আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘আঁতাতের’ পাল্টাপাল্টি অভিযোগ কেন? আসলে কী?
“আপাতত দেখে মনে হচ্ছে, কেউই দায় নিতে চায় না। সে থেকেই একে অপরকে দোষারোপ করছে,” বলেন অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাজনীতি থেকে নির্বাসিত আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে—এমন অভিযোগ তুলে ক্ষমতাসীন বিএনপি, বিরোধী জামায়াতে ইসলামী ও তার মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলছে।
জামায়াত ও এনসিপির নেতারা বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ এবং ‘ভারতকে খুশি করতে’ রাজনৈতিক ঐক্য ভাঙার অভিযোগ তুলছেন।
অন্যদিকে সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও তার দল বিএনপির নেতারাও জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘আঁতাতের’ অভিযোগ করছেন।
যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে তুলে ধরেননি সংশ্লিষ্ট নেতাদের কেউ।
ফলে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের চেষ্টা নিয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, দলটির রাজনীতিতে ফেরার কোনো উদ্যোগ বা সমঝোতার ভিত্তি কি রয়েছে? নাকি বিষয়টি রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমিত?
রাজনৈতিক নেতা ও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এটিকে ‘ব্লেইম গেইম’ বা ‘দোষারোপের খেলা’ মনে করছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এ বিষয়টি নিয়ে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের প্রত্যেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অভিযোগটিকে কেবলই অভিযোগ হিসেবে না দেখার কথা বলেছেন।
তাদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু অভিযোগ করেছেন তাতে ‘সত্যতা’ আছে। আর ‘যৌক্তিকভাবে’ দেখলেও বিগত সময়ের মতো আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ‘যোগাযোগ হয়ে থাকতে পারে, অসম্ভব কিছু নয়’।
বিরোধী জোটের নেতারাও বলছেন, তারা এ অভিযোগটি ‘সিরিয়াসলি’ করছেন। এর স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের একের পর এক মিছিল করার বিষয়টিকে সামনে আনছেন তারা।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর ২০২৫ সালের ১২ মে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই দল ও এর সহযোগী সংগঠগুলোর কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।
‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার শেষ না হওয়া এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকার কথা বলা হয়েছে। বিএনপি সরকারও এ নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা এক মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে ভারতে নির্বাসিত শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তার আগেই তাকে ফেরত চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকার দফায় দফায় ভারতকে অনুরোধ করেছে। জবাবে দেশটি আইনি প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার কথা বলছে।
ফলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা ও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার প্রশ্নটি এখন রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গেও যুক্ত।
অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ
ক্ষমতায় বসার ছয় মাস পার না হতেই জুনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ‘পুনর্বাসনের স্বপ্ন’ দেখার অভিযোগ তোলেন।
জুলাইয়ে শেখ হাসিনা টেলিফোনে রয়টার্সকে বলেন, তিনি ও তার দল আওয়ামী লীগের সদস্যরা স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফিরতে চান। তারা আদালতে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণ করতে চান।
এরপর থেকে আবার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার বিষয়টি নিয়ে কথার লড়াই চলছে।
সেপ্টেম্বরেই এনসিপির জেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অভিযোগ করেন, ‘দিল্লিকে খুশি করতেই’ বিএনপি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে।
ওই মাসে গুলশান-১ এলাকায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে কয়েকশত লোক মিছিল করার পর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ‘সমঝোতা বা ভারতের সঙ্গে আঁতাত’ রয়েছে কি না, সে প্রশ্ন তোলেন।
অক্টোবরে এসে বিতর্কে যোগ দেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফেনীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি অভিযোগ করেন, অচিরেই ‘স্বৈরাচার’ ও ‘গুপ্ত’রা একসঙ্গে হতে পারে।
এরপর এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বিএনপির একটি অংশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ‘সম্পর্ক’ থাকার পাল্টা অভিযোগ তোলেন।
সাভার এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভের মধ্যে রাজশাহীতে এক সমাবেশে গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ও কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে দুটি পক্ষ জড়িত।
তিনি বলেন, পালিয়ে যাওয়া ‘স্বৈরাচার’ সীমান্তের ওপার থেকে ‘অর্থ সরবরাহ করছে’, আর এখানে নির্বাচনের আগে টিকেট যারা বিক্রির চেষ্টা করেছে, তাদের সাহায্যে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা করছে।
এনসিপির আহ্বায়ক ও ঢাকার এমপি নাহিদ ইসলাম পাল্টা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ ও ভারতের সাথে এক ধরনের ‘সমঝোতা’ করে দেশ চালাচ্ছে সরকার।
সর্বশেষ জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ তিন নেতা ভারতের উচ্চপর্যায়ের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে ‘গোপন বৈঠক’ করেছেন বলে অভিযোগ তোলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন।
অভিযোগ অস্বীকার করে গোলাম পরওয়ার প্রমাণ দিতে বললে রাশেদ খাঁন তার অভিযোগ ‘শতভাগ সত্য’ বলে দাবি করেন। এ দাবির স্বপক্ষে তিনি ফেইসবুকে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন।
তবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষে ভিডিওটি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে রাশেদ খাঁন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘গোপন আঁতাত’ করে জামায়াতের বিরুদ্ধে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টার অভিযোগ আনেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও অন্তত তিনবার বিরোধী দলকে ইঙ্গিত করে অভিযোগ করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, দলটি ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির সঙ্গে ‘আঁতাতের’ চেষ্টা করছে।
অভিযোগের ভিত্তি আছে?
