১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানব টিস্যু, গবেষণায় নতুন দুয়ার খুলল

মস্তিষ্কের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে শুরু হওয়া রোগ, যেমন অটিজম, মৃগী রোগ, সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে গবেষণার জন্য পদ্ধতিটি কার্যকর হতে পারে।

ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানব টিস্যু, গবেষণায় নতুন দুয়ার খুলল

বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরির ডিশে ক্ষুদ্রাকৃতির ত্রিমাত্রিক ‘অর্গানয়েড’ তৈরি করেছেন। ছবি: গবেষণাপত্র নেচার থেকে নেওয়া

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 18 Sep 2026, 11:59 AM

Updated : 18 Sep 2026, 11:59 AM

ল্যাবরেটরিতে তৈরি মানুষের মস্তিষ্কের টিস্যু বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ইঁদুরের দেহে প্রতিস্থাপন করেছেন বিজ্ঞানীরা।

তাদের দাবি, এমন সাফল্য মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ গবেষণা এবং অটিজম, মৃগী রোগ, সেরিব্রাল পালসি ও সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগের কারণ ও কার্যপদ্ধতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

গবেষকরা বলেছেন, যেসব ইঁদুরের নিজস্ব সেরিপ্রাল কর্টেক্স বা মস্তিষ্কের বাইরের স্তরটি প্রায় অনুপস্থিত সেগুলোতে মানুষের টিস্যু প্রতিস্থাপনের পর তা কার্যকরী নিউরাল নেটওয়ার্ক গঠনসহ মস্তিষ্কের বিকাশের মূল বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সফলভাবে পুনরায় তৈরি করেছে।

নৈতিক কারণে জ্যান্ত মানুষের মস্তিষ্কের টিস্যু সরাসরি গবেষণায় ব্যবহার করা অসম্ভব ছিল। তবে, এ সাফল্যকে গুরুত্বপূর্ণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

বুধবার গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ।

এ গবেষণার প্রধান গবেষক ও ‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র স্নায়ুবিজ্ঞানী সের্জিউ পাসকা বলেছেন, “এটা আমাদের জিন, একক কোষের ধরন থেকে শুরু করে সার্কিট ও প্রাণীর ওপর এর কার্যকরী প্রভাব বিভিন্ন স্তরে মানব স্নায়ু টিস্যু গবেষণার একটি উপায় করে দিয়েছে।

“আমরা এখন জানতে পারব, রোগ-সংশ্লিষ্ট মানব জেনেটিক পরিবর্তনগুলো কীভাবে স্নায়ু বিকাশ ও সার্কিটে পরিবর্তন ঘটায় এবং সম্ভাব্য চিকিৎসা সেসব পরিবর্তন প্রতিরোধ করতে পারে কি না।

গবেষণার অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরির ডিশে ক্ষুদ্রাকৃতির ত্রিমাত্রিক ‘অর্গানয়েড’ তৈরি করেছেন, যা মানুষের সেরিপ্রাল কর্টেক্সের প্রধান কোষের ধরন ও বিকাশের বৈশিষ্ট্যগুলোকে ফুটিয়ে তুলেছে।

মস্তিষ্কের এ অংশটি প্রজ্ঞা, ভাষা, মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো উচ্চ-স্তরের কার্যাবলি পরিচালনা করে। এজন্য তারা ত্বক বা রক্তের বিভিন্ন কোষকে রিপ্রোগ্রাম করে স্টেম কোষে রূপান্তর করেছেন, যা দেহের প্রায় যে কোনো কোষে পরিণত হতে পারে।

ইঁদুরগুলোকে বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে প্রস্তুত করার সময় বিজ্ঞানীরা এমন এক জিনগত কৌশল প্রয়োগ করেছেন, যা সেরিপ্রাল কর্টেক্স ও স্মৃতিশক্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হিপোক্যাম্পাসের বেশিরভাগ কোষের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

গবেষক পাসকা বলেছেন, “ইঁদুরের কর্টেক্সের মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে দখল করা স্থানটি জন্মের পরপরই মানব কর্টিকাল অর্গানয়েড প্রতিস্থাপনের সুযোগ করে দেয় ও মানব টিস্যুকে বেড়ে ওঠার পর্যাপ্ত জায়গা দেয়।”

এসব ইঁদুরে প্রতিস্থাপিত অংশ বিভিন্ন ধরনের কর্টিকাল কোষ তৈরি ও এদের পুরো স্নায়ুতন্ত্র জুড়ে কার্যকরী সংযোগ স্থাপন করে।

উৎপাদিত কর্টিকাল কোষগুলোর মধ্যে ‘ভন ইকোনোম নিউরন’ নামের এক দুর্লভ ধরনের কোষও রয়েছে, যা ডিমেনশিয়ার কিছু রূপের ক্ষেত্রে সংবেদনশীল বলে বিবেচিত।

মস্তিষ্কের জটিল রোগ নিয়ে গবেষণায় অগ্রগতি

ল্যাবরেটরিতে তৈরি মানুষের মস্তিষ্কের টিস্যু ইঁদুরের দেহে প্রতিস্থাপনের পর এ সংক্রান্ত গবেষণার সঠিক পরিভাষা নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকরা।

