ল্যাবে কি ঘুমিয়ে আছে পূর্ণ শিক্ষিত রোবট?
নানা সিমুলেশনে ট্রেনিংপ্রাপ্ত হয়ে যে রোবটগুলো ল্যাবে তৈরি আছে, তারা যখন পুরো জ্ঞান নিয়ে রাস্তায় নামবে, তখনকার কথা ভাবলেই আতঙ্ক আর শিহরণের যৌথ অনুভূতি জাগে।
আমি হাঁস খুব পছন্দ করি। বিশেষ করে তার রাজসিক হাঁটাচলা দেখতে ভালোই লাগে। তবে এর ফলাফল ভয়াবহ। সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডে আজকাল শুধু হাঁসের ভিডিও আসে। এর মধ্যে আমার প্রিয় ভিডিও হলো, কীভাবে একটা হাঁসকে কোলে নিতে হয়। আর তার মোদ্দাকথা হচ্ছে, পেছনদিক দিয়ে ধরা মানা।
সেদিন এমন একটা ভিডিও দেখতে দেখতে হঠাৎ জেনসেন হুয়াংয়ের ভিডিও সামনে চলে এলো। তিনি এনভিডিয়ার প্রধান। ওমা, সেখানেও হাঁস! তবে যান্ত্রিক হাঁস। মানে হাঁসের হাত থেকে আমার মুক্তি নেই।
ঘটনাটি বার্লিনের জিটিসি কনফারেন্সে। স্টেজে চারটি ছোট্ট রোবট হাঁস। জেনসেন বললেন, ঘুমাও। তিনটি হাঁস সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল। চতুর্থটিকে একটু বুঝিয়ে বলতে হলো। তারপর বললেন, ডিগবাজি দাও। হাঁসগুলো ডিগবাজি দিল। ভিডিওটি আট লাখের বেশি মানুষ দেখেছে। পরের দিনই ওইটার প্রি-অর্ডার পড়েছে বিশ হাজার।
হাঁসটির নাম মাইক্রোডাক। উচ্চতা ২৫ সেন্টিমিটার। ভেতরে ১৫টি মোটর, একটি ক্যামেরা, একটি ডেপথ সেন্সর আর দুটি ব্যালান্স সেন্সর। দাম ৩৯৯ ডলার। বানিয়েছে পোলেন রোবোটিক্স, হাগিংফেসের রোবট টিম।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, হাঁসটাকে এত সুন্দর করে হাঁটা, বসা, ঘুমানো আর ডিগবাজি কে শিখিয়েছে? যে কেউ করুক, তবে আমি না।
আসলে কেউ কোড লিখে শেখায়নি। হাঁস নিজে শিখেছে। আর শিখেছে এমনভাবে, যা শুনলে অবাক হবেন। হাঁটতে শেখার সময় সে একবারও আসল মেঝেতে পা ফেলেনি। আপনি নতুন কিনে এনে প্যাকেট খুলে ছেড়ে দিলেই সে দৌড়াতে পারবে। কীভাবে পারে এটা? এটা একটা ভয়ঙ্কর প্যারাডক্স। কারণ এরপর বাজার থেকে রোবট কিনে প্যাকেট খুলে ছেড়ে দিলেই কাজ করবে। ভয়ঙ্কর ব্যাপার, তাই না?
ব্যাপারটা বুঝতে তিনটি জিনিস মাথায় রাখতে হবে।
প্রথমটি একটি ভার্চুয়াল এনভায়রনমেন্ট। কম্পিউটারের ভেতরে একটা সিমুলেটর থাকে। সেখানে হাঁসটাকে হুবহু বানানো হয়। প্রতিটা জয়েন্ট, প্রতিটা মোটর, ওজন, এমনকি পায়ের সাথে মেঝের ঘষা পর্যন্ত।
দ্বিতীয়টি একটি জিপিইউ। একটা হাঁস একা শিখলে সময় লাগত অনেক। তাই একটা গ্রাফিক্স কার্ডের ভেতরেই একসাথে ৪০৯৬টি হাঁস বসানো হয়। সবার মাথায় একই পিচ্চি মাথা, মানে একটা নিউরাল নেটওয়ার্ক। সেকেন্ডে পঞ্চাশবার সে ৬১টি ডেটা নেয়। হাঁসটি কতটা হেলে আছে, জয়েন্টগুলো কোন কোণে, জয়স্টিক কোন দিকে। তারপর মোটরগুলোকে হুকুম দেয়, যখন যেখানে লাগে। আহা, আমাদের সরকারগুলো যদি রাষ্ট্রযন্ত্র চালাতে এভাবে ডেটা নিতে পারত! হাঁসের গল্প বলছে, ডেটা নেওয়া সম্ভব।
তৃতীয়টি পরীক্ষার নম্বর। জয়স্টিকের কথা শুনে হাঁটলে নম্বর পায়। পড়ে গেলে নম্বর কাটা যায়। প্রতি রাউন্ড শেষে মাথাটিকে একটু ঠেলে দেওয়া হয় যেদিকে বেশি নম্বর এসেছে সেদিকে। শুরুতে সব হাঁস আছাড় খায়। হাজার হাজার আছাড়ের পর একসময় টলমল করে হাঁটা শুরু হয়। একটা কাজ চালানোর মতো হাঁটা শিখতে সময় লাগে মাত্র এক-দুই ঘণ্টা। ভয়ঙ্কর, তাই না?
