৎক্ষণিক চাপ সামলাতে স্থায়ী বেতন কাঠামোর বদলে সীমিত সহায়তা বেছে নেওয়া হয়েছিল। ঋণ ও মূল্যস্ফীতির সংকটে ঘানা একই বছরে সরকারি কর্মীদের বেতন ৩০ শতাংশ বাড়ায়; একই সময়ে ভ্যাটও ২ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ানো হয়। এতে বোঝা যায়, অর্থের টেকসই উৎস ছাড়া একটি গোষ্ঠীর বেতন বাড়ালে ব্যয়ের অংশ সাধারণ ভোক্তার কাছে যেতে পারে। 

শ্রীলঙ্কার ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর দেশটি প্রথমে রাজস্ব, ঋণ ও সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করে। মূল্যস্ফীতি চূড়া থেকে অনেকটা নামার পর ২০২৪ সালে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ৪০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এই নীতির সব দিক ন্যায়সংগত ছিল না; কৃচ্ছ্রসাধনের বড় মূল্য সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়েছে। তারপরও শিক্ষা হলো, মজুরি সমন্বয়ের সময় সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের কম আয়ের মানুষের কথা একসঙ্গে ভাবতে হয়। 

বাংলাদেশেও বিকল্প ছিল। প্রথমত, উচ্চ গ্রেডের বড় বৃদ্ধি ধাপে ধাপে কার্যকর করে নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া যেত। দ্বিতীয়ত, স্থায়ী নতুন কাঠামোর আগে সীমিত সময়ের জন্য আয়ভিত্তিক মহার্ঘ সহায়তা দেওয়া যেত, যার আওতায় কম আয়ের বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকেরাও থাকতেন। তৃতীয়ত, প্রধান শিল্প ও পেশার ন্যূনতম মজুরি নিয়মিত পর্যালোচনা এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয়ের কার্যকর ব্যবস্থা করা দরকার। খাদ্য, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষায় লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়িয়েও জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয় কমানো যায়। 

সবশেষে, নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণ আর্থিক হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। কোন উৎস থেকে ব্যয় মেটানো হবে, নতুন কর বা ঋণ লাগবে কি না, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কী এবং নিম্ন আয়ের অন্য জনগোষ্ঠীর জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে; এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন। সংসদীয় বা স্বাধীন আর্থিক পর্যালোচনার সুযোগও থাকা দরকার। 

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং তাদের ন্যায্য জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্র একইভাবে কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বেসরকারি কর্মী ও কর্মহীন মানুষেরও। সীমিত সম্পদে ন্যায়সংগত নীতির অর্থ সবাইকে সমান অর্থ দেওয়া নয়; যার প্রয়োজন ও ঝুঁকি বেশি, তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। 

যখন সংকট সবার, তখন সমাধানের পরিধিও সবার দিকে তাকিয়ে ঠিক করতে হবে। একটি শ্রেণির আয় বাড়ানোর ব্যয় যদি সুবিধাবঞ্চিত বাকি জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ে, তবে ওই সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক হিসাবের পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নেও জবাবদিহি দাবি করে। 

মো. মামুন-অর-রশিদ উন্নয়ন ও শাসনব্যবস্থা বিষয়ক গবেষক। ই-মেইল: mrashid.uk2025@gmail.com