সামান্তাদের বিদায়: তরুণদের রাজনীতির স্বপ্নে ভাঙন
জুলাইয়ের পর রাজনীতিতে তরুণদের ফেরা ছিল রাষ্ট্র বদলের বড় আশা। কিন্তু সামান্তা শারমিন, তাসনিম জারাদের মতো সম্ভাবনাময় তরুণদের এনসিপি ছাড়ার সিদ্ধান্ত কি সেই বিশ্বাসে চিড় ধরাচ্ছে? নতুন রাজনীতির সংকটের নানা দিক নিয়ে লিখেছেন সাজ্জাদ সাব্বির।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণদের ফিরে আসা ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম বড় অর্জন। দীর্ঘদিন ধরে যে তরুণ সমাজ রাজনীতিকে ঘৃণা করতে শিখেছিল, সেই সমাজের একটি অংশ আবার রাজনীতির মাঠে নেমেছিল রাষ্ট্র বদলের স্বপ্ন নিয়ে। তাদের চোখে রাজনীতি ছিল পরিবর্তনের হাতিয়ার। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল—মেধা, যোগ্যতা, নীতি ও আত্মমর্যাদা নিয়ে রাজনীতি করা সম্ভব। সেই বিশ্বাসের জায়গায় আবার হতাশা জমছে। সামান্তা শারমিন, তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীনদের মতো তরুণ নারীদের এনসিপি ছেড়ে চলে যাওয়া নিছক কয়েকটি পদত্যাগের ঘটনা হিসেবে দেখতে চাই না; ব্যক্তিগতভাবে আমি বাংলাদেশের নতুন রাজনীতির জন্য গভীর উদ্বেগের সংকেত হিসেবেই দেখি।
আমাদের প্রবীণ রাজনীতিবিদেরা তরুণদের হাতে কেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তুলে দিয়েছেন? দীর্ঘদিনের দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি, পেশিশক্তির দাপট, দলীয় চাটুকারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার আর ব্যক্তিপূজার রাজনীতি তরুণদের মনে রাজনীতি সম্পর্কে ভয়াবহ নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে। সেখানে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্যের মূল্য বেশি; নীতির চেয়ে নেতার ইচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের মাধ্যম। ফলে ধীরে ধীরে ‘আই হেইট পলিটিক্স’ নামে একটি প্রজন্মের জন্ম হয়েছিল। শিক্ষিত তরুণেরা রাজনীতি থেকে দূরে সরে গিয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে; রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জায়গাটি ছেড়ে দিয়েছে পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর হাতেই।
এর ফল আমরা বারবার দেখেছি—এক রাজনৈতিক শক্তির পতনের পর আরেক শক্তি ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। মুখ বদলালেও ক্ষমতার চরিত্র কখনোই বদলায়নি। এই বদল অনেকটা এমন ছিল যে, এক অনিষ্ট থেকে আরেক অনিষ্টে ক্ষমতার হাতবদল। নতুন প্রজন্মের সামনে বিকল্প রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সুযোগও তৈরি হয়নি।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সেই বৃত্ত ভাঙার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। রাজনীতি নিয়ে তরুণদের মধ্যে নতুন আগ্রহ, সচেতনতা ও আকাঙ্ক্ষা জন্মেছিল। শিক্ষিত, মেধাবী, পেশাজীবী ও বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণির তরুণেরা রাজনীতিতে যুক্ত হতে শুরু করেছিলেন। তারা পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বাইরে নতুন রাষ্ট্রচিন্তা, নীতিনির্ভর রাজনীতি ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। এনসিপি সেই আকাঙ্ক্ষার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ হয়ে উঠেছিল।
সামান্তা, জারা, তাজনুভাদের উপস্থিতি এই জায়গায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তারা দেখিয়েছেন, নারীরাও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে থাকতে পারেন। রাজনীতি করতে হলে পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, পেশিশক্তি, অর্থবল কিংবা ব্যক্তিগত আনুগত্যের প্রয়োজন হয় না। যুক্তি, গবেষণা, নীতি ও আত্মমর্যাদা নিয়ে রাজনৈতিক পরিসরে জায়গা তৈরি করা সম্ভব। দেশের তরুণদের কাছে তাদের উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান অনুপ্রেরণা।
কিন্তু সেই সম্ভাবনার জায়গাটি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
সামান্তা শারমিনের ৫ নভেম্বরের পদত্যাগের বক্তব্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি এসেছে—জামায়াতের সঙ্গে জোট, নির্বাচনি কৌশল, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং দলীয় কাউন্সিল ছাড়া সাংগঠনিক পুনর্গঠন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গত প্রায় এগারো মাস ধরে তিনি দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত প্রস্তাব, অভিযোগ ও আলোচনার মাধ্যমে অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টা ছেড়ে তিনি দলত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর আগে তাসনিম জারা ও তাজনূভা জাবীনও জোটনীতি নিয়ে মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটে দল ছেড়েছিলেন।
