০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

তীব্র তাপপ্রবাহ: অনাগত প্রজন্মের জন্য নীরব বিপদ

২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে প্রায় ৫ হাজার ৫১৫টি অতিরিক্ত অপরিণত শিশুর জন্মের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তীব্র তাপপ্রবাহ: অনাগত প্রজন্মের জন্য নীরব বিপদ

তীব্র তাপপ্রবাহ কেবল শহরের পরিবেশ উত্তপ্ত করে না, বরং গর্ভবতী নারী ও নবজাতক শিশুর জীবন চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয়। ছবি: জেডসিএ।

জয় প্রকাশ সরকার জয় প্রকাশ সরকার

Published : 04 Nov 2026, 01:08 PM

Updated : 04 Nov 2026, 01:08 PM

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়। বাংলাদেশের শিশুদের জন্মের আগেই তাদের জীবন ও সুস্থতার ওপর এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কথা উঠলে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে গলতে থাকা হিমবাহ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা কিংবা খরার ছবি। কিন্তু এর এমন একটি প্রভাব রয়েছে, যা সচরাচর আমাদের আলোচনায় আসে না। সেটি হলো, একটি শিশু পৃথিবীর আলো দেখার আগেই জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হতে পারে।

মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় আবহাওয়ায় তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে নির্ধারিত সময়ের আগে শিশুর জন্ম নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। জন্মের পরও তাকে মোকাবেলা করতে হতে পারে তাপজনিত অসুস্থতা, পানিশূন্যতা, অপুষ্টি ও নানা শারীরিক জটিলতা। অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু বর্তমানের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে না, আগামী প্রজন্মের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সম্ভাবনাকেও সংকুচিত করছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণা এই আশঙ্কাকে আরও বাস্তব করে তুলেছে। গবেষণা সংস্থা জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের (জেডসিএ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে প্রায় ৫ হাজার ৫১৫টি অতিরিক্ত অপরিণত শিশুর জন্মের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা যতটা বেড়েছিল, তার প্রভাবে আনুমানিক ১ হাজার ৪৭৯টি অতিরিক্ত অপরিণত জন্মের হিসাব পাওয়া যায়।

এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। তাপপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত সব অতিরিক্ত অপরিণত জন্মের জন্য মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। গবেষণাটি বরং দেখায়, মানুষের কর্মকাণ্ডে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তার পরিমাপযোগ্য স্বাস্থ্যগত মূল্যও রয়েছে।

সংখ্যাগুলোকে শুধু পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম নেওয়া অনেক শিশুর বিশেষ চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যজটিলতাও দেখা দিতে পারে। তাই তাপপ্রবাহ শুধু পরিবেশ বা রাস্তাঘাট উত্তপ্ত করে না, কারও জীবনের শুরুটিকেও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

২.

অতিরিক্ত গরমে মানুষের শরীর স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু দীর্ঘ সময় তীব্র তাপের মধ্যে থাকলে শরীরের এই ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে। আর, শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি, কারণ তাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুরোপুরি পরিণত নয়। নবজাতক ও ছোট শিশুরা দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে এবং গুরুতর তাপজনিত অসুস্থতার শিকার হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত তাপের চাপও উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গবেষণায় উচ্চ তাপমাত্রার সংস্পর্শের সঙ্গে অকালপ্রসব, কম ওজন নিয়ে জন্ম এবং মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। আর, অপরিণত জন্মের অর্থ শুধু একটি শিশুর নির্ধারিত সময়ের আগে পৃথিবীতে আসা নয়। জন্মের সময় তার ফুসফুস, মস্তিষ্কসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর বিকাশ অসম্পূর্ণ থাকতে পারে। ফলে শ্বাসকষ্ট, সংক্রমণ ও অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। অনেক শিশু যথাযথ চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠে, কিন্তু সবার অভিজ্ঞতা এক রকম হয় না।

এখানেই তাপপ্রবাহের সঙ্গে শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, এর প্রভাব শুধু জন্মের মুহূর্তে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি, সুপেয় জলের প্রাপ্যতা, সংক্রামক রোগের বিস্তার এবং শিক্ষার পরিবেশের ওপরও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে।

দীর্ঘ তাপপ্রবাহে স্কুল বন্ধ থাকলে কিংবা শ্রেণিকক্ষ অসহনীয় গরম হয়ে উঠলে শিশুর শিক্ষার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। বন্যা, নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতি তার মানসিক নিরাপত্তাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একটি শিশুর শরীর থেকে তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ পর্যন্ত বিস্তৃত।

৩.

