‘অদম্য-৩২’ ফুটবলকন্যার দুয়ারে এক অদম্য সম্পাদকের ছায়া
পাহাড়, নদী আর মেঠোপথ পেরিয়ে সাফজয়ী ৩২ ফুটবলকন্যার দুয়ারে পৌঁছানোর গল্পের সঙ্গে আর্থিক সংকটের মধ্যেও সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী কীভাবে তরুণ সাংবাদিকদের ডানায় হাওয়া দিতেন—সেই স্মৃতি লিখেছেন মোহাম্মদ জুবায়ের।
“ভাইয়া, একটা কথা ছিল।”
“ বলো, বলো।”
“সাফ জয়ী ৩২ জন মেয়ের বাড়িতে গিয়ে সাক্ষাৎকার নিতে চাই। প্রত্যেকের বাড়ি যেতে হলে তো খরচ অনেক…”
এতটুকু বলে থেমে গেলাম। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকটের অবস্থা বাকিদের মতো আমারও কিছুটা জানা। তাই আমার চুপ করে যাওয়ায় তৌফিক ভাই যা বোঝার বুঝে নিলেন। কখনও তাকে হো-হো করে হাসতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। অন্তত আদালতের বারান্দায় দৌড়ঝাঁপ শুরুর পর থেকে। কিন্তু তিনি এবার একটু জোরেই হাসলেন। তারপর বললেন, “ভালো কথা। কী করবে? প্রস্তাবনা তৈরি করেছ? প্রশ্নগুলো তৈরি করেছ? কী কী কনটেন্ট হতে পারে ভেবেছ?”
তারপর একটু নরম সুরে বললেন, “জানো তো, আমাদের অবস্থা…তবে যাও। জাহিদ, রাজীব ওদের সঙ্গে কথা বলে নিও। কাজ শেষের আগপর্যন্ত সবাইকে বলার দরকার নেই। এটা আমাদের এক্সক্লুসিভ কনটেন্ট হবে। আমি আকিবকে বলে দিচ্ছি, তোমার যা লাগবে দিতে।”
যখন তিনি প্রশ্ন করতেন, কথা বলতেন, এভাবেই গড়গড়িয়ে করতেন এবং বলতেন। নতুন বা ভিন্ন আঙ্গিকের উদ্যোগের কথা শুনলে আনন্দিত হতেন। সাহস জোগাতেন। নারী ফুটবলের প্রতি তার আগ্রহটা একটু বেশিই ছিল, পিছিয়ে থাকা এই মেয়েদের প্রতি তার অদ্ভুত এক আন্তরিকতা, দরদ ছিল। উদ্যোগটি নিয়ে তাই আগ্রহী ছিলাম আমিও। প্রস্তাবনার কাগুজে কাজগুলোও সেরে রেখেছিলাম আগেভাগে। তিনি বলা মাত্র টেবিলে রাখলাম সেগুলো।
গভীর মনোযোগ দিয়ে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু দেখলেন। ততদিন নানা চাপে-তাপে দৃষ্টিশক্তি কমে এসেছিল তার। তবু প্রতিটি লাইন পড়লেন। এরপর বললেন, “ঠিক আছে। বেরিয়ে যাও। কবে যাওয়ার কথা ভেবেছ? এই ১৫-২০ দিনে সব কমপ্লিট করতে পারবে তো? শরীরে কুলাবে? আমি আকিবকে বলে দিচ্ছি।”
আমি মনে মনে বেশ খুশি, ‘আকিবকে বলে দিচ্ছি’ মানে আমরা বেশ ভালো করেই জানি টাকা-পয়সার ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে। তৌফিক একটু থেমে বললেন, “ভালো একজন ক্যামেরাম্যানকে নিয়ে যেও। ভিডিও ঠিকঠাক হতে হবে। কাকে নিবে ঠিক করেছ?”
বললাম, “হ্যাঁ, ভাইয়া। ভেবে রেখেছি মুমুকে (মুবদিউর রহমান) নিব, খেলাধুলার প্রতি ওর আগ্রহ আছে।”
সেদিনের মিনিট দশেকের আলাপনে জন্ম নিল ‘অদম্য-৩২’। তৌফিক ভাইয়ের রুম থেকে বেরিয়ে এসে ছুটলাম রাজীব (নূর) দা, জাহিদ (জাহিদুল কবির) ভাইয়ের কাছে। তাদের পরামর্শগুলো টুকে নিলাম কাগজে। কথা হলো সুমন (আব্দুল হালিম) ভাই ও জাহেদ ভাইয়ের (আই খান) সঙ্গে। আকিব ভাইয়ের কাছে গিয়ে সরাসরি বললাম-“টাকা দেন, তৌফিক ভাই বলেছেন।” দিয়ে দিলেন তড়িৎ বেগে। মুমুকে বললাম-“চলেন ছুটতে হবে ১২/১৩ জেলায়।”
খেলার কনটেন্ট শুনে মুমু এক পায়ে খাড়া। বললেন, “আমি বাসায় গিয়ে তৈরি হয়ে আসছি।” বলে রাখা ভালো, তখন মুমুর স্ত্রী মাস ছয়েকের অন্তঃসত্ত্বা!
