উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালে আন্দোলন কেন? যা বলছেন চুয়েট শিক্ষার্থীরা
“হঠাৎ ও ব্যাখ্যাহীন পরিবর্তনে সেই আস্থা ও চলমান উদ্যোগগুলো থেমে যাক, আমরা সেটিই মেনে নিতে পারছি না।”
অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য হিসেবে পুনর্বহালের দাবিতে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-চুয়েটের শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয় দিনের মতো আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন।
উপাচার্য পদে কেন অধ্যাপক সায়েমের পুনর্বহাল দাবি করছেন তারা?
বুধবার সংবাদ সম্মেলন ডেকে শিক্ষার্থীরা তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
বেলা দেড়টার দিকে সংবাদ সম্মেলনে আসেন তারা। তাদের তরফে লিখিত বক্তব্য পড়েন মাহতাব হক।
‘কেন আমরা অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম স্যারকে পুনর্বহাল চাই’ শিরোনামে ওই লিখিত বক্তব্যে চুয়েট শিক্ষার্থীদের অবস্থান তুলে ধরা হয়।
সেখানে বলা হয়, “প্রশ্নটি প্রায়ই করা হচ্ছে- মাত্র ৫৬ দিনে একজন উপাচার্য এমন কী করেছেন যে ওনাকে পুনর্বহালের দাবিতে চুয়েটের শিক্ষার্থীরা এত দৃঢ়ভাবে একত্রিত হয়েছেন?
“আমাদের উত্তর হল, বিষয়টি শুধু এই ৫৬ দিনের নয়। এই সময়টুকুতে আমরা তার নেতৃত্বের যে ধরন প্রত্যক্ষ করেছি, তা তার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক কাজেরই ধারাবাহিকতা।”
কোনো ব্যক্তির প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়; এটি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তৈরি হওয়া আস্থা, দৃশ্যমান উদ্যোগ এবং শুরু হওয়া কাজগুলোর ধারাবাহিকতার প্রশ্ন বলে লিখিত বক্তব্যে তুলে ধরা হয়।
গেল ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম।
সোমবার খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় অধ্যাপক সায়েমকে সরিয়ে নতুন উপাচার্য দেওয়া হয়। বিষয়টি জানতে পেরে সোমবার রাতেই ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আন্দোলন শুরু করেন।
মঙ্গলবার শিক্ষার্থীদের ‘শাটডাউন’ কর্মসূচিতে অচল হয়ে পড়ে চুয়েট। বুধবারও তারা কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন। আর দুপুরে
সংবাদ সম্মেলনে এসে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি জানানোর চারটি কারণ তুলে ধরেন।
প্রথম কারণ হিসেবে বলা হয়, ‘পদ নয়— শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানোর মানসিকতা’।
শিক্ষার্থী মাহতাব হক বলেন, “দায়িত্ব নেওয়ার পর খুব অল্প সময়েই তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য একজন প্রশাসক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন।
“শিক্ষার্থীদের সমস্যা শুনেছেন, সরাসরি কথা বলেছেন এবং কোনো সমস্যা তার কাছে তুলে ধরা হলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখে সমাধানের পথ খোঁজার আন্তরিকতা ও স্পৃহা দেখিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন, সুযোগ-সুবিধা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তার এই সরাসরি সম্পৃক্ততাই অল্প সময়ের মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি দৃঢ় আস্থার সম্পর্ক তৈরি করেছে।”
এছাড়া অধ্যাপক সায়েম ২০০৫ সালে চুয়েটে শিক্ষকতা শুরুর সময় থেকে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন বলেও দাবি করেন শিক্ষার্থীরা।
লিখিত বক্তব্যে অন্য কারণগুলো তুলে ধরে বলা হয়, “ অধ্যাপক সায়েমের প্রচেষ্টায় নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বহু চুয়েট শিক্ষার্থী পূর্ণ বৃত্তিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থীকে ফুল স্কলারশিপসহ বিদেশে উচ্চশিক্ষায় পাঠাতে তিনি সহায়তা করেছেন।
“তার উদ্যোগে ইতালির আন্তর্জাতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ড্যানিয়েলি চুয়েট থেকে পাঁচজন প্রাক্তন শিক্ষার্থীকে প্রকৌশলী হিসেবেও নিয়োগ দেয়।”
উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক সায়েমের পরিকল্পনাগুলোও সরাসরি শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ছিল দাবি করে মাহতাব হক বলেন, “দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি চুয়েটে আন্তর্জাতিক কোলাবরেশন অফিস চালু, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের সুযোগ সম্প্রসারণ, বিদেশি শিক্ষার্থী আনা, আধুনিক গবেষণা হাব, স্মার্ট ক্লাসরুম, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা-ইন্টার্নশিপ-কর্মসংস্থান সংযোগ এবং অ্যালামনাই নেটওয়ার্ককে কার্যকর করার পরিকল্পনা সামনে আনেন।
“ওনার বক্তব্যে বারবার একটি বিষয়ই এসেছে- চুয়েটের শিক্ষার্থীরা যেন বিশ্বমানের শিক্ষা, গবেষণা, স্কলারশিপ ও চাকরির সুযোগ পায়।”
সংবাদ সম্মেলনে আরেক শিক্ষার্থী সাকিব হাসান বলেন, “ওনার দায়িত্ব পালনের সময়ে চুয়েটের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্লাব ফেস্ট আয়োজনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চুয়েটে ‘ডিফেন্স অ্যানালাইসিস অ্যান্ড রিসার্চ উইং’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছিল।
“ভবিষ্যতে আরও শিক্ষার্থীকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও স্কলারশিপের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক চাকরির ক্ষেত্র তৈরি করার প্রচেষ্টাও চলছিল। এগুলো আমাদের কাছে কেবল প্রতিশ্রুতি নয়; ওনার আগের কাজের ধারাবাহিকতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এগুলো বাস্তবায়নের সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।”
৫৬ দিন কোনো উপাচার্যের পূর্ণ মেয়াদ মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয় দাবি করে শিক্ষার্থী মাহতাব হক বলেন, “কিন্তু একজন প্রশাসক শিক্ষার্থীদের কথা শুনবেন কি না, সংকটে পাশে দাঁড়াবেন কি না, সমস্যা জানালে সমাধানের চেষ্টা করবেন কি না এবং নিজের নেটওয়ার্ক ও অভিজ্ঞতাকে শিক্ষার্থীদের সুযোগ তৈরিতে ব্যবহার করবেন কি না- এই মানসিকতা বুঝতে ৫৬ দিন একেবারে অপ্রতুলও নয়। আমরা এই অল্প সময়েই সেই মানসিকতার বাস্তব প্রতিফলন দেখেছি।
“হঠাৎ ও ব্যাখ্যাহীন পরিবর্তনে সেই আস্থা ও চলমান উদ্যোগগুলো থেমে যাক, আমরা সেটিই মেনে নিতে পারছি না। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত বা একাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে আমরা কোনো নেতিবাচক সিদ্ধান্ত দিচ্ছি না।”
অধ্যাপক সায়েমের ‘দৃশ্যমান কাজ, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা আস্থা এবং চলমান উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিকতার ভিত্তিতেই’ শিক্ষার্থীরা উপাচার্য পদে তার পুনর্বহাল চান বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন মাহিরা তাজরি ও অরিন্দম দে।
আরও পড়ুন:
উপাচার্য পুনর্বহালের দাবি: দ্বিতীয় দিনের মত অচল চুয়েট
উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত চুয়েটে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা
