পদত্যাগ করার জন্য অনেক চাপ ছিল: একান্ত সাক্ষাৎকারে সামান্তা শারমিন
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি দলের অভ্যন্তরীণ ‘গণতন্ত্রহীনতা’, নারীদের ‘কোণঠাসা’ করা এবং ‘মতাদর্শিক বিচ্যুতির’ বিস্ফোরক সব অভিযোগ সামনে এনেছেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গড়া রাজনৈতিক দল এনসিপি তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে একটি প্রথাগত দলে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন দলটির সদ্য পদত্যাগী নেতা সামান্তা শারমিন।
পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পরদিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি দলের অভ্যন্তরীণ ‘গণতন্ত্রহীনতা’, নারীদের ‘কোণঠাসা’ করা এবং ‘মতাদর্শিক বিচ্যুতির’ বিস্ফোরক সব অভিযোগ সামনে এনেছেন।
এনসিপি ছাড়ার সিদ্ধান্ত হুট করে নেননি জানিয়ে সামান্তা বলেছেন, পদত্যাগ করার জন্য দলের ভেতর থেকে যেমন চাপ ছিল, তেমনি বাইরে থেকেও বিভিন্ন পক্ষ তাকে এ সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দিয়েছে।
তবে প্রায় এক বছর ধরে দলের ভেতরে থেকে ‘নিজের অবস্থান তুলে ধরার’ চেষ্টা করেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মত ‘কোনো কার্যকর ফোরাম না থাকায়’ পদত্যাগ করেছেন।
সামান্তা বলেন, “আমি দলের হাত ছেড়ে দিয়ে পদত্যাগ করা, এটার পক্ষপাতি আমি কখনোই ছিলাম না। ... কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে যে আমার যতটুকু সাধ্য, সামর্থ্য, শক্তি যতটুকু ছিল, ততটুকু আসলে ফুরিয়েছে এই পার্টিকে আসলে ওই পথ থেকে টেনে বের করে আনার জন্য।”
তিনি জানিয়েছেন, আপাতত নতুন কোনো রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। আগামী দুই-তিন মাস বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, প্ল্যাটফর্ম ও ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করে নিজের পরবর্তী রাজনৈতিক ভূমিকা ঠিক করতে চান।
‘সুখকর অনুভূতি নয়’
পদত্যাগের পর নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সামান্তা বলেন, সিদ্ধান্তটি তার জন্য সুখকর ছিল না। কারণ এনসিপি গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন। দল প্রতিষ্ঠার আগে নাগরিক কমিটির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তার ভাষায়, নাগরিক কমিটিই এনসিপির ভিত্তি। সেই ইতিহাস বাদ দিলে দলটির অস্তিত্বের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে।
“নিজের হাতে গড়ে তোলা দল কেউই ছাড়তে চায় না, এটা আসলে আমার জন্য কোনো সুখকর অনুভূতি না। আর প্লাস এনসিপি তো আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে।”
তবে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিরোধের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলে জানান সামান্তা।
দলের সঙ্গে সামান্তার মতবিরোধের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছিল গত নির্বাচনের আগে এনসিপি যখন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গড়ল, তখন থেকেই। তাহলে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে এত দীর্ঘ সময় কেন লাগল?
সামান্তা বলেন, নিজের রাজনৈতিক বোঝাপড়া ও যুক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা যত দিন ছিল, তত দিন দলকে ভুল পথ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি মনে করতেন, পদত্যাগ কোনো সমাধান নয়। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও যখন পদত্যাগের কথা ভেবেছেন, তখন তাদের নিরুৎসাহিত করেছেন।
তবে তার মতে, দল পুনর্গঠনের পর ভিন্নমত তুলে ধরার মতো ফোরাম আর অবশিষ্ট ছিল না।
“এখন যখন আর কোনো ফোরাম নাই, তো মানে আমি আসলে কোথায় ফাইটটা করব?”