২০২৪ সালের খুব সম্ভবত নভেম্বরের সেই রাতে আমি আর মুমু ক্যামেরা, ব্যাকপ্যাক, ছোট্ট একটি লাগেজ, প্রয়োজনীয় কাগজ, খেলোয়াড়দের বাড়ির ঠিকানা নিয়ে ছুটলাম। প্রথম গন্তব্য কক্সবাজার, শাহেদা আক্তার রিপার বাড়ি। এই পর্ব শেষ করে রওনা দিলাম রাঙামাটি, ঋতুপর্ণা চাকমার বাড়ির উদ্দেশ্যে। সাতসকালে ঘাগড়াতে নামার পর একজন ঋতুপর্ণার বাড়ির রাস্তা দেখিয়ে দিলেন। দুজনে হাঁটা শুরু করলাম। পথিমধ্যে দেখি দুই দিকে দুই রাস্তা। আমি আর মুমু দুই পাহাড়ি রাস্তায় কিছুক্ষণ হেঁটে, কোনো দিশা না পেয়ে ফিরলাম আগের জায়গায়। এরপর পেছনে ফিরে, অনেক দূরের এক বাড়িতে গিয়ে জিজ্ঞেস করার পর পেলাম সঠিক রাস্তার সন্ধান। গেলাম ঋতুপর্ণার বাড়ি। তার উঠানে বসে সাক্ষাৎকার নিলাম। জীবনের কাহিনি শুনে আমরা হাসলাম, কাঁদলাম।
এরপর সেখান থেকে সরাসরি দুপুরে দুটি উইমেন’স সাফজয়ী এবং সেরা গোলকিপার হওয়া রুপনা চাকমার বাড়ি ঘুরে মনিকা চাকমার বাড়ি। মোটরবাইকে প্রায় তিন ঘণ্টা চেপে কাজ সেরে সন্ধ্যার দিকে রওনা দিলাম খাগড়াছড়ি আনাই ও আনুচিং মোগিনির সাক্ষাৎ পাওয়ার উদ্দেশ্যে। রাতের অন্ধকারে পৌঁছালাম সেখানে। বিজলি বাতির আলোয় নিতে হলো দুই বোনের সাক্ষাৎকার।
এরপর রওনা রংপুরের উদ্দেশ্যে, সিরাত জাহান স্বপ্নার বাড়ি। এভাবে পঞ্চগড়ে ইয়ারজান বেগম, ঠাকুরগাঁওয়ে কোহাতি কিসকু, সোহাগী কিসকু, সাগরিকা, স্বপ্না রানী, লালমনিরহাটে মুনকি আক্তারের বাড়িতে গিয়ে তাদের, তাদের কোচ, শিক্ষক, বাবা, মা, প্রতিবেশী, কখনও রিকশাচালক, কখনও ভ্যানচালক কিংবা অটোচালকের সাক্ষাৎকার নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম আমরা।
মাত্র ২০ দিনে এত ফুটবলারের সাক্ষাৎকার নেওয়া সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন তৌফিক ভাই। কেননা, ওই অল্প সময়ের ছুটি শেষ করে মেয়েদের ফেরার কথা ছিল ঢাকার ক্যাম্পে। একদিন হঠাৎ তার ফোন। অহেতুক আলাপ তার ভালো লাগত না। সোজা মূল কথায় এসে যেতেন। সেখানে স্নেহের সুরের প্রবল উপস্থিতি। বললেন, “কী অবস্থা তোমাদের? সুস্থ আছো তো? সবকিছু ঠিকঠাক চলছে তো? খাওয়া-দাওয়া কীভাবে করছ?”
আমি আর মুমু আছি দৌড়ের ওপর। নাওয়া-খাওয়ার নেই ঠিক। তবু মিথ্যা করে বলতে হয়, “ভাইয়া, ভালো আছি। আজ মুনকির সাক্ষাৎকারটা সারলাম। এ নিয়ে ১০ জনেরটা শেষ হলো। কাল ময়মনসিংহ রওনা দিব।” তৌফিক ভাই ঘুম, খাওয়া ঠিক রাখার অভিভাবকসুলভ পরামর্শ দিয়ে ফোন রেখে দিলেন।
আমি আর মুমু রাত-দিন এক করে, এক অদম্য সম্পাদকের ছায়া হয়ে পাহাড়-নদী-সমতল ঘুরে, সাফজয়ী ৩২ জন ফুটবলকন্যার বাড়ি বাড়ি ঘুরে এলাম। ওই ফুটবলকন্যাদের সঙ্গে তাদের কোচ, শিক্ষক, মা, বাবার সাক্ষাৎকার নিয়ে ফিরলাম। এবার প্রজেক্ট দাঁড় করানোর পালা। স্ক্রিপ্ট তৈরি, কোন কনটেন্টে কী শিরোনাম, কোন রিলস কতটুকু হবে-সব তৌফিক ভাই বুঝিয়ে দিলেন। আমরা লেগে পড়লাম কাজে। নাফীস, সাইফ, নুরুল ভিডিও তৈরির কাজগুলো করে দিলেন দক্ষতার সঙ্গে। কিন্তু এটা বিক্রি তো করতে হবে। একদিন শুনি, ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না!