কিন্তু এখানে একটা কঠিন প্রশ্ন আছে। আমাদের এই সিমুলেটরের দুনিয়া নিখুঁত। আসল দুনিয়া নিখুঁত না। আসল মোটর কাঁপাকাঁপি করে। ব্যাটারি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়। মেঝে কখনো পিচ্ছিল, কখনো খসখসে থাকে। নিখুঁত ভার্চুয়াল দুনিয়ায় শেখা রোবট আসল মেঝেতে নামলেই মুখ থুবড়ে পড়ে। প্রকৌশলীরা এই সমস্যার নাম দিয়েছেন 'রিয়েলিটি গ্যাপ'। ঠিক যেমন আমাদের নির্বাচনের আগের ও পরের ঘটনা।
সমাধানটা খুব চমৎকার। প্রকৌশলীরা ভার্চুয়াল দুনিয়াটাকে ইচ্ছা করে ভুল বানিয়েছেন। ৪০৯৬টি হাঁসের প্রতিটিই পায় আলাদা আলাদা ভার্চুয়াল দুনিয়া। কারও ব্যাটারি দুর্বল, কারও মেঝে পিচ্ছিল, কারও কাছে হুকুম পৌঁছায় দেরিতে, কারও গিয়ারে একটু ঢিলা ভাব। যে মাথা এই সবগুলো দুনিয়ায় টিকে যেতে পারে, তার আর নিখুঁত দুনিয়ার দরকার পড়ে না। তার কাছে আপনার ঘরের মেঝেটা আরেকটা ভার্চুয়াল দুনিয়া মাত্র। তাই হাঁসটি প্রথমবারেই দাঁড়িয়ে যায়।
এবার একটা পার্সপেক্টিভ দিই। স্বয়ংক্রিয় গাড়ি সেকেন্ডেই এত বুদ্ধিমান হয় কেন? একটা গাড়ি অনেক দূর চালিয়ে যা শেখে, ওই ট্রেনিং ডেটা যখন লাখ গাড়ির মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, তখন জ্ঞানটা অন্য পর্যায়ে চলে যায়। একটি গাড়ির অভিজ্ঞতা সবার অভিজ্ঞতা হয়ে যায়।
মেশিন লার্নিং নিয়ে অনেকদিন কাজ করছি। তবে মেশিন লার্নিংয়ের মৌলিক কোর্স করার সময় অ্যান্ড্রু এনজির একটা ভিডিও দেখেছিলাম, অনেক বছর আগে। একটা নিজে নিজে উড়ে চলা হেলিকপ্টার। সেটা বারবার ধাক্কা খেয়ে এদিক-ওদিক গিয়ে পড়ত। কিন্তু প্রতিটা ভুল থেকে সে শিখত কখন কোন ত্রুটি সংশোধন করতে হবে। তখন যন্ত্রকে শিখতে হতো নিজের আসল অভিজ্ঞতা থেকে, আসল আছাড় খেয়ে।
আর এই মাইক্রোডাক? সে শিখল একবারও মাটিতে পা না ফেলে। এটাই ভয়াবহ।
রোবটের দুনিয়ায় এটা বিশাল ব্যাপার। কারণ আছাড় খাওয়াটা এখন সস্তা। কম্পিউটারের ভেতরে হাজার হাজার হাঁস একসাথে আছাড় খেয়ে শিখে নিচ্ছে, আর আসল দুনিয়ায় নামছে পুরোটাই শিখে।
মানুষ ছোটবেলা থেকেই শেখে। বড় হতে হতে এবং বুঝতে বুঝতেই তার অবদান রাখার মতো খুব বেশি ক্ষমতা বা সময় থাকে না। কিন্তু আজকে যে রোবটগুলো ল্যাবে ঘুমিয়ে আছে, তারা যখন পুরো জ্ঞান নিয়ে রাস্তায় নামবে, তখন কী হবে? আমি শিহরিত, কিছুটা আতঙ্কিত বটে।
রকিবুল হাসান: টেলিকম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক লেখক। ই-মেইল: rakibul.hassan.mail@gmail.com
