এল চ্যাপো টু পিচ্চি রাজা: মাদকের টাকায় খুলে যায় কারাগারের তালা
স্প্যানিশ শব্দ ‘এল চ্যাপো’ মানে যেমন খাটো মানুষ, আমাদের জেনিভা ক্যাম্পের ‘পিচ্চি’ রাজার গল্পটাও খাটো মানুষের গল্প। একসময় বড় কারবারিদের ফুটফরমাশ খাটা সেই পিচ্চি রাজাই কীভাবে হয়ে উঠলেন ঢাকার অপরাধ জগতের ‘দেশি এল চ্যাপো’?
আসামি পালানোর চিত্রনাট্য যে কতদূর গড়ায়, তার নিখুঁত উদাহরণ পাওয়া গেল গাজীপুরের পুলিশ কমিশনারের বয়ানে। পুলিশ নিজ হাতে প্রিজন ভ্যানের তালা খুলে পিচ্চি রাজাকে নামিয়ে এনে একটি প্রাইভেট কারে তুলে দিচ্ছে—এই অকল্পনীয় সত্য যখন খোদ আইনশৃঙ্খলার কর্তার মুখ থেকে ঝরে পড়ে, তখন সিনেমার পর্দা আর বাস্তবের সীমান্ত বিলীন হয়ে যায়। কানে সেই স্বীকারোক্তি বাজতে, আর চোখের সামনে একাকার হয়ে ভাসতে থাকে এল চ্যাপো গুজম্যানের কারাগার ভাঙা নিয়ে দেখা সেই রোমাঞ্চকর সিরিজগুলো।
যারা নিয়মিত ওয়েব সিরিজ ও সিনেমা দেখেন তারা হয়তো এক নামেই চিনে যাবেন সিনালোয়া ড্রাগ কার্টেলের ‘সিইও’ হিসেবে খ্যাতি পাওয়া হোয়াকিন এল চ্যাপো গুজম্যানকে। মেক্সিকোর মাদক সম্রাট গুজম্যানের জীবনালেখ্যনির্ভর সিনেমা ‘ফেসিং এল চ্যাপো’ গত অগাস্টেই মুক্তি পেয়েছে, সাড়াও ফেলেছে দেশে দেশে। তাকে নিয়ে হয়েছে অনেক টিভি সিরিজও।
মাদক সম্রাট গুজম্যান কুখ্যাত ছিলেন নানা কৌশলে বারবার জেল থেকে পালানো নিয়ে। কারাগারের কর্মীদের মাঝে টাকা বিলিয়ে তাদের সহায়তায়ও তিনি পালিয়েছিলেন। সম্প্রতি এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করল বাংলাদেশ। গত সপ্তাহে প্রিজন ভ্যান থেকে পালানো মোহাম্মদপুরের জেনিভা ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারি পিচ্চি রাজাকে পালাতে সহায়তা করেছে পুলিশ। এক সপ্তাহ তদন্তের পর তাকে পালাতে সহায়তা করা দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর সোমবার এমন তথ্য দিয়েছে গাজীপুর মহানগর পুলিশ। পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো জানায়নি, পিচ্চি রাজার কাছ থেকে প্রিজন ভ্যানে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যরা ঠিক কত টাকা নিয়েছেন। তবে তারা ধারণা দিয়েছেন অঙ্কটা বেশ বড়ই।
মেক্সিকোর মাদক সম্রাট গুজম্যান অপরাধ জগতে ‘এল চ্যাপো’ উপাধি পেয়েছিলেন। স্প্যানিশ ভাষার শব্দ ‘এল চ্যাপো’র বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘খাটো মানুষ’। পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির এল চ্যাপো হয়তো শারীরিক অবয়বের কারণেই এই উপাধিটি লাভ করেছিলেন। আর আমাদের হোমগ্রোন রাজা এখন আকারে বেশ বড়সড় হলেও একসময় ছোটখাটো ছিল বলেই নামের আগে কী করে যেন ‘পিচ্চি’ উপাধিটা জুড়ে বসেছে। জেনিভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক সব অপরাধীরই অবশ্য নামের আগে একটা করে উপনাম বা উপাধি আছে। চুয়া সেলিম, পাওয়ার মনু, বুনিয়া সোহেল এরা সবাই জেনিভা ক্যাম্পের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি। আর পিচ্চি রাজা ছোটবেলা থেকেই ক্যাম্পের চেনা-জানা মাদক কারবারি পাঁচিশ, ইশতিয়াক, চুয়া সেলিমদের ফুটফরমাশ খাটতো।