বিপদটি শুধু তাপমাত্রার নয়, বৈষম্যেরও। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি সমাজের সব মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না। একজন সচ্ছল পরিবারের গর্ভবতী নারী প্রচণ্ড গরমে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে থাকতে পারেন, নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন এবং প্রয়োজন হলে হাসপাতালে যেতে পারেন। কিন্তু একজন দরিদ্র গর্ভবতী নারীকে হয়তো তীব্র গরমের মধ্যেই কাজ করতে হয়। নিরাপদ বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা তার জন্য সহজলভ্য নাও হতে পারে।

শহরেও এই বৈষম্য স্পষ্ট। গাছপালা, জলাশয় ও খোলা জায়গা কমে গিয়ে কংক্রিটের ভবন ও পিচঢালা রাস্তা বাড়লে শহরের তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় বেশি হয়ে উঠতে পারে। এর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষ, ছোট ঘরের বাসিন্দা ও বাইরে কাজ করা শ্রমজীবীদের ওপর।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, বন উজাড়, শিল্পকারখানার কার্বন নিঃসরণ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের মতো মানবসৃষ্ট কারণ রয়েছে। অথচ এসবের ক্ষতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা সবার সমান নয়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন একই সঙ্গে পরিবেশগত, স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক ন্যায্যতার প্রশ্ন। যে পরিবার পরিবেশগত বিপদের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী, অনেক সময় ওই পরিবারের শিশুকেই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়।

৪.

২০২৪ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। জেডসিএ-এর হিসাব অনুযায়ী, ওই মাসে দেশের তাপমাত্রা ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল মাসের গড়ের তুলনায় প্রায় ২.৮৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। গবেষণাটিতে ভবিষ্যতের তাপমাত্রা বৃদ্ধির আশঙ্কা ও সম্ভাব্য প্রভাবও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়, নির্দিষ্ট অনুমান ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি প্রক্ষেপণ। কিন্তু এটাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে। আমাদের হিসাব কষে দেখতে হবে, ভবিষ্যতের তাপপ্রবাহ মোকাবেলায় আমরা কতটা প্রস্তুত।

তাপপ্রবাহের ক্ষতি নিরূপণে শুধু কতজন মানুষ হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হলেন কিংবা কতজন মারা গেলেন, তা বিবেচনা করলেই চলবে না। কতজন গর্ভবতী নারী ঝুঁকির মধ্যে পড়লেন, কতজন শিশু অপরিণত জন্ম নিল এবং কতজন নবজাতকের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হলো, সেসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।

তাপপ্রবাহজনিত ক্ষতি কমাতে আগাম সতর্কবার্তার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশনা যুক্ত করা, গর্ভবতী নারী ও নবজাতকের চিকিৎসাসেবা শক্তিশালী করা, নিরাপদ পানি ও পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তাপসহনশীল করে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে শহর ও গ্রামে গাছপালা, জলাশয় ও খোলা জায়গা সংরক্ষণ করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগও প্রয়োজন। এসবের জন্য সরকারি নীতি, অর্থায়ন, গবেষণা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় অপরিহার্য।

জলবায়ু পরিবর্তনকে আমরা এত দিন প্রধানত পরিবেশের সংকট হিসেবে দেখে এসেছি। কিন্তু এর প্রভাব যখন গর্ভাবস্থা, শিশুর জন্ম এবং সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে স্পর্শ করে, তখন এর অর্থ আরও গভীর হয়ে ওঠে। যে শিশুটি এখনো পৃথিবীতে আসেনি, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার কোনো ভূমিকা নেই। অথচ ওই পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তার জন্মের আগেই তৈরি হতে পারে। আর ওই ঝুঁকি মোকাবিলার সামর্থ্যও নির্ভর করতে পারে তার পরিবারের আর্থিক অবস্থার ওপর।

জলবায়ু পরিবর্তনের দায় ও তার ক্ষতি বহনের সামর্থ্য যখন মানুষের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত নয়, তখন অনাগত শিশুর স্বাস্থ্যও আর নিছক ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় থাকে না। তা হয়ে ওঠে সামাজিক ন্যায্যতা ও রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্ন। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নাগরিক ও নেতৃত্ব। তাদের সুস্থভাবে জন্ম নেওয়া এবং বেড়ে ওঠা শুধু একটি পরিবারের প্রত্যাশা নয়, একটি দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত।

জয় প্রকাশ সরকার: লেখক ও সাংবাদিক। ইমেইল: jps.news.bd@gmail.com