এখানে এনসিপির সিদ্ধান্তের পক্ষে থাকা বাস্তব যুক্তিগুলোও উপেক্ষা করা যায় না। একটি নবীন রাজনৈতিক দলের পক্ষে অল্প সময়ে দেশব্যাপী সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি, নির্বাচনি জনবল সংগ্রহ, অর্থায়ন, ভোটকেন্দ্রভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনি সহিংসতার ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন। নির্বাচনি রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা ও সংগঠনের শক্তি বড় সম্পদ। দলটির নেতৃত্বের কাছে বৃহত্তর জোটে অংশ নেওয়া নির্বাচনি সক্ষমতা বাড়ানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতের সংস্কার আন্দোলনে শক্তি সঞ্চয়ের কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই হিসাবকে এক কথায় অযৌক্তিক বলা যায় না।
কিন্তু রাজনৈতিক কৌশলেরও মূল্য দিতে হয়। নির্বাচনি সাফল্য অর্জনের জন্য স্বল্পমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে; কিন্তু সেই কৌশল যদি দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক পরিচয়, সাংগঠনিক স্বাতন্ত্র্য ও সমর্থকদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে লাভের চেয়ে ক্ষতি বড় হয়ে উঠতে পারে। নির্বাচনে কয়েকটি আসন পাওয়া সম্ভব, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে যে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল, তা হারিয়ে গেলে পুনরুদ্ধার কঠিন হবে। যদিও এনসিপি রাজনৈতিক জোটে থাকলেও এখনো স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রেখেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তবে আমার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কে সঠিক আর কে ভুল—সেই হিসাব বের করা নয়। প্রশ্ন হলো, নতুন রাজনীতির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সেটি ধরে রাখার মতো রাজনৈতিক পরিবেশ কি আমরা গড়ে তুলতে পারছি?
রাজনৈতিক সামাজিকীকরণের তত্ত্বমতে, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক পরিসর ও রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্য দিয়ে মানুষ রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। কোনো প্রজন্ম যদি রাজনীতিতে অংশ নিয়ে বারবার অপমান, অবমূল্যায়ন, মতপ্রকাশের বাধা ও আদর্শিক হতাশার মুখোমুখি হয়, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রাজনীতি আবারও অনাকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। জুলাইয়ের পর তরুণদের মধ্যে যে রাজনৈতিক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, সেটিকে স্থায়ী রাজনৈতিক অংশগ্রহণে রূপান্তর করতে না পারলে সেই আগ্রহও একসময় হারিয়ে যেতে পারে।
একইভাবে তরুণ রাজনীতিবিদদেরও বাস্তবতা, নিজ নিজ দলীয় অবস্থান ও নীতির প্রতি আস্থাশীল হওয়ার পাশাপাশি উদার ও সহনশীল হতে হবে। ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতি তরুণদের আস্থা ফিরিয়ে আনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই বৃহত্তর স্বার্থটি বুঝতে ব্যর্থ হলে, ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর তরুণদের রাজনীতির যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সেটিও হয়তো একসময় অর্থহীন হয়ে পড়বে।
আমরা কি আবার এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করছি, যেখানে মেধাবী তরুণেরা রাজনীতিতে আসবেন, কিছুদিন পর হতাশ হয়ে চলে যাবেন, আর রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর হাতেই থেকে যাবে?
সামান্তা, জারা ও তাজনুভাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটি তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কিন্তু তাদের মতো তরুণ নেতৃত্বের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত হওয়া দেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তারা কোথায় আছেন, কোথায় যাবেন, কোন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করবেন—সেটি মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের রাজনীতি তাদের মতো মেধাবী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন তরুণদের জন্য কতটা জায়গা তৈরি করতে পারছে।
জুলাইয়ের পর তরুণেরা রাজনীতিকে নতুন করে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। সেই বিশ্বাস ভেঙে গেলে ক্ষতিটা কোনো নির্দিষ্ট দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতন্ত্র, রাজনৈতিক সংস্কার ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির সম্ভাবনা।
এই দেশের রাজনীতি বারবার পুরোনোদের হাতে ফিরেছে। নতুন প্রজন্ম এবার একটি নতুন পথের স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্নকে দলীয় হিসাব, ক্ষমতার সমীকরণ ও নেতৃত্বের সংকীর্ণতার কাছে হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত হবে না। কারণ তরুণেরা রাজনীতি ছেড়ে দিলে রাজনীতি শূন্য থাকবে না; সেই জায়গা আবার দখল করবে পুরোনো ক্ষমতার সংস্কৃতি। আর তখন জুলাইয়ের পর নতুন রাজনীতি নির্মাণের যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তার অপচয়ের দায় আমাদের সবাইকে বহন করতে হবে—হয়তো সবচেয়ে বেশি এনসিপিকেই বহন করতে হবে।
সাজ্জাদ সাব্বির: কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি, জাতীয় যুবশক্তি। ইমেইল: sajjadsabbir24@gmail.com
