পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডোর অনুষ্ঠানের দ্বিতীয়পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন একে শিক্ষা সহযোগিতার‘নতুন দিগন্ত’হিসেবে অভিহিত করেন। ছবি: বাসস
Published : 17 Sep 2026, 09:49 PM
বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে কাঙ্ক্ষিত মেধা তালিকায় নাম দেখে যে শিক্ষার্থীরা জীবনের নতুন অধ্যায় শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, চূড়ান্ত মুহূর্তে এসে তারা আবিষ্কার করলেন—পুরোটাই ছিল পরিকল্পিত প্রতারণার ফাঁদ। ‘ফুললি ফান্ডেড’ বৃত্তির লোভ দেখিয়ে শেষ ধাপে এসে সব প্রতিশ্রুতি থেকে একঝটকায় সরে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতারণা ও ছিনিমিনি খেলার অধিকার পাকিস্তানকে কে দিয়েছে? ‘নলেজ করিডোর’ ও ‘আল্লামা ইকবাল স্কলারশিপের’ নামে বাংলাদেশি তরুণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা আমাদের দেশের সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের মেধা, মূল্যবান সময় ও জীবনের সঙ্গে করা ঘৃণ্য ও পরিকল্পিত প্রতারণা।
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা গেছে, ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশন এবং পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন (এইচইসি) অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে শিক্ষামেলা ও প্রচারণার আয়োজন করে। সেখানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ফুললি ফান্ডেড’ বা সম্পূর্ণ অর্থায়িত স্কলারশিপের এক অত্যন্ত লোভনীয় ও চটকদার সুযোগের ঘোষণা দেওয়া হয়। সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি, থাকার ব্যবস্থা, প্রতি মাসে সম্মানজনক জীবনযাত্রার ভাতা, এককালীন সেটেলমেন্ট থোক বরাদ্দ এবং যাতায়াতের জন্য রিটার্ন এয়ার টিকিটের মতো সমস্ত সুযোগ-সুবিধা লাভ করবে। দেশের হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী বড় স্বপ্ন বুকে নিয়ে অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে এই বৃত্তির আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। দীর্ঘ কয়েক মাস নানা ধাপের আন্তর্জাতিক যাচাই-বাছাই পার হয়ে বহু শিক্ষার্থী অবশেষে তাদের কাঙ্ক্ষিত মেধা তালিকায় স্থান করে নিতে সক্ষম হন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিহীন প্রক্রিয়ার একদম শেষ ধাপে এসে যখন শিক্ষার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত অফার লেটার হাতে পেলেন, তখন তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক চরম হতাশা ও প্রতারণার ধাক্কা! অফার লেটারে পাকিস্তান সরকার ও কমিশনের পূর্বে দেওয়া সমস্ত প্রতিশ্রুতি থেকে একঝটকায় সরে আসা হয়। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তাদের কোনো প্রকার ‘ফুললি ফান্ডেড’ স্কলারশিপ দেওয়া হবে না; এর পরিবর্তে তারা কেবল টিউশন ফি ও হোস্টেলের খরচ ছাড় বা ওয়েভার পাবেন। অর্থাৎ, বিদেশের মাটিতে বেঁচে থাকার ন্যূনতম খাবার খরচ, মাসিক ভাতা, বইপুস্তকের ব্যয়, স্থানীয় যাতায়াত কিংবা রিটার্ন টিকিটের জন্য কোনো প্রকার আর্থিক সহায়তা তারা পাবেন না! শিক্ষার্থীরা নিজেদের সমস্ত খরচ নিজ পকেট থেকে বহন করবে—এমন এক অবাস্তব ও অনৈতিক শর্ত তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা শুরু থেকে গোপন রাখা হয়েছিল।
অথচ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের বাংলাদেশ সফরের পর ‘নলেজ করিডোর’ প্রকল্পের অধীনে আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ অর্থায়িত (ফুললি ফান্ডেড) স্কলারশিপ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ইসহাক দারের সফরটি ছিল প্রায় ১৩ বছর পর কোনো পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর।
এরই মধ্যে নলেজ করিডোরের আওতায় গত ফেব্রুয়ারিতে প্রথম ব্যাচের প্রায় ৭৪ জন শিক্ষার্থী ধাপে ধাপে পাকিস্তানে পৌঁছায় এবং সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা শুরু করে। গত মে মাসে ঢাকায় পাকিস্তান এডুকেশন এক্সপোর দ্বিতীয় ধাপের উদ্বোধন করা হয় এবং আরও বৃত্তি দেওয়ার ঘোষণা ও আবেদন চলমান থাকে। তবে আবেদনের সব ধাপ পার করে দ্বিতীয় দফায় নির্বাচিত মাস্টার্সের শিক্ষার্থীরা অফার লেটারে এসে দেখছেন ভিন্ন শর্ত।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন বনাম পাকিস্তান হাইকমিশন কি এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন ‘পাসিং দ্য বিল’ এবং পারস্পরিক দোষারোপ করে নিজেদের অপকর্ম ও দায় এড়াতে পারে? একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের তরুণ মেধাবীদের নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলা কোনো কূটনৈতিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। এখানে স্পষ্ট প্রশ্ন উঠছে: পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ কি শুরু থেকেই ইচ্ছা করে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে এমন অসৎ ও চালিয়াতিপূর্ণ আচরণ করেছে? নাকি প্রকৃতপক্ষে এই বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে অর্থায়ন করার মতো কোনো আর্থিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্যই তাদের নেই? কাগজ-কলমে কাল্পনিক সব বড় সুযোগ-সুবিধার লোভ দেখিয়ে আসলে কি তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের একটি কৃত্রিম ও ভুয়া ভাবমূর্তি দাঁড় করাতে চেয়েছিল? নিজেদের নীতিহীন প্রচারণার জন্য আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে সস্তা ব্র্যান্ডিং করাই কি ছিল তাদের একমাত্র হীন উদ্দেশ্য?