সামান্তার ভাষ্য, আগে দলের সাধারণ সভা ও নির্বাহী কমিটির বৈঠকে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ ছিল। রাজনৈতিক পর্ষদের সঙ্গেও তিনি আলোচনা করেছেন। কিন্তু তার উত্থাপিত আপত্তিগুলো দল আর ভুল বলে মনে করেনি।
এখন সাধারণ সভা কবে হবে, আদৌ হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি এনসিপির আত্মপ্রকাশ মঞ্চে সামান্তা শারমিন।
‘উনি কীসের ভিত্তিতে আহ্বায়ক হলেন?’
এনসিপির সাংগঠনিক পুনর্গঠনের সমালোচনা করে সামান্তা বলেন, শুধু তার নয়, আরও অনেকের সাংগঠনিক গুরুত্ব কমে যাওয়ার ঘটনা এক দিনে ঘটেনি। একই সঙ্গে যারা নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন, তাদের যোগ্যতা নির্ধারণের মানদণ্ডও প্রকাশ করা হয়নি।
তার ভাষ্য, একজনকে কোনো দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কী কী যোগ্যতা প্রয়োজন, তা দলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা উচিত। কিন্তু এনসিপিতে দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে এমন কোনো প্রকাশ্য মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। রাজনৈতিক পর্ষদ ‘নিজেদের বিবেচনামত’ পদ বণ্টন করেছে।
“কোনো দায়িত্ব আপনি যখন কাউকে অর্পণ করেন, আপনি যখন নিয়োগ দেন, তখন কিন্তু সেটার ক্রাইটেরিয়াটা একটা প্রকাশ্য ক্রাইটেরিয়া থাকে। ... কিন্তু এরকম কোনো ক্রাইটেরিয়া দলের পক্ষ থেকে ওপেন করা হয়নি।”
সামনে কাউন্সিল আয়োজনের কথা থাকলেও তার আগে আহ্বায়ক কমিটিতে বড় ধরনের পরিবর্তন কেন আনা হল, সেই প্রশ্ন তুলে সামান্তা বলেন, “একদম টপ টু বটম পুরোটাই পরিবর্তন করে ফেলা হল, কীসের ভিত্তিতে পরিবর্তন করে ফেলা হল? কোনো ধরনের জবাবদিহিতা নাই।”
তার দাবি, ১৯৬ সদস্যের কমিটিতে ১৬০ জনকে পদায়ন করা হয়েছে। পদ বণ্টনের এ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ পদ্ধতিতে হয়নি।
“আপনি দেখেন যে, আমার যুগ্ম আহ্বায়ক পদ, আমি কেন যুগ্ম আহ্বায়ক, আমি তো সদস্যও থাকতে পারতাম, কিসের ভিত্তিতে আমাকে যুগ্ম আহ্বায়ক পদ দেওয়া হল? আমাকে সদস্য কেন করা হল না?
“আরগুমেন্টটা আসছে যে আমাকে কেন সিনিয়র পোস্ট দেওয়া হল না? আমি আরগুমেন্ট করতে চাই আমাকে কেন জুনিয়র পোস্ট দেওয়া হল না? এরকম তো সব পোস্টের ব্যাপারেই আপনি প্রশ্নগুলো করতে পারেন। যিনি আহ্বায়ক হয়েছেন, উনি কি কীসের ভিত্তিতে আহ্বায়ক হলেন? কোন ক্রাইটেরিয়ার ভিত্তিতে আহ্বায়ক হলেন? উনি তো নির্বাচিত না।”
সামান্তা শারমিন এক সময় ছিলেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। সম্প্রতি কমিটি পুনর্গঠনে তাকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়।
‘এনসিপি পুরোনো রাজনৈতিক ধারায় ফিরে গেছে’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা এনসিপি পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বদলানোর লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে কি না, এমন প্রশ্নে সামান্তা বলেন, দলটি শেষ পর্যন্ত প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার দিকে ঝুঁকেছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে এনসিপির অবস্থানের সঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার তুলনা করেন।
সামান্তার ভাষ্য, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদ নির্বাচন করার ক্ষেত্রে বিরোধী দলের মতামত রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল এনসিপি। সেজন্য সাত বা আট সদস্যের একটি ফোরামের কথা বলা হয়েছিল, যেখানে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন, “লাইক মাইন্ডেড পিপল দিয়ে গণতন্ত্র এস্টাব্লিশ করা যায় না, বিরোধী মতকে সাথে নিয়ে গণতন্ত্র এস্টাব্লিশ করতে হয়।”
