পশুপাখির প্রতি নিষ্ঠুরতা: নিজের পায়ে কুড়াল মারার দীর্ঘ ইতিহাস
কোনো প্রাণীকে পিটিয়ে মারা কিংবা খাঁচায় আটকে রাখা স্রেফ প্রাণিকূলের ওপর অত্যাচার নয়, কোটি বছরের সহাবস্থান ভেঙে নিজের পায়েই কুড়াল মারার আত্মঘাতী চর্চা।
পিটিয়ে মানুষ মারার মতো ঘটনা যেখানে আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে, সেখানে পশুপাখির ওপর নির্মমতা নিয়ে কথা বলাটাকে অনেকে হয়তো সময়ের অপচয় বলে উড়িয়ে দেবেন। তবুও বিষয়টি নিয়ে কথা বলার এখনই উপযুক্ত সময়। কারণ প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী নিছক কোনো সংরক্ষণের বিষয় নয়; মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকার প্রধান ভিত্তি। শত শত বছরের গবেষণাও বলছে, প্রকৃতি শুধু মানুষের ক্ষুধা মেটানোর রসদ জোগায় না—তার নিজস্ব প্রাণ ও অসীম শক্তি আছে। সুস্থভাবে বাঁচতে হলে মাটি, গাছপালা এবং পশুপাখির সঙ্গে মানুষের সেই নাড়ির টান বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। নৃবিজ্ঞানী রিচার্ড নেলসন যেমনটি বলেছিলেন, “মানুষের ভালো থাকা নির্ভর করে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের ওপর।”
শিকারি আর শিকার হিসেবে মানুষ ও পশুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হাজার হাজার বছরের পুরোনো। অতীতে পশু আর মানুষ একই জগতে বাস করত; শরীর ও মনের বাইরেও নিজেদের পুরো সত্তা দিয়ে তারা পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। এমন এক সময় ছিল, যখন কেউ কারও ওপর জবরদস্তি করত না; কাউকে দাবিয়ে রাখার কোনো চেষ্টাও ছিল না।
মানুষের সঙ্গে শুধু কুকুরের সম্পর্কের ইতিহাসই অন্তত ১৪,০০০ বছরের পুরোনো। ১৯১৪ সালে জার্মানিতে মাটি খুঁড়তে গিয়ে খনি শ্রমিকরা ১৪,০০০ বছর আগের এক পুরুষ ও নারীর কবর পান, যেখানে তাদের সঙ্গে একটি কুকুরকেও সসম্মানে সমাহিত করা হয়েছিল। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই পারস্পরিক সম্পর্ককে বোঝার নামই বাস্তুসংস্থানবিদ্যা (ecology) ও বাস্তুতন্ত্র (ecosystem)। এই বাস্তুসংস্থানগত ভারসাম্য নষ্ট হলে, মানুষের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে যায়। অথচ আমাদের দেশের মানুষের ইকোলজি সম্পর্কে কখনোই স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি এবং এ নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথাও নেই।
ফলে অকারণেই বেওয়ারিশ কুকুর-বিড়ালকে নির্মমভাবে লাঠিপেটা করা, গরম পানি ঢালা বা বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা এ দেশে অত্যন্ত সাধারণ দৃশ্য। গ্রামীণ ও নদীবেষ্টিত এলাকায় মেছোবিড়াল, শিয়াল, খাটাশ, গুঁই সাপ ইত্যাদি দেখলে কেবল ভীতি ও কুসংস্কার থেকে পিটিয়ে মারা হয়। শীতকালে অতিথি পাখি শিকার এবং পাহাড়ি অঞ্চলে বুনো পাখি ও হরিণ, হাতি নিধন অব্যাহত রয়েছে। তক্ষক, শালিক, ময়না, শকুন এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সাপ ধরে খাঁচায় বন্দি করে বেআইনি বাণিজ্য চালানো হচ্ছে। বন ধ্বংস করে পশুপাখি চলাচলের পথ না রেখে সড়ক আর রেললাইন নির্মাণ এবং বিদ্যুতের তারের ফাঁদ তৈরি করাও এক সুদূরপ্রসারী পরিবেশগত নির্মমতা। এ ধরনের নির্দয়তায় আমরা বরাবরই উদাসীন থেকেছি। আমরা জানিই না যে আমাদের বেঁচে থাকাটা প্রকৃতির প্রত্যেকটি উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। একটি নির্দিষ্ট প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলেও পুরো প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভেঙে পড়তে পারে।
বেওয়ারিশ কুকুর পিটিয়ে মেরে আমরা পৈশাচিক আনন্দ পাই। কদিন আগেও পিটিয়ে মারা হলো এক বিরল প্রজাতির মেছোবাঘকে। আমাদের শিশুরা কি জানে মেছোবাঘ আর পথকুকুর পরিবেশের কী উপকার করে?