আরও বেশি উদ্বেগের, লজ্জার ও যন্ত্রণাদায়ক বিষয় হলো এই ঘটনার বিপরীতে আমাদের নিজেদের নীতি-নির্ধারণী প্রশাসনের ভূমিকা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পুরো কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কেলেঙ্কারির বিষয়ে কেন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও নীরব ভূমিকা পালন করছে? দেশের আপামর সাধারণ জনগণের কষ্টার্জিত ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকায় পরিচালিত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন আমাদেরই দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এমন প্রকাশ্য প্রতারণা ও আত্মমর্যাদাহানির বিরুদ্ধে কোনো প্রকার দৃশ্যমান বা কঠিন কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিচ্ছে না? পররাষ্ট্র দপ্তরের এই রহস্যময়, নিষ্ক্রিয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত নীরবতার আসল কারণ কী? যে শিক্ষার্থীরা আগামী দিনে বিশ্বের দরবারে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে, সেই শিক্ষার্থীদের সংকটকালে আমাদের কূটনৈতিক অভিভাবকরা যদি নির্বিকার থাকেন, তবে এমন দপ্তরের অস্তিত্বের যৌক্তিকতা কোথায়?
ঘটনার পেছনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত ১১ মে ঢাকার একটি আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে এই বিতর্কিত কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন করা হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন এই শিক্ষাবৃত্তিকে বাংলাদেশ-পাকিস্তান দুই দেশের শিক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতার এক ‘নতুন দিগন্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তিনি মহা সমারোহে ৫০০টি সম্পূর্ণ অর্থায়িত ‘আল্লামা ইকবাল স্কলারশিপ’ দেওয়ার কথা অত্যন্ত জোর দিয়ে জনসমক্ষে প্রচার করেছিলেন। কিন্তু আজকে যখন শত শত তরুণ শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার এমন এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ এবং ক্যারিয়ার ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েছে, তখন সেই শিক্ষামন্ত্রী বা তাঁর অধীনস্থ শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে? যে প্রকল্পের জন্য মন্ত্রী নিজে সরাসরি মঞ্চে উঠে প্রচারণা চালালেন, সেই প্রকল্পের মাধ্যমে আমাদের মেধাবীদের ভাগ্যে এমন নিদারুণ ব্যর্থতা, অপমান ও ছলচাতুরী নেমে আসার পর তিনি বা তাঁর দপ্তর কি এর ঐতিহাসিক দায় কোনোভাবে এড়াতে পারেন?
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের দিকে চোখ রাখলে সার্বিক বিষয়টি আরও বেশি আতঙ্কের রূপ ধারণ করে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ’ বা বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য সূচকে যে দেশের স্থান বর্তমানে পৃথিবীর সর্বনিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে, যেখানে প্রতি তিনজন শিশুর মধ্যে একজন ন্যূনতম প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং খোদ নিজেদের জাতীয় শিক্ষা বাজেট এক-তৃতীয়াংশ কেটেছেঁটে চরম সংকটে ফেলা হয়েছে—সেই অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত ও দেউলিয়া পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘নলেজ করিডোর’ নামক ফাঁদে আমাদের দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের ঠেলে দেওয়ার নেপথ্যে যারা কাজ করেছে, তাদেরকে অবিলম্বে দেশের প্রচলিত আইন ও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে না কেন?
সর্বোপরি, শিক্ষা, উন্নয়ন, অর্থনীতি ও মানবসম্পদের সব ধরনের আধুনিক সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে বহুগুণে পিছিয়ে থাকা একটি ব্যর্থপ্রায় রাষ্ট্রে আমাদের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার নামে পাঠাতে আমাদের নীতিনির্ধারকদের এত অন্ধ আগ্রহ কেন ছিল? যে শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থা নিজের দেশের নাগরিকদেরই নিরাপদ বা সুশিক্ষিত করতে পারে না, সেখান থেকে আমাদের শিক্ষার্থীরা কী এমন পরম বিদ্যা অর্জন করবে, যা তারা নিজ দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিংবা বাংলাদেশের সঙ্গে সুদৃঢ় ও ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা বিশ্বের উন্নত, সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও আধুনিক রাষ্ট্রগুলো থেকে অর্জন করতে পারত না?
দেশের তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন নিয়ে যেকোনো প্রকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ফাঁদ ও ছলচাতুরী শক্ত হাতে প্রতিহত করা একটি স্বাধীন সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক মহলে আমাদের শিক্ষার্থীদের সম্মান, মেধা ও অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং এই প্রতারণামূলক ‘নলেজ করিডোর’ কাণ্ডের অন্তরালে থাকা সমস্ত ষড়যন্ত্র ও অবহেলার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে কঠোর শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
মনিরা নাজমী জাহান, পিএইচডি গবেষক, ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য। ই-মেইল: moniranazmijahan@yahoo.com