তৌফিক ভাইয়ের রুমে ফের ছুটে গেলাম। দেখি, নামাজ পড়ছেন। আমি চুপি চুপি বের হয়ে এলাম। নামাজ শেষ করে একটু পর সহকারীকে দিয়ে ডেকে পাঠালেন। গেলাম তার রুমে। হোমিওপ্যাথি ওষুধ খেতেন, সেগুলো খেলেন। কিছুটা হতাশ, বিষণ্ণ, বিমর্ষ, ক্ষুব্ধ ছিলেন তিনি। কারণ, রাজনৈতিক পালাবদলে অনেকে মেয়েদের কনটেন্ট কিনতে আগ্রহী নয়। অথচ, ৩২ জন নারী সাফ জয়ীর তাদের বাড়িতে সাক্ষাৎকার শুধু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের হাতেই আছে। নানা চাপে-তাপে অন্যদের পিছুটান নেওয়াটা আসলে তিনি মন থেকে মানতে পারছিলেন না। সৎ মানুষের এই সমস্যা!
পিছিয়ে থাকা মেয়েগুলোর গল্প অপ্রকাশিত থেকে যাবে, এটা ভেবেই আকুল ছিলেন তৌফিক ভাই। কিছুক্ষণ আপন মনে গজগজ করলেন। বিড়বিড় করে অনেক কিছু বললেন। যার কোনোটাই আমার কানে পৌঁছাল না। মনে হলো যেন, প্রথাগত সিস্টেমকে তিনি ভাঙতে পারছেন না বলে অবিরাম শাপ দিচ্ছেন। ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছি আমি।
আর্কিমিডিসের ‘ইউরেকা, ইউরেকা’ বলার মতোই আচমকা তিনি শিশুতোষ চিৎকারে বলে উঠলেন, “চিন্তা কোরো না। একটা পথ তো পাওয়া যাবেই।” কী বলব আমি? তবে, স্বস্তির কথা, কিছুদিন পর এগিয়ে এলো বার্জার বাংলাদেশ, ফ্রেশ অনন্যা, লংকা বাংলা ফাইন্যান্স লিমিটেডের মতো সাহসী প্রতিষ্ঠানগুলো। যারা, আমার, তৌফিক ভাইয়ের, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কষ্টের প্রতিদান দিতে হাত বাড়িয়ে দিল। অবশেষে, প্রায় এক বছর পর আলোর মুখ দেখল অদম্য-৩২। সেই তৃপ্তি আজও সঙ্গী আমাদের সবার। কিন্তু এটাই যে শেষ, তা কল্পনা করিনি ঘুণাক্ষরেও।
এশিয়ান গেমস কাভার করে জাপান থেকে ফেরার পথে ২ অক্টোবর চীনের গুয়াংজু বিমানবন্দরে ছিল ১২ ঘণ্টার বিরতি। সেই বিরতির সময় স্পোর্টসের গ্রুপে সহকর্মী মোমিনের বার্তায় দেখলাম, তৌফিক ভাইয়ের চিরতরে চলে যাওয়ার খবর। অদ্ভুত শূন্যতায়, বিষণ্ণতায়, হাহাকারে আচ্ছন্ন হয়ে গেল সবকিছু। বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছিল খবরটা।
তখন শুধু মনে হলো, কত প্রতিকূলতা, উপেক্ষা, প্রিয়জনের ভ্রুকুটি, সতীর্থদের উন্নাসিকতার স্রোত পেরিয়ে আপনিও তো মারিয়া-ঋতুপর্ণা-সাবিনা-নীলাদের মতোই ছুটছিলেন। ওরা এখনও ছুটছে, কিন্তু নিয়তির অমোঘ নিয়মে কেবল থেমে যেতে হলো আপনাকে। বড্ড অসময়ে; অথবা প্রয়োজনের সময়ে। তবু সততা, নিষ্ঠা, সাহসিকতা, নির্ভীকতা, হার না মানার জন্য আপনিও আমার কাছে অদম্য-তৌফিক ইমরোজ খালিদী। নতুন সিরিজ যদি কখনও করি, তাহলে তার নাম হবে অদম্য-৩৩।
মোহাম্মদ জুবায়ের: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ক্রীড়াসাংবাদিক।