‘স্ট্যানফোর্ড স্নায়ুবিজ্ঞানী পাসকা বলেছেন, “একটি বিষয়ে আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, তা হচ্ছে পরিভাষা। হিউম্যানাইজড ইঁদুর, মানব মস্তিষ্কওয়ালা ইঁদুর এ ধরনের বর্ণনাগুলো এর সঠিক প্রতিনিধিত্ব করে না।

“এসব প্রাণীর নিজস্ব স্নায়ুতন্ত্রই রয়েছে। তবে এর ভেতরে মানব কর্টিকাল টিস্যুর একটি বড় অংশ রয়েছে, যা বিকাশ লাভ করে ও এরসঙ্গে সংহত হয়ে সংযোগ স্থাপন করে।

“গবেষকরা এসব প্রাণীকে ‘জেনোকর্টিক্যাল’ ইঁদুর হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা ‘বিদেশী’ প্রতিস্থাপিত মানব কর্টিকাল টিস্যুকে নির্দেশ করে। কর্টিক্যাল অর্গানয়েডগুলো আমাদের মানব মস্তিষ্কের বিকাশ ও রোগ গবেষণার জন্য একটি পরীক্ষামূলক সুযোগ করে দেয়।

“এগুলো কোনো ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক নয় এবং মানব মস্তিষ্কের পূর্ণ জটিলতাও পুনরায় তৈরি করে না। তবে এগুলো আমাদের এমন সব মানব স্নায়ু কোষের ধরন ও বিকাশগত প্রক্রিয়াগুলো গবেষণার সুযোগ দেয়, যা অন্যথায় কঠিন হত।”

গবেষকরা বলছেন, অটিজম, মৃগী রোগ, সিজোফ্রেনিয়া ও সেরিব্রাল পালসির মতো মস্তিষ্কের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে শুরু হওয়া রোগ ও জন্মের সময় অক্সিজেনের অভাবের মতো পরিবেশগত বিভিন্ন আঘাত গবেষণার জন্য পদ্ধতিটি কার্যকর।

এ গবেষণা মডেলের প্রথম প্রয়োগ হিসেবে গবেষকরা ইঁদুরগুলোকে অক্সিজেনের ঘাটতির মুখে ফেলেছিলেন। বাড়তি মানব মস্তিষ্ক অক্সিজেনের অভাবে অসম্ভব নাজুক অবস্থায় পড়ে।

গর্ভাবস্থায় বা জন্মের সময় এমনটা ঘটলে তা সেরিব্রাল পালসিতে অবদান রাখা ও মৃগী রোগ বা অটিজমের ঝুঁকি বাড়ানোসহ বড় ধরনের স্নায়বিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

তবে মানব স্নায়ু টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে এমন মাত্রার অক্সিজেনের অভাবের বিরুদ্ধেও ইঁদুর বেশ সহনশীল।

পাসকা বলেছেন, “জেনোকর্টিক্যাল ইঁদুরগুলোর ক্ষেত্রে, কম অক্সিজেনের নির্দিষ্ট সময় মানব কর্টিকাল কোষে যথেষ্ট ক্ষতি সাধন করেছে এবং এরসঙ্গে হাঁটার ভঙ্গি বা গেইট ও মোটর সমন্বয়ে অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে”, অথচ ল্যাবরেটরির ইঁদুরের ক্ষেত্রে স্বল্প অক্সিজেনে এমন কোনো প্রভাব দেখা যায়নি।

গবেষকরা বলছেন, এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দুটি বিষয়ের ওপর ফোকাস করা কঠোর নৈতিক নির্দেশিকা মেনে পরিচালিত হয়েছে।

পাসকা বলেছেন, “প্রথমটি প্রাণী কল্যাণ, যেখানে বৈজ্ঞানিক প্রশ্নটিকে অবশ্যই প্রাণীদের ব্যবহারকে ন্যায্যতা দিতে, কষ্ট সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখতে ও বিকল্প উপায়ে যখন পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া সম্ভব নয় কেবল তখনই এসব পরীক্ষা চালানো উচিত।

“দ্বিতীয়টি, ক্রমাগত জটিল মানব স্নায়ু টিস্যুকে একটি প্রাণীর স্নায়ুতন্ত্রে প্রবর্তন করলে এমন কোনো অপ্রত্যাশিত বা নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরি হতে পারে কি না যার জন্য অতিরিক্ত নৈতিক পর্যালোচনার প্রয়োজন হয়।”

জৈবিকভাবে প্রস্তুত এসব ইঁদুর চলাফেরা ও এদের পরিবেশ অনুসন্ধানের সময় ল্যাব ইঁদুরের মতোই দেখতে ছিল। তবে এদের সূক্ষ্ম মোটর সমন্বয়ে ঘাটতি ও স্মৃতিশক্তির সক্ষমতায় ভিন্নতা দেখা গেছে।

পাসকা বলেছেন, “কাজটি না করার খরচও আমাদের বিবেচনা করতে হবে। স্নায়বিক ও মানসিক রোগ প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজনের ওপর প্রভাব ফেলে, অথচ অনেক ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া সীমিত ও কার্যকর চিকিৎসাও নেই।