ছেলেমেয়েরা শিখে কোথায় যাবে? নাচের কোনো জায়গা নেই: ‘আড্ডানামায়’ শামীম আরা নিপা
“জনপ্রিয় বা খুব নামকরা শিল্পী হব সেই সেই বোধ থেকে এ অঙ্গনে আসিনি।”
অভিনয়, মডেলিং আর চলচ্চিত্রের প্রস্তাব ছিল নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নীপার সামনে। দর্শকপ্রিয়তা আর আর্থিক সচ্ছলতার সুযোগও ছিল। তবুও শুরুতেই নৃত্যকেই তিনি আঁকড়ে ধরেছিলেন, যে চর্চা চলছে দশকের পর দশক ধরে।
তিনি বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, ধ্রুপদী ও লোকজ নৃত্যের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে কাজ করেছেন। সহশিল্পী, সতীর্থ নৃত্যশিল্পী শিবলী মহম্মদকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছেন নৃত্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘নৃত্যাঞ্চল’। যে প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর বের হচ্ছে নানা বয়সের নৃত্যশিল্পীরা।
শামীম আরা নিপা বলেন, কেবল খুব নামকরা শিল্পী বা তারকা হওয়ার ইচ্ছে থেকে তিনি এই অঙ্গনে আসেননি। এসেছিলেন সাধনার মধ্য দিয়ে একজন ভালো শিল্পী হতে।
তার কথায়, "আমার কাজটা আমি ভালো করে করব, যতটুকু পাই তাতেই আমি সন্তুষ্ট।"
কিশোরগঞ্জের যে পরিবারে তার বেড়ে ওঠা, সেখানে ঘরে ঘরে গানবাজনা হত। বোনেরা সেতার, বেহালা বাজাতেন। চিকিৎসক বাবাকে দেখে একসময় ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছাও জেগেছিল। কিন্তু নাচ ক্রমেই তাকে টানে।
চার দশক ধরে চলছে সেই সাধনা। নৃত্যশিল্পী শিবলী মহম্মদের সঙ্গে জুটি বেঁধে দেশ-বিদেশের দর্শকের কাছে হন আরও পরিচিত।
নৃত্যনাট্যে কখনো তিনি মহুয়ার মত মাটির চরিত্র, কখনো রাজকীয় কত্থক।
এই শিল্পী বলছেন, নাচের প্রতি কেবল মুগ্ধতা নয়, একনিষ্ঠ সাধনা ও শৃঙ্খলা না থাকলে এই শিল্পে স্থায়ী হওয়া সম্ভব নয়।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের গ্লিটজের সাক্ষাৎকার সিরিজ 'আড্ডানামা'র চতুর্দশ পর্বে অতিথি হয়ে এসেছিলেন নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নিপা।
নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ার, শৈশব, দেশের নৃত্যচর্চার বর্তমান অবস্থা এবং ব্যক্তিজীবনের নানা অজানা দিক তুলে ধরেছেন একুশে পদক পাওয়া এই শিল্পী।
আড্ডানামা সঞ্চালনা করেছেন মঞ্চের অভিনেত্রী নিকিতা নন্দিনী। গ্লিটজের এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে আলোক হেলথকেয়ার এন্ড হাসপাতাল।
আগের তের পর্বে অতিথি হয়েছিলেন অভিনেতা আবুল হায়াত, মামুনুর রশীদ, আফজাল হোসেন, চঞ্চল চৌধুরী, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ, ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল, গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী, শামীম আজাদ, অভিনেতা ইমতিয়াজ বর্ষণ, পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন, অভিনেত্রী সানজিদা প্রীতি ও অভিনেতা শ্যামল মাওলা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েবসাইটের পাশাপাশি ফেইসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে দেখা যাচ্ছে এ অনুষ্ঠান।