মেছোবাঘ জলাভূমির ‘ফ্ল্যাগশিপ প্রজাতি’ বা পরিবেশের স্বাস্থ্য নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। এটি কোনো হিংস্র প্রাণী নয়; বরং অসুস্থ ও দুর্বল মাছ জলাশয়ে সুস্থ মাছের বংশবৃদ্ধি বজায় রাখে এবং কাঁকড়া, ইঁদুর ও বিষাক্ত সাপ শিকার করে কৃষকের ফসল রক্ষা করে। শহরের কুকুরের ভূমিকা হিসাব করলেও দেখা যায়, এরা ইঁদুর ও ক্ষতিকর প্রাণী নিয়ন্ত্রণ করে এবং পচা জৈব আবর্জনা খেয়ে ‘প্রাকৃতিক রিসাইক্লার’ হিসেবে কাজ করে। শহর কুকুরশূন্য হলে ইঁদুরের উপদ্রবে গুদামজাত খাদ্য ধ্বংস হবে এবং লেপ্টোস্পাইরোসিস ও হান্তাভাইরাসের মতো মারাত্মক রোগ ছড়াবে। তাছাড়া কুকুর নিজের এলাকা (Territory) রক্ষা করে বন্য শিয়াল ও বিষাক্ত সাপকে লোকালয়ে ঢুকতে বাধা দেয়।
একইভাবে শিয়াল, গুঁই সাপ ও পেঁচা প্রাকৃতিক উপায়ে ইঁদুর ও ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে ফসল রক্ষা করে। মানুষের নির্দয়তায় এসব প্রাণী নিধন হওয়ায় কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতিকর পোকার প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেছে, যা সামলাতে ব্যবহার করতে হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক। এই কীটনাশক মূলত মানুষের জীবনকেই বিপন্ন করে তুলছে। শকুন ও শিয়াল মৃত পশুপাখি খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখত। গবাদিপশুতে নির্দিষ্ট ব্যথানাশক ওষুধ (যেমন ডাইক্লোফেনাক) ব্যবহারের কারণে শকুন এখন বিলুপ্তপ্রায়; ফলে পচা বর্জ্য থেকে নানা ধরনের জীবাণু বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। পাখি, বাদুড় ও বিভিন্ন পতঙ্গ পরাগায়ন ঘটায়; এগুলো নিধনের ফলে অনেক উদ্ভিদ প্রজাতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্মানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ইকোলজিতে একটি সামান্য টিকটিকিও মূল্যবান। অথচ আমাদের নির্মমতা থেকে কোনো প্রাণীই রেহাই পায় না।
অতীত সভ্যতার চিত্র ছিল ভিন্ন। প্রায় সব ধরনের প্রাণীর সঙ্গে মানুষের ঘনিষ্ঠ বসবাসের ইতিহাস প্রায় পঁচিশ লাখ বছরের। বিশ হাজার বছর আগেও শিকারিরা পশুদের সম্মান দেখাত। বিড়ালের সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক প্রায় সাড়ে নয় হাজার বছরের। দশ হাজার বছর আগে কৃষিবিপ্লবের পর শুধু গরুকে পোষ মানাতে মানুষের সময় লেগেছে দুই হাজার বছর। গবাদিপশুর সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল জুলিয়াস সিজারের জন্মের আট হাজার বছর আগে। সে যুগে হোমো স্যাপিয়েন্সরা তাদের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রাণীদের সঙ্গে গড়ে তুলেছিল অংশীদারত্ব ও ঘনিষ্ঠ পারস্পরিক নির্ভরতা।
অথচ আজ যখন আমরা সভ্যতার চরম শিখরে, তখন আমরা প্রাণীদের প্রতি চরম নিষ্ঠুর। কোথায় পেলাম আমরা এমন নিষ্ঠুর স্বভাব?