কিন্তু দলের ভেতরে কমিটি পুনর্গঠনের সময় বিরোধী মতের প্রতি একই ধরনের মনোভাব দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সামান্তার মতে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিরোধী দলের মতামতকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করার কথা বললেও নিজেদের দলের ভেতরে ভিন্নমতকে উপেক্ষা করেছে এনসিপি।
“এনসিপির তার যে রাষ্ট্রীয় প্রস্তাবনা, সেখানে তার প্রস্তাবনা একরকম, নিজের পার্টির ভিতরে অন্যরকম।”
তার আশঙ্কা, ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে দলটি বিরোধী মতকে জায়গা দেওয়ার ক্ষেত্রে একই ধরনের অসংগতি দেখাতে পারে।
‘একমত হতে বাধ্য করার চাপ ছিল’
এনসিপির নেতৃত্ব দল পরিচালনায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল কি না, এমন প্রশ্নে সামান্তা বলেন, বিষয়টিকে শুধু একজন ব্যক্তির নেতৃত্বের সমস্যা হিসেবে দেখলে তা সরলীকরণ হবে। বরং তার মতে, দলের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তার আধিপত্য তৈরি হয়েছিল।
তিনি জানান, দলের শেষ পর্যায়ে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক ধারার বিপরীতে তিনি ও নাহিদা সারোয়ার নিভা অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে দলের অন্যদের ‘একমত হতে’ বাধ্য করা হয়েছে।
“পার্টির মধ্যে একটা প্রচণ্ড প্রেশার আছে যে একমত হওয়ার, বাধ্য করা হবে একমত হতে।”
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়কের পদ ছেড়ে আসা সামান্তা বলছেন, জোট গঠন ও দলের রাজনৈতিক নীতির বিষয়ে তিনি প্রকাশ্যে ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলেন। এমনকি সংসদে এনসিপির একজন সংসদ সদস্যের প্রত্যেক উপজেলায় দলীয় কার্যালয় স্থাপনের বক্তব্যেরও বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু এসব বিরোধিতা দলের নেতৃত্ব ‘সহজভাবে গ্রহণ করেনি’।
সামান্তার ভাষ্য, দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে গোপন ব্যালট ও অনানুষ্ঠানিক বোঝাপড়ার চর্চা থাকায় নেতাকর্মীরা নিজেদের পদ নিশ্চিত হওয়ার আগে ভিন্নমত প্রকাশ করতে চাইতেন না।
তাজনূভা জাবীন ও তাসনিম জারার সঙ্গে সামান্তা শারমিন। তারা কেউ আর এখন এনসিপিতে নেই।
নারী নেতাদের কণ্ঠ ‘উপেক্ষিত’
এনসিপির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সামান্তা।
তার অভিযোগ, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সামনের সারিতে থাকলেও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাদের মতামত যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
জোট গঠনের সিদ্ধান্তের সময় দলের রাজনৈতিক পর্ষদে ১০ জন সদস্য ছিলেন বলে জানান সামান্তা। তাদের মধ্যে তিনজন নারী—তাসনিম জারা, নাহিদা সারোয়ার নিভা ও তিনি নিজে। বাকি সাতজন ছিলেন পুরুষ।
সামান্তার দাবি, তিন নারী সদস্যই জোটের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তাদের আপত্তিকে নারীদের একটি বৃহত্তর অংশের প্রতিনিধিত্বকারী মতামত হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।
“যখন আমরা ৩ জন নারী একই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করছি, আমাদের কথাটাকে নারী সমাজের একটা বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব এবং কণ্ঠস্বর হতে পারে, ৫০ শতাংশ মানুষের কণ্ঠস্বর হতে পারে, এটার অর্থে বিবেচনায় করা হয়নি।”
তিনি বলেন, ওই সিদ্ধান্তের সঙ্গে এনসিপির ঘোষিত অবস্থানের মিল ছিল না। পরে তাদের বলা হয়েছিল, তারা ওই ফোরামে নারী হিসেবে ছিলেন না; বরং নিজ নিজ যোগ্যতায় ছিলেন।