অপরাধের পরিধি আর ব্যাপ্তিতে হয়তো এল চ্যাপোর ধারেকাছেও নেই রাজা। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে—উপযুক্ত সুযোগ পেলে আমাদের স্থানীয় রাজারাও একেকজন এল চ্যাপো হয়ে উঠতে পারেন। পুলিশ বলছে, রাজার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই ২৫টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে রক্তক্ষয়ী হত্যার অভিযোগও। আর অন্যদিকে, মেক্সিকোর এল চ্যাপোর বিরুদ্ধে ছিল তিন হাজারের বেশি হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সংশ্রবের অভিযোগ। এল চ্যাপোর কারাগার ভেঙে পালানোর রোমাঞ্চকর কাহিনী নিয়ে ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে ২০১৫ সালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ১৯৯০ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে মেক্সিকোর সেই কুখ্যাত সিনালোয়া ড্রাগ কার্টেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত দুই শত টন কোকেন পাচার ও বিতরণের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। পাশাপাশি অন্যান্য মারণ মাদক নিয়েও মনোপলি কারবার চলত তাদের।
মেক্সিকোর এল চ্যাপো ছিলেন নিজের অঞ্চলের এক স্বঘোষিত ‘রবিন হুড’। মাদকের কদর্য উপার্জনে অর্জিত পাহাড়প্রমাণ টাকা থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে দেদারসে বিলাতেন তিনি। এভাবেই লোকজনের আস্থা ও অন্ধ বিশ্বাস অর্জনের সুচতুর চাল চেলেছিলেন এল চ্যাপো; যার প্রতিদানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখে স্থানীয়রা তাকে বাঁচাতে ঢাল হয়ে দাঁড়াত। আমাদের জেনিভা ক্যাম্পের পিচ্চি রাজাও ক্যাম্পবাসীর একাংশের কাছে গড়ে তুলেছেন ঠিক এমনই জনপ্রিয়তার বলয়। কারও চিকিৎসার খরচ,কারও ছেলেমেয়ের বিয়ের দায়ভার মেটানো,কারও আবার নতুন রিকশা কেনার সংস্থান করেছেন মুক্তহস্তে। কারও কারও ব্যবসা শুরুর পুঁজিও দিয়েছেন। এই সব উপহারের বদৌলতে, পুলিশি অভিযানের সময় শুধু টুপ করে ক্যাম্পের এক ঘর থেকে অন্য ঘরে সেঁধিয়ে গিয়েই বারবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে পেরেছেন তিনি।
এল চ্যাপোর রঙিন জীবন আর সঙ্গিনীদের নিয়ে সিনেমা আর ওয়েব সিরিজের পর্দায় কত রোমাঞ্চকর উপাখ্যানই না ফুটে উঠেছে। সেই বিচারে আমাদের দেশীয় এল চ্যাপো পিছিয়ে থাকলেও একেবারে কম যান না। জেনিভা ক্যাম্পের ঘিঞ্জি ৮ বাই ১০ ফুটের এক ফালি ঘরে জন্ম আর বেড়ে ওঠা এই রাজাও ভ্রমণপিপাসায় বেশ শৌখিন। মাদকের বদৌলতে স্ত্রী-সন্তানকে বগলে নিয়ে দুবাই ও নেপালে পাড়ি জমিয়েছেন বেশ কয়েকবার।
নেপাল বেড়িয়ে দেশে ফেরার পথেই গত ১৯ মে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হাতকড়া পরতে হয়েছিল রাজাকে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরও একবার এই পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সে সময় তার আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক ও অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধারের লোমহর্ষক তথ্য দিয়েছিল পুলিশ। তবে এবার হাতে হাতকড়া থাকা সত্ত্বেও পুলিশি প্রহরা আর প্রিজন ভ্যানের তালা ডিঙিয়ে যেভাবে পালিয়ে গেলেন, তাতে রাজা যেন সত্যিই ‘রাজকীয়’ চালে তার নামের মান রাখলেন।
মেক্সিকোর কুখ্যাত সিনালোয়া কার্টেলের অন্যতম মূলহোতা হোয়াকিন এল চ্যাপো গুজম্যানের ছিল মাদক পাচারের বিশাল নেটওয়ার্ক। কোকেন ও হেরোইনের মতো উচ্চমূল্যের ও প্রাকৃতির মাদকের পাশাপাশি ইয়াবার (এটিএস বা অ্যাম্ফিটামিন টাইপ স্টিমুলেন্ট) মতো প্রাণঘাতী রাসায়নিক মাদকের রমরমা সাম্রাজ্যও একক হাতেই নিয়ন্ত্রণ করতেন এই গুজম্যান।
গুজম্যানের বারবার গ্রেপ্তার হয়ে পালিয়ে যাওয়া, এরপর আবারও গ্রেপ্তার হওয়া নিয়ে ২০১৬ সালের ১৯ জুন একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে ‘টাইম’ ম্যাগাজিন। সেখানে বলা হয়, ১৯৯৩ সালের ১০ জুন প্রথম গুয়াতেমালায় গ্রেপ্তার হন গুজম্যান। ১৯৯৫ সালে তাকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগার পুয়েন্তে গ্রান্ডে স্থানান্তর করা হলে সেটিই হয়ে ওঠে তার মাদক ব্যবসার মূল পরিচালন কেন্দ্র। ২০০১ সালের ১৯ জানুয়ারি ওই কারাগার থেকে পালিয়ে যান এল চ্যাপো। টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “দ্য গার্ডস ওয়ার ব্রাইবড হ্যান্ডসামলি।”
পিচ্চি রাজা কাণ্ডে পুলিশ প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই পুলিশের সঙ্গে সঙ্গে রাজার বোনকেও গ্রেপ্তার করেছে। গাজীপুরের পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য, প্রিজন ভ্যান থেকে বেরিয়ে বোনের সঙ্গে প্রাইভেট কারে উঠে পালিয়ে যান রাজা। তবে এখনো রাজাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
রাজার পলায়নটা কিন্তু কোনো হুলস্থুল পাগলাটে দৌড় দিয়ে পালানো নয়। কোনো ফিল্মি ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার গল্পও নয়। ভিড়ের ভেতরে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে প্রিজন ভ্যান থেকে নেমে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় শান্তভঙ্গিতে হেঁটে হেঁটে আগে থেকে অপেক্ষমাণ একটি প্রাইভেট কারে গিয়ে ওঠেন তিনি। তারপর নিখুঁত অপারেশনে একমুহূর্তেই হাওয়া।
সিসিটিভির ধোঁয়াটে ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা আরও তাজ্জব করে দেওয়ার মতো। প্রথমে মুখে মাস্ক আঁটা রাজা এবং তার ঠিক পেছনেই পুলিশ কর্মকর্তা প্রবীর প্রিজন ভ্যান থেকে নেমে এলেন। সাদা শার্ট পরা রাজা আর খয়েরি টি-শার্টে ঢাকা প্রবীর কোনো তাড়াহুড়ো না করে ধীরেসুস্থে হেঁটে সামনের দিকে এগিয়ে যান। ঠিক সেই মুহূর্তেই তাদের সঙ্গে প্রিজন ভ্যান থেকে নেমেছিলেন ক্যামব্রিয়ান খ্যাত ব্যবসায়ী এম কে বাশার। তিনিও বেশ হেলতে-দুলতে প্রিজন ভ্যানের পেছন থেকে নেমে সোজা সামনে গিয়ে চালকের পাশের আসনে চেপে বসেন।