গেল কয়েক মাসে আওয়ামী লীগের ফেরা নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের এসব অভিযোগের ভিত্তি আছে? প্রমাণইবা কী?
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতাদের কাছে যেমন জানতে চেয়েছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, তেমনি অন্য রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতার সঙ্গেও কথা বলেছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার বলেন, “না এটা ব্লেইম গেইম না, প্রকৃতপক্ষে আমরা খুব সিরিয়াসলি এবং সিনসিয়ারলি দেখছি। আওয়ামী লীগের একটা গোপন সংযোগ সরকারের একটি অংশ মেইনটেন করে যাচ্ছে।”
গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক নজরদারির মধ্যে একদিনে সারাদেশে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি এলাকায় আওয়ামী লীগের মিছিল করা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “এটা আপস।”
এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর দাবি, যেহেতু এখন আওয়ামী লীগ মাঠে নামার চেষ্টা করছে, তাই বিরোধী দলকে ষড়যন্ত্র করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িয়ে তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের ষড়যন্ত্র করছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন তার অভিযোগগুলোর বিষয়ে বলেন, “এগুলোর পেছনে যুক্তি থাকে, তথ্য থাকে। আমি নিজেও গোলাম পরওয়ারের বিষয়ে ফেইসবুকে লিখেছি।
“আমার মতো দায়িত্বশীল জায়গা থেকে তো আমি বলে দিলাম, হয়ে গেল, এমন তো হয় না, তাই না?”
তার দাবি, আওয়ামী লীগকে সাথে নিয়ে জামায়াত আন্দোলন করার ব্যাপারে ইতোমধ্যে ‘সম্মত’ হয়েছে। ছিয়ানব্বইয়ের মতো আন্দোলন করার সমস্ত ‘ছক তারা তৈরি করছে’।
প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন, ফলে এটা কেবল ব্লেইম হিসেবে না দেখা ভালো।’
বিএনপির মিত্র বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকও বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা হবে বলেছেন দলটির এক জন নেতা।
দলের স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেছেন, এ নিয়ে অন্যান্য দলের সঙ্গেও আলোচনা করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী।
দলটি কেন্দ্রীয় কমিটির এক জন নেতা বলেন, “আওয়ামী লীগ প্রশ্নে সরকার নমনীয়, কিন্তু কতখানি হবে তা নির্ভর করছে আওয়ামী লীগের আচরণের ওপর। তাদের আন্তর্জাতিক বন্ধুদের সহযোগিতা, দলের নেতাকর্মীদের সাহসিকতাও ভূমিকা রাখবে এতে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘‘দোষারোপের বিষয়টি আমাদের দেশের রাজনীতিতে সাধারণ একটি ব্যাপার, একটি স্বাভাবিক বিষয়।’’
সাবেক এই প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, “আওয়ামী লীগের সঙ্গে তারা (জামায়াতে ইসলামী) আন্দোলন করেছে, তাদের সখ্যতাও ছিল।”
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াত নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলানো, নির্যাতন, ‘গুম-খুনের’ কথা তুলে ধরে অভিযোগ নাকচ করে দেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।
তিনি দাবি করেন, সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করতে এ অভিযোগ করা হচ্ছে।
“এজন্য কিছু ভাড়াটে লোকজন জোগাড় করেছে সরকার।”
‘দোষারোপের খেলা’ নাকি দায় এড়ানোর চেষ্টা?
সরকার ও বিরোধী পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগকে ‘ব্লেইম গেইম’ হিসেবে দেখছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না।
তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি বা এর আগে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়েও এরকম ‘দোষারোপের খেলা’ হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুশতাক হোসেন মনে করেন আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়া উচিৎ। গণঅভ্যুত্থানে জনগণ তাদের দুঃশাসনের জবাব দিয়েছে।
তবে শেখ হাসিনার সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে, না হলে ভবিষ্যতে এর রেশ ও প্রভাব থাকবে, বলেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীনের মতে, দেশে সরকারি দল প্রায়ই দোষারোপের রাজনীতি করে থাকে। তারা অন্যের ঘাড়ে দায় চাপাতে চায়। তবে সরকারকে দোষারোপ করা বা দায় দেওয়ার জায়গা থেকেই এটা হয়ে আসছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, “আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন বা শেখ হাসিনার ভারত থেকে আসার যে বিষয়টি, সরকারের উপদেষ্টারা বলছেন, তিনি ফিরলে নিরাপত্তা পাবেন। সব মিলিয়ে ধারণা তৈরি হচ্ছে তিনি আসতে পারেন। সবাই জানে এগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতির পার্ট, আন্তর্জাতিক নেগোসিয়েশনের পার্ট, বাংলাদেশের সরকার এতে যুক্ত থাকবে। কিন্তু আপাতত দেখে মনে হচ্ছে কেউই দায় নিতে চায় না। সে থেকেই একে অপরকে দোষারোপ করছে।”