১৮ শতকে পুরো ইউরোপজুড়ে পশুর প্রতি চরম নির্দয়তার জন্য পরিচিত ব্রিটিশরা আমাদের পশুপাখির প্রতি নিষ্ঠুর হতে শিখিয়ে দিয়ে গেল। পাশাপাশি পবিত্র-অপবিত্রতার দোহাই দিয়ে আমরা অনেক প্রাণীকে দূরে ঠেলে দিলাম।
যদিও সমাজ ও নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিভিন্ন ধর্মে প্রাণীদের ‘পবিত্র’ বা ‘অপবিত্র’ চিহ্নিত করার মূল মনস্তাত্ত্বিক কারণ ছিল তৎকালীন স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা ও প্রাণিবাহিত (Zoonotic) রোগের সংক্রমণ ঠেকানো। সেই কারণে কিছু কিছু প্রাণী বাড়িতে রাখার বিষয়ে অনুৎসাহিত করা হয়েছিল। তবে কালের পরিক্রমায় মানুষ সেই সব প্রাণীকে রোগমুক্ত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বৈজ্ঞানিক উপায় খুঁজে পেয়েছে। যেমন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখে এবং নিয়মিত টিকা দেওয়ার মাধ্যমে কুকুর ঘরে পুষলেও কোনো ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। তবুও ধর্মীয় অনুশাসনকে সংকীর্ণভাবে ব্যাখ্যা করে বেশিরভাগ মানুষই নির্দিষ্ট কিছু প্রাণীর (যেমন কুকুর বা শূকর) প্রতি অন্ধ ঘৃণা পুষে চলেছে। প্রকৃতিতে কোনো প্রাণীই অপবিত্র বা অপ্রয়োজনীয় নয়; কেবল ধারণা বা ধর্মীয় অপবিত্রতার দোহাই দিয়ে যখন কোনো প্রাণীকে ঘৃণা করা হয় বা পিটিয়ে মারা হয়, তখন মূল ক্ষতিটি ডেকে আনা হয় মানুষের নিজেদের জন্যই।
আজকের দিনে কালো বিড়াল বা পেঁচাকে ‘অশুভ’ ভাবা, সওয়াবের আশায় টিকটিকি মারা কিংবা পথকুকুর দেখলে ঢিল ছোড়া—সবকিছুই আমাদের স্বাভাবিক ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকাকে হুমকির মুখে ফেলছে। ভেঙে পড়ছে পরিবেশগত ভারসাম্য।
অন্যদিকে আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় প্রকৃতি ও প্রাণিকূলের প্রতি বাস্তবসম্মত সহমর্মিতা এবং ইকোলজি নিয়ে গভীর কোনো প্রায়োগিক শিক্ষা দেওয়া হয় না। ফলে প্রাণীদের জীবনচক্র ও বাস্তুসংস্থানে তাদের উপযোগিতা সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট কোনো ধারণা তৈরি হয় না। জীবনীতিবিদ পিটার সিঙ্গার যথার্থই বলেছেন, আমরা প্রাণীদের প্রতি দয়া দেখাই বেছে বেছে; সব প্রাণীকে সমান চোখে দেখি না। কিছু প্রাণীকে আমরা আদর করে ঘরে রাখি, আর বাকিদের শত্রু বলে গণ্য করি। শহরের অনেক শিশুই হয়তো জানে ঘরে কুকুর বা বিড়ালকে আদর করতে হয়, কিন্তু অন্য বন্যপ্রাণীদের জীবন ও ভূমিকা সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ। তারা দেখে না কীভাবে নির্দয়ভাবে পশুপাখিকে খাঁচায় বন্দি করা হয় কিংবা বাজারে জবাই করা হয়। টেলিভিশনের বন্যপ্রাণীবিষয়ক অনুষ্ঠানে আমাদের শিশুরা দূর দেশের হাঙর বা চিতাবাঘ চেনে; অথচ খাঁচায় আটকে থাকা দেশি ব্রয়লার মুরগি কিংবা মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত বাছুরের হাহাকার তাদের স্পর্শ করে না।
প্রকৃতির সঙ্গে বৈরিতা বজায় রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকার কোনো সুযোগ মানুষের নেই। জাতীয় দৈনিকগুলোর ‘বিড়াল পোষা সুন্নত নাকি কুকুর পোষা হারাম’ জাতীয় চটুল বয়ান পরিহার করে আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিবেশ ও ইকোসিস্টেম নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গণমাধ্যমে জোরালোভাবে তুলে ধরা। পশুপাখি ও বন্যপ্রাণী নিধন কেবল তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতাই নয়, মানবজাতির টিকে থাকার শেকড় কেটে ফেলার নামান্তর। একটি সুস্থ, মানবিক ও প্রবাসযোগ্য সমাজ গড়তে হলে অন্ধ কুসংস্কার ও হিংসা ঝেড়ে ফেলে সমস্ত প্রাণিকুলের সঙ্গে সহাবস্থানের বোধ গড়ে তোলা এবং তাদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোই এখন সময়ের দাবি।
ফজিলাতুন নেসা শাপলা: কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: nessa7421@gmail.com