এদিকে জেনিভা ক্যাম্প থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ইয়াবা ব্যবসার সুবাদে মিয়ানমারেও ভালো যোগাযোগ তৈরি হয়েছে রাজার। জেনিভা ক্যাম্পে সম্প্রতি সবচেয়ে কম দামে ইয়াবা বিক্রি করার সক্ষমতা অর্জন করেছিলেন রাজা। অনেকের ধারণা তিনি মিয়ানমারে পালিয়ে গেছেন। তবে পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, পিচ্চি রাজার জন্য পালিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো জায়গা হচ্ছে জেনিভা ক্যাম্প, যেখানে রাজার অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছে এবং সেখানে ঘরগুলো এত ঘন এবং ঘিঞ্জি যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে একদিক দিয়ে ঢোকা শুরু করলে ঘর থেকে রাজার মতো ‘ভালো নেটওয়ার্কধারী’ অপরাধীরা পালিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পায়। সেখানে এক ঘর থেকে বেরিয়ে আরেক ঘরে গিয়ে ঢুকলেই পুলিশের পক্ষে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায়।
জেনিভা ক্যাম্পের তথ্য বলছে, এখন সেখানে রাজার ‘মালই’ সবচেয়ে কম টাকায় পাওয়া যায়। তার নাকি সরাসরি টেকনাফ কানেকশন আছে।
ক্যাম্পের সূত্রগুলো বলছে, টেকনাফ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিবাদমান কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে রাজার সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। যার ভিত্তিতে রাজা অনেক কম টাকায় ইয়াবা আনতে পারেন।
এখনো জেনিভা ক্যাম্পের এ ব্লকে নিজেদের ঘরেই থাকছেন রাজার পরিবারের সদস্যরা। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তার ঘর ঘিরে নিত্য চক্কর কাটছেন বলে ক্যাম্পে ঘুরে দেখা গেছে।
তারা বলছেন, ৫ অগাস্টের আগে রাজা তেমন বড় ফ্যাক্টর ছিল না। তবে ৫ অগাস্টের পর ক্যাম্পের মাদক ব্যবসার দল-উপদলগুলোর মধ্যেও কিছু পরিবর্তন হয়েছে। এর কারণেই সেখানে মাদক গ্রুপগুলোর মধ্যে দফায় দফায় সংঘাত হয়। শক্তিশালী বুনিয়া সোহেল বাহিনীকে মেরেধরে ক্যাম্পছাড়া করেছে অন্যরা। একসময় এই সোহেলের হয়ে ‘পাক্কা ক্যাম্প’ এলাকায় ইয়াবা বেচতেন পিচ্চি রাজা। ৫ অগাস্টের পরে রাজা যোগ দেন ‘পার মনুর’ দলে। কয়েক দফা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর কয়েকটি বিবাদমান মাদক ব্যবসায়ী দল সমঝোতায় আসে। পার মনু, সৈয়দপুরিয়া গ্রুপ, চুয়া সেলিম, পিচ্চি রাজা সবাই মিলে গিয়ে বুনিয়া সোহেলকে ব্যাপক মারধর করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। এরপর থেকেই মূলত ক্যাম্প শান্ত। ক্যাম্পের বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন আগের লোকেরাই। রাজার অনুপস্থিতিতে এখন ‘পার মনু’ হচ্ছেন ক্যাম্পের অঘোষিত মাদক সম্রাট। কোন এক বিবাদের কারণে তার গালে কেউ একজন ধারালো অস্ত্রের আঘাত করেছিল। গালের ক্ষত বা পারের কারণে তার নাম হয়েছে ‘পার মনু’।
গোলাম মর্তুজা অন্তু: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের রিপোর্টার।