‘গর্বিত কিশোরগঞ্জের মেয়ে হয়ে'
আড্ডার শুরুতেই নিজের শেকড়ের কথা বলেন শামীম আরা নিপা।
কিশোরগঞ্জের বাতাস ও মাটিতে এমন কী আছে যে একজন শামীম আরা নীপার জন্ম হয়- প্রশ্নে তিনি বলেন, "তুমি কি জানো কিশোরগঞ্জের মাটির কত মূল্য? সত্যজিৎ রায়কে পেয়েছি আমরা, তারপরে দেবব্রত বিশ্বাস থেকে শুরু করে অনেক অনেক গুণী লোকের জন্ম। সেখানে আমি তো একেবারেই নগণ্য। মাটিটার অবশ্যই একটা, অনেকটা এরিয়ার একটা অরা কাজ করে।"
নিজের বেড়ে ওঠার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শামীম আরা নিপা বলেন, "কিশোরগঞ্জে আমার জন্ম এবং আমার বেড়ে ওঠার অনেকটাই, আমি অনেক গুণী মানুষের সান্নিধ্যে থাকতে পেরেছি। আমার আশেপাশে যারা ছিলেন তারা অনেক বেশি আমাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তো আমি গর্বিত একজন কিশোরগঞ্জের মেয়ে হয়ে।"
নৃত্যের সুষমার সন্ধান কি এক জীবনে মেলে, জানতে চাইলে শামীম আরা নীপা বলেন, "আমার মনে হয় মেলে না। যে কোনো ক্রিয়েটিভ মানুষের কিন্তু তৃপ্ত হওয়ার বাসনাটা থেকেই যায়। তৃপ্ত হতে পারে না, মনে হয় না। সব পেয়ে গেলে তো হয় না।"
নৃত্যের প্রতি ভালোবাসা বা মুগ্ধতা কখন তৈরি হয়েছিল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আসলে না একদম বইয়ের ভাষায় বা খুব হিসেব করে হয়নি এগুলো। আমি তো বললাম যে আমার পরিবারটা একদম অন্যরকম ছিল, আমার বোনরা তখন সেতার বাজাত, বেহালা বাজাতো, মানে ওই সময়টা ভাবাই যেত না। তো সেই ক্ষেত্রে আমাকে নাচ করতে দেওয়া হলো, সব ভাইবোনদের ইচ্ছেতেই করলাম।"
একটু বড় হয়ে ঢাকায় রিহার্সালের দিনগুলোর অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, "ঢাকায় আমি যখন রিহার্সেল করতাম তখনও সবাই আমাকে খুব ভালোই বলতো যে 'ও খুব ব্রাইট, ওকে দিয়ে হবে'। এটা শুনে শুনে এক ধরনের একটা লোভ জন্মায়। ওই লোভটা কিন্তু আমাকে এই ধীরে ধীরে একটা জায়গায় গিয়ে একদম খুব ডিটারমাইন্ড হতে শিখিয়েছে যে না আমি শুধু নাচই করবো আর কিছু করবো না।"
আমার পক্ষে ডাক্তার হওয়া সম্ভব নয়
বাবা পেশায় চিকিৎসক ছিলেন। বাবার পেশা নেওয়ার ইচ্ছে কখনো হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমাকে ডাক্তার হওয়ার একটা এক ধরনের ছোটবেলায় ইচ্ছে ছিল কারণ ডাক্তারদের আমার সবচেয়ে ভালো লাগে যে মানবিক দিকটা যেটা আমি বাবাকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। ডাক্তারদের যে ভীষণ মানবিক হতে হয়, নিজের সবকিছু কষ্ট ত্যাগ করে একটা পেশেন্ট যখন ডাকে তখন ওই সময় ওই জায়গাগুলো তখন এত সুযোগ সুবিধা ছিল না।
বাবার প্রশংসা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ছোটবেলায় অনুপ্রাণিত করলেও এই ইচ্ছা বেশিদিন টেকেনি বলে জানিয়েছেন তিনি।
সংস্কৃতি ও নাচের ভুবনে ক্রমশ জড়িয়ে পড়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, "সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে যাওয়ার পর ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছায় ভাটা পড়ে। বুঝেছিলাম, আমার পক্ষে ডাক্তার হওয়া সম্ভব নয়।"