এ যুক্তির মধ্য দিয়ে নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি ‘এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে’ বলে মনে করেন সামান্ত।
তিনি বলেন, “এটা একটা পুরুষতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত, নারী বনাম পুরুষ হয়ে গেছে এটা এবং আমাদের কণ্ঠস্বরকে নারী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।”
এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করার কারণে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি সামান্তা শারমিন।
জামায়াতের সঙ্গে জোট প্রশ্নে আপত্তি
এনসিপির জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা করতে গিয়ে একঘরে হয়ে পড়েছিলেন কি না, এমন প্রশ্নে সামান্তা বলেন, তার আপত্তিকে শুধু জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা হিসেবে দেখলে বিষয়টি ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা হবে না।
তার বক্তব্য, সংস্কারপন্থি নয়–এমন পুরোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নতুন দলের জোট করা উচিত নয়। কারণ এতে নতুন দলের সংস্কারের রাজনীতি করার সুযোগ সংকুচিত হয়।
“পুরোনো দলের স্ট্রাকচার আছে এমন কোনো দলের সাথে নতুন দলের স্ট্রাকচার একসাথে জোট হতে পারে না। তাহলে আর নতুন দলটি পুরাতন সংস্কারের পুরাতন দলের বা পুরাতন ব্যবস্থার সংস্কারের বিরোধী, মানে সংস্কারের রাজনীতি আর করতে পারবে না।”
তার অভিযোগ, এ অবস্থান নেওয়ার কারণে দলের ভেতরে তাকে চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। বিভিন্ন সভায় তার পক্ষে কথা বলার লোকও কমে গিয়েছিল।
একটি সাধারণ সভায় কমিটি পুনর্গঠনের বিরোধিতায় তাদের প্রস্তাব ৭১-১৫ ভোটে হেরে যায়। ওই ১৫টি ভোট পাওয়ার কারণেও অসন্তোষের কথা শুনতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
“আমাকে বলা হয়েছে, আপনি কি থামবেন, নাকি আপনাকে বহিষ্কার করব, এ ধরনের কথাও বলা হয়েছে।”
তবে একঘরে হয়ে পড়ার চেয়েও সামান্তার কাছে বড় হতাশার বিষয় হল, এত চাপের মধ্যেও দলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে না পারা।
জামায়াতের ‘ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ’
জামায়াতকে সংস্কারের রাজনীতির ধারক মনে করেন না বলে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন সামান্তা।
তার মতে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রকৃত রাজনৈতিক পরিচয় বুঝতে হলে দলটির গঠনতন্ত্র, ঘোষণাপত্র ও কার্যক্রম দেখতে হয়। শুধু নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করলেই একটি দলকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রকল্পের ধারক বলা যায় না।
জামায়াতের রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সামান্তা বলেন, “তার যে রাজনৈতিক প্রকল্প, তার গঠনতন্ত্র এবং তার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, এক ধরনের ধর্মীয় শাসন কায়েম করাই তার উদ্দেশ্য। যদি এটা হয় তাহলে আসলে মানে তাকে গণতন্ত্রকে সে কীভাবে দেখে, সেটার কোনো ব্যাখ্যা, পরিষ্কার ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত আপনি জামায়াতের কাছ থেকে পাবেন না।
“বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরের মানুষ কীভাবে আসলে এরকম একটা গণসংগঠনে যুক্ত হবে, সেটার কোনো ক্রাইটেরিয়া আসলে জামায়াত দিতে পারবে না।”
এনসিপির এই পদত্যাগী নেতা বলেন, “ফলত তার (জামায়াতের) যে আল্টিমেট রাষ্ট্রপ্রকল্প, সেটা হচ্ছে একটা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ, একটা সামাজিক ফ্যাসিবাদের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করা। তো এখন মাঝখানে সে গণতান্ত্রিক প্রসেসে ইনভলভড থাকে, এটা তো তার আসল চরিত্র না। এটা তো তাকে বিভিন্ন সময় ধারণ করতে হয়।
