প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান: ঝুঁকির মুখে বিএনপির জনআস্থা
সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রকে ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয় বা দপ্তরে ভাগ করে দেখে না; তারা সব ঘটনার যোগফল টেনেই সরকারের মূল্যায়ন করে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে একটি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর। নির্বাচিত সরকারের হাতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তুলে দিয়ে মানুষের প্রত্যাশা ছিল, এবার অন্তত রাষ্ট্র মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করবে। মানুষ আশা করেছিল রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নতুনভাবে তৈরি হবে। কিন্তু সরকারের কয়েক মাসের মধ্যে এমন অনেক অভিজ্ঞতা তৈরি হচ্ছে, যেগুলো একসঙ্গে জমতে শুরু করলে রাজনৈতিক আস্থার জন্য তা বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শুধু গত সেপ্টেম্বর মাসের দিকে তাকালেই বিএনপিকে ঘিরে বেশ কয়েকটি আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনা চোখে পড়ে। এর মধ্যে রয়েছে চুয়েটে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা বাড়ানো, চরম বিদ্যুৎ সংকট, পুলিশ ভেরিফিকেশনের কারণে সরকারি চাকরি বাতিলের অভিযোগ, মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা। এর পাশাপাশি চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, শিশুদের ওপর সহিংসতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির খবর তো প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে।
সেপ্টেম্বরের ধারাবাহিকতা অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেও বজায় রয়েছে। ৪ অক্টোবর রাতে কুষ্টিয়ায় এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনায় এসেছে। একই সময়ে, গণতান্ত্রিক চর্চার ন্যূনতম মানদণ্ডও উপেক্ষা করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের ওই হামলার ভয়াবহতা বোঝা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের বক্তব্য থেকেই। তিনি স্পষ্ট স্বীকার করেছেন, “আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের দ্বারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা পুলিশকে ফোন দিয়েছি কিন্তু পুলিশও ভয়ে পালিয়ে গেছে।” তার এই মন্তব্যই প্রমাণ করে, প্রকাশ্য সংঘর্ষের সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে এবং পুলিশও কার্যকরভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি।
এর সঙ্গে সরকারের দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিদের সংবাদমাধ্যমে দেওয়া কিছু প্রতিক্রিয়াও এই অস্বস্তিকে আরও বাড়িয়েছে। এই সবকিছুর মধ্য দিয়েই মানুষের রাষ্ট্রের ওপর প্রত্যাশা আর বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।
এই দূরত্ব সরকারের জন্য বিপজ্জনক। কারণ মানুষ সরকারকে মূল্যায়ন করে মাসের বাজার খরচ, বাসভাড়া, বিদ্যুতের বিল, চাকরির বাজার তথা রাষ্ট্রীয় সেবার অভিজ্ঞতা দিয়ে। আস্থাহীনতার সঙ্গে যখন মানুষের ক্ষোভও জমতে থাকে, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে নিজেকে নিরাপদ মনে করছে কি না, নিজের জমিতে অন্য কেউ জোর করে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিতে পারছে কি না, নিজের ব্যবসায় কেউ চাঁদা চাইছে কি না অর্থাৎ নিজের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা সরকার নিশ্চিত করতে পারছে কি না, তাও সরকারের প্রতি নাগরিকের আস্থা তৈরির বড় মাপকাঠি।
এমনিতেই সংবিধান সংস্কার ও জুলাই সনদ ইস্যুতে বিরোধী জোটের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে আছে। ২০ সেপ্টেম্বর বিশেষ কমিটির বৈঠকে আমন্ত্রিত ২৬ দলের মধ্যে ১১টি অংশ নেয়নি। সরকার ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করে এগোতে চাইলেও বিরোধী জোট প্রক্রিয়াটি নিয়ে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। ফলে মতৈক্য ছাড়া এগোলে এই ইস্যুতে রাজনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা হয়তো বিচ্ছিন্ন ও আলাদা। কিন্তু মানুষের মনের ওপর এর প্রভাব কিন্তু আলাদাভাবে পড়ে না। সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রকে ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয় বা দপ্তরে ভাগ করে দেখে না; তারা সব ঘটনার যোগফল টেনেই সরকারের মূল্যায়ন করে।
এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে রাজনীতির একটি পুরোনো তত্ত্ব বেশ কাজে দেয়। সামাজিক মনোবিজ্ঞানের ‘রিলেটিভ ডিপ্রাইভেশন’ বা আপেক্ষিক বঞ্চনা তত্ত্ব বলছে, মানুষের ক্ষোভ কেবল অভাব থেকে তৈরি হয় না। মানুষ যখন দেখে তার ওপর অন্যায় হচ্ছে, তার অধিকার বা সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে, অথচ রাজনৈতিক পরিচয়ের জোর দেখিয়ে অন্য কেউ বাড়তি সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে, তখনই বঞ্চিত হওয়ার অনুভূতি তীব্র ক্ষোভে রূপ নেয়। গবেষণা দেখাচ্ছে, এই বোধ থেকে তৈরি হওয়া ক্ষোভ অনেক সময় মানুষকে একজোট হয়ে প্রতিবাদ বা আন্দোলনে নামতে বাধ্য করে।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই তত্ত্বটি বেশ প্রাসঙ্গিক। মানুষ যখন নিজেকে বঞ্চিত মনে করে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর ভরসা হারায়, নিজের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকে এবং আইন সবার জন্য সমান নয় বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থা একটু একটু করে ক্ষয়ে যায়। এই তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো জমতে জমতে ক্ষোভ আর কোনো একক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বিচ্ছিন্ন অসন্তোষগুলো একত্রিত হয়ে সামগ্রিক অসন্তোষে রূপ নিতে পারে।
এই জায়গাটিতে বিএনপির রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়ই সবচেয়ে বেশি। দলের কোনো কর্মী অপরাধ করলে সেটি 'ব্যক্তিগত অপরাধ' বলে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, বিশেষ করে ওই কর্মী যদি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করে। সরকারি দলের জন্য দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা করা আর রাষ্ট্রীয় আইন কার্যকর রাখা সমান জরুরি। দলীয় কর্মী যদি মনে করে দলের পরিচয় তাকে রক্ষা করবে, তখন পুলিশের ক্ষমতা দুর্বল হয়। আইনের ওপর ভয় কমে যায়। অপরাধীর অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়।
এক্ষেত্রে বিএনপিকে কিছু দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে দেখা গেলেও, মাঠপর্যায়ের দলীয় শৃঙ্খলা সামাল দিতে তারা যে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে, তা স্পষ্ট। একজন সংসদ সদস্যকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, যুবদল এবং মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের ১৪ জন নেতাকর্মীকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। এসব কড়া পদক্ষেপ তাৎক্ষণিকভাবে দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করলেও, এত বড় পরিসরে বহিষ্কারের ঘটনা দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, বিএনপি আসলে কাদের দিয়ে দল পরিচালনা করছে এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের ওপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ আদৌ কতটা রয়েছে?
যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে এবং সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা যদি মন্ত্রীর কথার সঙ্গে না মেলে, তবে কেবল বিবৃতি দিয়ে জনমনে আস্থা ফেরানো কঠিন।
খুন, ধর্ষণ ও শিশুদের ওপর সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনাগুলো জনমনে শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রামিসা হত্যাকাণ্ড, অপ্রতীম হত্যাকাণ্ড, সেপ্টেম্বরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছয় বছরের শিশুর মৃত্যু, সাভারে সাত বছরের মাদ্রাসাছাত্রীকে নির্যাতন কিংবা জামালপুরে সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এসব অপরাধের সঙ্গে সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের সম্পৃক্ততা রয়েছে, এমন নয়। কিন্তু নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রাথমিক দায়িত্ব রাষ্ট্রের, আর ওই দায়ভার শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই বর্তায়। মানুষ রাষ্ট্রের কাছে জানতে চায় তার সন্তান নিরাপদে ঘরে ফিরবে কি না, অপরাধীর বিচার হবে কি না। এসব মৌলিক প্রশ্নের সদুত্তর না মিললে ব্যক্তিগত অপরাধের দায়ও শেষ পর্যন্ত সরকারের শাসনক্ষমতার প্রশ্নে এসে পড়বে।
এমতাবস্থায় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দ্রুত উন্নতি না হলে বিএনপি সরকারের প্রতি জনআস্থা বড় ধরনের সংকটে পড়বে। পাশাপাশি দলীয় পরিচয় ব্যবহারকারী কর্মী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও দখলদারদের লাগাম টানতে না পারলে এই সংকট আরও তীব্র হবে।
বিএনপি সরকারের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, নিজেদের দলের সন্ত্রাস, দখলদার, চাঁদাবাজ ও প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে দাঁড় করানো। পুলিশকে রাজনৈতিক ছায়া থেকে বের করে আনা। মানুষের পকেট, চাকরি, বিদ্যুৎ, জমি ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত সমস্যাগুলোর বাস্তব সমাধান দেওয়া। বিরোধী দলের ওপর দায় দিলেই সরকার পার পেয়ে যাবে, এমন ধারণা পোষণ করা সরকারের জন্য চরম ভুল হবে।
জন অসন্তোষ এখনই তীব্রতর অবস্থায় আছে সেটা বলছি না। কিন্তু এই অসন্তোষ কখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে, তার কোনো নির্দিষ্ট হিসাব নেই। ইতিহাস বলে, মানুষের ক্ষোভ তখনই বিস্ফোরক হয় যখন বিচ্ছিন্ন অসন্তোষগুলো একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
সাজ্জাদ সাব্বির: এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ই-মেইল: sajjadsabbir24@gmail.com