পরিবারের সংস্কৃতিচর্চা একজন শিল্পীর নির্মাণে কতটা জরুরি, জানতে চাইলে শামীম আরা নীপা বলেন, "আমি মনে করি প্রয়োজন।”
পরিবারকে পাশে পাওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমি সেদিক থেকে ভাগ্যবতী যে পরিবার আমাকে আমার মত করে বেড়ে ওঠার পূর্ণ সুযোগ দিয়েছিল।"
তবে এক পর্যায়ে এসে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, তখন নাচকে পেশা হিসেবে নেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট সুযোগ বা ক্ষেত্র ছিল না, অনেক লড়াই করে একটি জায়গা তৈরি করতে হয়েছে।
নাচকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন, যে কোনো মানুষই পেশাগত জীবনে একধরনের আর্থিক নিরাপত্তা চায়, কিন্তু সেই সময়ে নাচে সেই সুযোগ ছিল না। শিল্পচর্চার এ ক্ষেত্রটি বরাবরই কিছুটা অবহেলিত ও পিছিয়ে থাকা মাধ্যম। ফলে পরিবার থেকে শুরুতেই শুধু নাচকেই জীবনের একমাত্র পেশা হিসেবে মেনে নেওয়া বেশ কঠিন ছিল।
'আমি চাই আমাকে রাগী ভাবুক ততক্ষণ, যতক্ষণ তারা কাজটা করবে'
পর্দার পেছনের শামীম আরা নীপাকে কঠোর বলা হয়, এ নিয়ে তিনি বলেন, "এটা আমাকে সবাই বলে, আমার স্টুডেন্টরাও ভয় পায়। কিন্তু আমি খুব কাজের বেলাটায় আমি কঠোর থাকতে চাই।”
নিপা মনে করেন অনুশীলনের সময় নিয়মানুবর্তিতা না থাকলে, শিক্ষার্থীরা তার কথা না শুনলে তিনি ভালো কোনো কাজ করতে পারবেন না।
তিনি বলেন, “আমি চাই যে আমাকে রাগী ভাবুক ততক্ষণ যতক্ষণ তারা কাজটা করবে।”
'এই মানুষগুলোকে আমি হতাশ করতে চাইনি'
নাচে শুরুর সময় থেকেই নাটক-চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অনেক প্রস্তাব পেলেও তাতে কর্ণপাত করেননি নিপা।
তিনি বলেন, "অভিনয় কিংবা এগুলো তো একটা বড় মাধ্যম না, আমি তো সেখানে সময় দেওয়ার মত সময়ও আমার তখন ছিল না এতটাই ব্যস্ত ছিলাম আমি নাচ নিয়ে। যদিও খুব তাড়াতাড়ি জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়, আর্থিক দিক থেকেও যদি বলি অভিনয় শিল্পীরা অনেক বেশি সুযোগ পান, আমার হাতে প্রস্তাবও ছিল।”
খ্যাতি বা জনপ্রিয়তার মোহ থেকে নাচের জগতে আসেননি জানিয়ে তিনি বলেন, "কিন্তু আমার যে ব্যাপারটা হয়েছিল যে একই তো পারিবারিকভাবে আমি একটা বোধের মধ্যে দিয়ে তৈরি হয়েছি আমি কিন্তু শুধু জনপ্রিয় শিল্পী হব বা খুব নামকরা শিল্পী হব সেই সেই বোধ থেকে এ অঙ্গনে আসিনি।”
ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোতে বরেণ্য চিত্রশিল্পী, নাট্যনির্দেশক ও পাপেট চর্চার অন্যতম প্রাণপুরুষ ‘পাপেটম্যান’ খ্যাত মুস্তাফা মনোয়ারের সান্নিধ্য ও অনুপ্রেরণার কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন তিনি।
"আমি যদি মুস্তাফা মনোয়ারের কথা বলি, উনি আমাকে অনুপ্রাণিত করতেন, উনার সবকিছু আমি ভীষণভাবে ফলো করতাম। উনি সবসময় বলতেন যে থামতে জানতে হয় সবকিছু তোমার জন্য না।
“তো আমি মনে করতাম যে উনাকে আমি কষ্ট দিব না। উনি বিজ্ঞাপন করা একদমই পছন্দ করতেন না। এসব মানুষকে কষ্ট দিতে চাইনি, হতাশ করতে চাইনি।”