“পাকিস্তানের সময় সে পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, যখন আবার মানে সরি, ব্রিটিশদের সাথে তাদের একটা ভালো সম্পর্ক ছিল, পরবর্তীতে পাকিস্তানের স্বপক্ষে ছিল, আবার পাকিস্তানের আবার ভাগার বিরোধিতা করেছে যখন হচ্ছে বাংলাদেশ আলাদা হয়, মানে নানান ধরনের অবস্থান, মানে ইস্যুভিত্তিক অবস্থান তাদেরকে নিতে দেখা যায়।”
সামান্ত বলেন, “এগুলো হচ্ছে সারভাইভাল টেকনিক তার, কিন্তু তার গঠনতন্ত্র এবং তার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী আপনি একটা জিনিসই দেখবেন, তারা আসলে এক ধরনের ধর্মীয় রাষ্ট্র, একক মনোলিথিক রাষ্ট্র তারা চায়।”
তবে যারা এনসিপিকে জামায়াতের ‘বি টিম’ বলেন, তাদের সঙ্গেও একমত নন তিনি।
তার মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও আদর্শ বিশ্লেষণ না করে এ ধরনের পরিচিতি দেওয়া রাজনৈতিক আলোচনাকে দুর্বল করে।
সামান্তা বলেন, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির কোথায় মিল বা অমিল, তা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
এনসিপিতে ফেরার আশা দেখছেন না
এনসিপির নেতৃত্ব যদি জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে এবং দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করে, তাহলে ফিরে যাবেন কি না—এমন প্রশ্নে সামান্তা বলেন, দলটি তার দীর্ঘদিনের শ্রমের ফল। তিনি কখনোই দল ছাড়তে চাননি।
তবে পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করা দলগুলোর পক্ষে পরে সেই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন বলে তিনি মনে করেন।
সামান্তা বলেন, “বাংলাদেশে এরকম কোনো উদাহরণ নাই, আমি পৃথিবীতেও এরকম কোনো উদাহরণ দেখি নাই, একবার পুরনো সিস্টেমের মধ্যে ফাংশন করে, পরবর্তীতে সে বিপ্লবী হয়ে গেছে, তারপরে সে একেবারেই আগের কোনো মানে পুরাতন সিস্টেমকে সে উৎখাত করেছে, এটা আমি দেখি নাই।”
এ কারণে এনসিপি আগের অবস্থানে ফিরে আসবে—এমন আশা তিনি আপাতত দেখছেন না। তবে দলটির প্রতি তার ‘শুভকামনা’ রয়েছে।
নতুন দল গঠনের সিদ্ধান্ত ‘এখনই নয়’
এনসিপি ছাড়ার পর নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করবেন কি না, সে বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চান না সামান্তা।
তিনি বলেন, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোকে সংস্কার করে নতুন ধরনের রাজনীতি করতে বাধ্য করাই তার রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ। এ ক্ষেত্রে জনগণের চাপকেই সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মনে করেন তিনি।
সামান্তার মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার এবং ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তবে নতুন রাজনৈতিক শক্তির সাংগঠনিক ও আদর্শিক কাঠামো কেমন হবে, তার সব উত্তর তার কাছে নেই বলেও তিনি স্বীকার করেন।
সামান্তা বলছেন, আগামী দুই-তিন মাস নতুন ও পুরোনো রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এবং ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। এমনকি এনসিপির সঙ্গেও আবার বসতে চান তিনি।
“আমার এখন পথ ওপেন, আমি সবার সাথেই কথা বলতে চাই।”
এরপর পরিস্থিতি বুঝে নিজের রাজনৈতিক ভূমিকা নির্ধারণ করবেন জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি হুট করে কোনোকিছুই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষপাতী না, এটা আমি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত হুট করে নিইনি।”
