ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত ধরে নিয়েছেন বাংলাদেশ সবকিছু যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে দিয়েছে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
ঢাকায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলের কিছু মন্তব্যকে ‘অস্বস্তিকর ও ভুল বার্তা’ হিসেবে বর্ণনা করেন হুমায়ুন কবির।
ইইউ রাষ্ট্রদূতদের খুশি করার জন্য বাংলাদেশ সরকার এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কিনতে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। কেবলমাত্র দেশের ব্যবসায়ীক প্রয়োজনেই উড়োজাহাজগুলো কেনা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
পাশপাশি এয়ারবাসের উড়োহাজাজ কেনার ইস্যুতে ঢাকায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলের কিছু মন্তব্যকে ‘অস্বস্তিকর ও ভুল বার্তা’ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন তিনি।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য ইউরোপীয় কোম্পানি এয়ারবাস এর কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কিনতে বুধবার চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতদের সামনে বেশ জোরালো কণ্ঠেই এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
‘ভূরাজনৈতিক চাপে’ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বোয়িং কোম্পানির ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার পর এয়ারবাস থেকে আরও ১০টি উড়োজাহাজ কিনছে বাংলাদেশ- এমন আলোচনার মধ্যেই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এ ভাষ্য এল।
অনুষ্ঠানে ফরাসি রাষ্ট্রদূত শারলকে উদ্দেশ্য করে হুমায়ুন কবির বলেন, “আপনি কীভাবে যেন ধরে নেন, আমরা সবকিছু যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে দিয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমরা যা করি তা বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আপনারা জানেন যে, আমরা আপনাদের (ইউরোপীয়দের) সাথে কী করছি, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মাথাব্যাথা নেই। আর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমরা কী করছি তাতে আপনাদেরও মাথাব্যাথা থাকার কথা নয়। তবে দেশের উন্নয়ন করা আমাদের দায়িত্ব এবং আমরা যেখানে উপযুক্ত মনে করব সেখানেই আপনাদের সাথে নিয়ে তা করব।”
গত সেপ্টেম্বরে দুই দফায় মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে বাংলাদেশ সরকার। এই চুক্তির পর এয়ারবাসের উড়োহাজাজ বিক্রি করতে রীতিমত ছোটাছুটি বেড়ে যায় ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতদের। তাদের অনেক বক্তব্য সরকারের প্রতি রীতিমত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়।
গত ২২ সেপ্টেম্বর ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশের (ডিকাব) অনুষ্ঠানে ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব এগিয়ে নিতে হলে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনা ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেন ঢাকায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে। বিষয়টি বাংলাদেশ কীভাবে এগিয়ে নেবে, সেটি বর্তমান সরকারের জন্য একটি ‘ভালো পরীক্ষা’ বলেও বর্ণনা করেন তিনি।
ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত বলেন, “আমি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের উপর জোর দিচ্ছি এবং এটা এমন এক বার্তা, সেটা বর্তমান সরকারের কাছেও আমরা দিচ্ছি। কেননা আমরা মনে করি এটা অত্যাবশ্যকীয়। আমি মনে করি এটা বর্তমান সরকারের জন্য ভালো পরীক্ষা এবং এই সরকার এবং বিমানের প্রতি আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে।”
এর এক সপ্তাহের মাথায় ২৯ সেপ্টেম্বর বিমান মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এয়ারবাস কেনার ঘোষণাও দেন। ওই ঘোষণার সময় অবশ্য বিমানমন্ত্রী এটাও বলেন যে, “ভূরাজনৈতিক চাপে নয়, যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় নিয়েই এসব উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে।”
যদিও এর আগে ১ সেপ্টেম্বর বোয়িং কেনা নিয়ে বিমানমন্ত্রী মিল্লাত বলেছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের চাওয়া অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ বাংলাদেশ কিনছে।
ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতকে এক হাত
এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বুধবার বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের কণ্ঠ ছিল আগের চেয়ে জোরাল। অন্যদিকে ইউরোপীয় দূতেরা এলডিসি থেকে উত্তরণ, ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে পাশে থাকার আশ্বাসসহ বাণিজ্য সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথাই বলে গেছেন।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের মানুষের ভোটে নির্বাচিত এই সরকার দেশের স্বার্থের অনুকূলে নয় এমন কোনো চুক্তিতে সই করবে না। সরকার টেবিলে বসা আমাদের ইইউ রাষ্ট্রদূত বন্ধুদের খুশি করার জন্য এই এয়ারবাস চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। বাংলাদেশ সরকার এই চুক্তিতে সই করেছে আমাদের বিমান ভ্রমণের চাহিদা পূরণ করার জন্যে।
“বাংলাদেশের কাউকে খুশি করার জন্য চুক্তি করতে হয় না, প্রয়োজন বলেই বাংলাদেশ চুক্তি করে। সুতরাং যেখানে একটি প্রয়োজনের ব্যবসায়িক ভিত্তি রয়েছে, আমরা তা করব। আমরা এয়ারবাসের সাথে করব, আমরা বোয়িংয়ের সাথে করব, অর্থনৈতিক খাতের যে কোনো ক্ষেত্রে আমরা এটি করব। আমরা কোনো দ্বিধা করব না।”
ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতকে বাংলাদেশের খুব ভালো বন্ধু বর্ণনা করে হুমায়ুন কবির বলেন, “মাঝে মাঝে গুগল সার্চ ইঞ্জিনে তিনি কিছুটা দুঃস্বপ্ন দেখেন। আপনি কীভাবে যেন ধরে নেন যে আমরা সবকিছু যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে দিয়েছি? আমরা নাকি এমন কোনো বাণিজ্য চুক্তি করেছি যা এখানে একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত নাও করতে পারে। আমি আপনাকে বলতে চাই, বাংলাদেশ ব্যবসা করে তার প্রয়োজন এবং স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে।
“জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই বাংলাদেশ এমন কিছু করে না, যা তার ব্যবসার যুক্তি ও মানুষের প্রয়োজন মেটায় না। সুতরাং অযৌক্তিক চিন্তাভাবনা করা কিংবা অস্বস্তিকর কোনো বার্তা ছড়ানো উচিত নয়, যা ভুল বার্তা পাঠায়। আমরা আজ এখানে উপস্থিত হয়েছি কারণ এসব আলোচনা নিয়ে সবসময় ইতিবাচক ছিলাম।”
বক্তৃতার শেষে ইউরোপীয়দের জন্য আরও ব্যবসা আসছে এমন আশা দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জনগণের মধ্যকার পারস্পরিক শুভকামনা আমাদের অংশীদারত্বকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি যে, বাংলাদেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে আরও অনেক ব্যবসা সামনে আসছে।”
চীনের তৈরী ‘ভারতীয় স্যুট’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্য শুরু করেছিলেন নিজের পরনে থাকা ‘ভারতীয় স্যুট’ এর গল্প দিয়ে। তিনি বলেন, “আমি যখন ভেতরে আসলাম, কয়েকজন মানুষ আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, দারুণ ইন্ডিয়ান স্যুট। অনেক মার্জিত দেখাচ্ছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রীও এমনটি বলেছেন। এরপর আমি বিমানমন্ত্রীর বাম কানে গিয়ে চুপিচুপি বললাম, এটি আসলে চীনে তৈরি। অবশ্য, আমার কাছে বেশ কিছু মার্জিত ইন্ডিয়ান স্যুট রয়েছে; যা আমি বিভিন্ন উপলক্ষে পরে থাকি।”