দীর্ঘ সাধনার এই সময়ে বাংলাদেশে উচ্চাঙ্গ বা ধ্রুপদী নৃত্যের অবস্থান কোথায়, শুরুর সময়ের সঙ্গে এখনকার পার্থক্য কী প্রশ্নে তিনি বলেন, " তখন তো সুযোগটা এত ছিল না। অনেক কষ্ট করে শিখতে হয়েছে। এত বেশি শিক্ষক কিংবা শেখার যে একটা পরিবেশ সেরকম ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে তো সবারই একটা সুযোগ হয়েছে ইন্ডিয়া থেকে ভালো ভালো শিক্ষকদের আন্ডারে থেকে সবাই খুব ভালো ভালো কাজ করছিল শিখে এসছে যারা।
“তবে আমি মনে করি যে ধ্রুপদী নাচের চর্চা আগেও ছিল। আমারা অনেকটাই চেয়েছি যে এই এই জায়গাটা অনেক শক্তভাবে ফিরে আসুক বা একটা অবস্থান নিক আর এখনো কিন্তু হচ্ছে। তবে এখন ছেলেমেয়েরা অনেক বেশি অস্থির একটা সময়ের মধ্যে পার করছে বা এখন ঠিক নিষ্ঠার সঙ্গে ক্লাস করতে চায় না বা এটা কিন্তু সব ক্ষেত্রে ঠিক না।"
বর্তমান প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্ল্যাটফর্ম সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, "প্রচুর ছেলেমেয়ে নাচ করছে শিখছে ভরতনাট্যম এবং কত্থকটা আমি বলবো যে দুটো সাবজেক্টেই প্রচুর স্টুডেন্ট পাওয়া যায় শুধু ঢাকায় না ঢাকার বাইরেও পাওয়া যায়। তার মানে কি আগ্রহটা আছে আছে বলেই শিখছে। তবে একটাই বিষয় যে আমরা প্ল্যাটফর্মটা দিতে পারি না।
ওরা শিখে কোথায় যাবে? কয়টা অনুষ্ঠান হচ্ছে আমাদের দেশে সেই ধ্রুপদী শিল্পীদের জন্য বা ক্লাসিক্যাল যারা করে সেরকম কনফারেন্স বা ওদের জন্য একটা ফেস্টিভ্যাল করা খুব কম। তো শিখে যে একটা জায়গায় নিজেকে প্রকাশ করবে সেই সেই জায়গাটার একটা বড় অংশ আমি মনে করব আমাদের জন্য একটা দুর্বলতার জায়গা।"
তরুণ প্রজন্মের মেধার প্রশংসা করে তিনি বলেন, "এখনকার ছেলেমেয়েরা অনেক বেশি মেধাবী। যারা প্রকৃতপক্ষে নৃত্যশিল্পী হতে চায়, তাদের তুলে ধরার কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নেই। এ দিকটি ভাবলে কিছুটা হতাশ হতে হয়।"
কাজের সুযোগের ঘাটতি সত্ত্বেও দেশের নাচের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নতুন শিল্পী তৈরির ক্ষেত্রে এদেশে আগের চেয়েও অনেক বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কেউ কেউ নাচ ধরে রাখতে চাইছে
প্ল্যাটফর্ম ও সুযোগের অভাবে দেশে এখনো নৃত্য বা সংগীতকে মূল পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সাহস অনেকেই পান না, বরং একে অন্য কাজ বা পড়াশোনার পাশাপাশি চর্চার বিষয় হিসেবেই দেখা হয়।
পেশার খাতিরে নিজের ত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, "আমি বা আমাদের সময় যারা ছিলেন, আমরা ব্যক্তিগতভাবে অনেক বড় ত্যাগ স্বীকার করেছি। অনেক ক্ষেত্রে বড় সব সম্ভাবনা ও বড় প্রাপ্তির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেগুলোকে ছেড়ে দিয়ে আমরা নাচের প্রতি নিজেদের সঁপে দিয়েছিলাম। কিন্তু এই আত্মত্যাগ তো আমি আমার শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারি না।
“আমি তাদের কীভাবে বলব যে কায়িক কষ্ট করো, কম বিলাসবহুল জীবন যাপন করো, কম অর্থ উপার্জনে সন্তুষ্ট থাকো, তবুও তোমরা শুধু নাচটাই আঁকড়ে ধরে থাকো? অভিভাবক ও পরিবারের বাস্তবতা বিচার করলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এমন উপদেশ দেওয়া সত্যিই খুব কঠিন।"
তিনি আরও বলেন, অবশ্য কিছু শিক্ষার্থী ও পরিবার আছে যাদের ভেতর এই বোধটা দৃঢ়ভাবে তৈরি হয়ে গেছে যে তারা যেভাবেই হোক নাচটাকেই ধরে রাখবে। তারা হয়তো তাদের মত কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়েই এই পথে টিকে থাকে।
বর্তমান সময়ের কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে শামীম আরা নীপা বলেন, "এখন তো নাচ নিয়ে শিক্ষকতা করতে পারছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির মত জায়গায় নাচ একটা সাবজেক্ট, সেই জায়গায় তারা শিক্ষকতা করছে। যারা পাশ করবে তারা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা শিক্ষকতা করতে পারছে। শিক্ষকতাটা একটা বড় জায়গা তৈরি করছে। আমার কাছে মনে হয় যে যারা প্রফেশন হিসেবে নিতে চায় খুব ভালো শিক্ষক যদি হয় তাহলে কিন্তু তার একটা বড় অবস্থান বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে।
নতুনদের উৎসাহিত করে তিনি বলেন, "কেউ যদি মনে করে যে কাজ করে গেলেও কোনো মূল্যায়ন পাওয়া যাবে না বা কেউ চিনবে না তবে সেটি ভুল ধারণা। একটু নিষ্ঠা ও মনোযোগ দিয়ে ভালো কাজ করলে লোকে তা ঠিকই গ্রহণ করে।”
উদীয়মান নৃত্যশিল্পীদের ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সবকিছুর পরেও মূল বিষয় হলো ধৈর্য এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কষ্ট করার মানসিক বল থাকা। এই মনোবল আর একাগ্রতা থাকলে একজন শিল্পী হিসেবে নিজের একটা সুদৃঢ় অবস্থান নিশ্চিতভাবেই তৈরি হবে।
'রিয়েল ফোক আমি তৈরি করতে পারি না, এটা মাটি থেকে উঠে আসা একটা ফর্ম'
লোকজ নৃত্য সংরক্ষণ বা পুনরুদ্ধারের কাজ করতে গিয়ে সীমাবদ্ধতা ও সংগ্রাম কেমন ছিল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, "বিদেশি বিভিন্ন ফেস্টিভ্যালে আমাদের পরিবেশনা দেখে দর্শক প্রচুর হাততালি দিয়েছে, সবাই প্রশংসা করেছে। কিন্তু একবার জাপানের একটি আন্তর্জাতিক ফোক ফেস্টিভ্যালে অংশ নেওয়ার পর আয়োজক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আমাকে জিজ্ঞেস করেন— এগুলো কি তোমাদের ‘রিয়েল ফোক’?
সেই প্রশ্নটি আমাকে ভীষণভাবে দোলা দেয়। তখনই উপলব্ধি করি, আমরা আসলে ভুল পথে হাঁটছি। কিছু মিক্সড মুভমেন্ট আর ছন্দের সমন্বয়ে ফোক গানের সঙ্গে নাচ করলেই সেটাকে প্রকৃত লোকনৃত্য বলা যায় না।"
তিনি আরও বলেন, ফোক বা লোকনৃত্য হুট করে তৈরি করার বিষয় নয়। প্রতিটি অঞ্চলের আলাদা ইতিহাস, নাম, স্টাইল ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। শিল্পীদের কাজ হলো সেই মূল রূপকে সংগ্রহ করে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা বা কিছুটা পরিমার্জন করা, কিন্তু লোকনৃত্যের মূল সত্তা পরিবর্তন করা নয়।
বিলুপ্তপ্রায় লোকনৃত্য সংরক্ষণে মাঠপর্যায়ের কাজের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, "ইউটিউব দেখে একটা ধামাইল নাচ শিখে ফেললেই কিন্তু প্রকৃত ধামাইল হয়ে যায় না। লোকশিল্পীদের সঙ্গে দিনের পর দিন মিশে, থেকে সেই নিজস্ব ভঙ্গি রপ্ত করতে হয়। ২-১ দিনের ওয়ার্কশপ দিয়ে এটি সম্ভব নয়। তবে এই কাজের পেছনে প্রচুর অর্থ ও সময়ের প্রয়োজন, যা এককভাবে কোনো শিল্পীর পক্ষে বহন করা কঠিন।
“তো আমি মনে করি যে এটা আমাদের ব্যর্থতা আমাদের সমস্ত শিল্পীদের জন্যই ব্যর্থতা যে আমরা এই আমাদের নিজস্ব জিনিসগুলো আমরা সংরক্ষণ করতে পারছি না কত নাচ আছে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।"
'শিবলী ছিল বলেই আমার কাজটা হয়তো এই পর্যায়ে যেতে পেরেছে'
শিবলী মহম্মদের কথা আড্ডায় না এলে পরিপূর্ণ হয় না বলে সঞ্চালক জানতে চান, এই জুটি কীভাবে হলো।
শামীম আরা নীপা বলেন, "আমি বলব যে দর্শকের কারণেই হয়েছে কারণ দর্শকরা আমাদের একসঙ্গে দেখতে চেয়েছে বলেই হয়তো আমরা একসঙ্গে কাজ করছি আর পরবর্তীতে একটা তো বোঝাপড়ার বিষয় হয়।
"আমাদের অনেকগুলো প্লাস পয়েন্ট মিলে মিলে মিলে মিলে একটা জায়গায় আমরা স্থির সেজন্য আমি খুবই ভালো লাগে যে এখনো দর্শক আমাদের দেখতে চায় এবং আমাদের অ্যাপ্রিশিয়েট করে আমাদের জন্য তাদের যে ব্লেসিংস তাদের যে আশীর্বাদ বা দোয়া যে কোনো জায়গায় গেলে বলে যে আপনারা খুব ভালো কাজ করেন আপনাদের জন্য আমাদের আশীর্বাদ রইল আপনারা আরো ভালো কাজ করেন এই ব্যাপারগুলো আসলেও মনে হয় যে খুব লাকি যে আমাদের এই জুটিটা একসঙ্গে হয়েছিল তা না হলে হয়তো আমরা এখন যে কাজ করছি হয়তো অন্য ধারায় অন্য ভাবে করতাম এভাবে হয়তো কাজটা করতে পারতাম না।"
শামীম আরা নীপা হয়ে ওঠার পেছনে শিবলী মহম্মদের ভূমিকা কতটুকু প্রশ্নে তিনি বলেন, "না শামীম আরা নীপা আমি হয়েছিলাম, আমি আমার পরিচিতিটা আগে ছিল শিবলী মহম্মদের আগে। কিন্তু আমি মনে করি যে একটা যে কোনো জিনিসের পূর্ণতার পিছনে কিন্তু এই জিনিসগুলো ভীষণভাবে জরুরি। শিবলী ছিল বলেই আমি অনেক কাজ করেছি। আমাদের অনেক ডান্স ড্রামা আছে যে আমার মনে হয় যে শিবলী ছিল বলেই আমার কাজটা হয়ত এই পর্যায়ে যেতে পেরেছে কারণ দুইজনের একটা সামঞ্জস্য তো লাগেই। তো এই জায়গাগুলো তারপর হচ্ছে যে একসঙ্গে আমরা কাজ করি অর্ধেক কাজ ও করে অর্ধেক কাজ আমি করি।"
'সাদী মহম্মদের কষ্টটা আমরা ঠিক বুঝতে পারলাম না'
নৃত্যের পথচলার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন প্রয়াত সংগীতশিল্পী সাদী মহম্মদ। তার শূন্যতা কতটুকু অনুভব করেন, জানতে চাইলে শামীম আরা নিপা বলেন, "যে কারণেই হোক সে আমাদের অভিমান করে চলে গেছে কিংবা তাকে আমরা বুঝতে পারিনি তার যোগ্য জায়গাটা হয়তো আমরা দিতে পারিনি নানা কারণ একটা শিল্পীর থাকে।
"তো সাদী ভাইয়ের সঙ্গে খুব আন্তরিক একটা সম্পর্ক ছিল শুধু শিবলীর ভাই হিসেবে না ও কিন্তু মানুষকে খুব ভালোবাসতো খুব সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বোধ থাকত। অনেক রাত্রে ফোন করে অনুষ্ঠানের শেষে হয়ত বলতো আজকে তোমার কাজটা খুব ভালো হয়েছে।
“তার মনেও কষ্ট ছিল কিন্তু সেই কষ্টটা আমরা ছুঁতে পারিনি এটা আমার কাছে মনে হয় যে এটা আমাদের একটা বড় ব্যর্থতা যে ওর কষ্টটা আমরা ঠিক বুঝতে পারলাম না।"
