Published : 16 Sep 2026, 05:53 PM
জাপানে ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রথমবারের মতো এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে জাপানে ১ লাখ ৭ হাজার ৬৭৭ জন শতবর্ষী মানুষ আছে।
বিবিসি লিখেছে,বিশ্বের অন্য যে কোনও দেশের তুলনায় জাপানেই এ ধরনের মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাদের মধ্যে প্রায় ৮৮ শতাংশই নারী।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক নারী কিয়োটো সিটির ১১৪ বছর বয়সী কিশিমোতো ফুয়ো এবং সবচেয়ে বয়স্ক পুরুষ কুমামোতোর ১১২ বছর বয়সী কাতো হিকারু।
চিকিৎসা ও প্রযুক্তির অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে জাপানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেনিচিরো উয়েনো বলেন, “এত বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘ, সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপন করছেন দেখে আমি আনন্দিত।”
তবে একটি টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে দেশটি যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, সে বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাস ও সক্রিয় জীবনযাপনসহ বেশ কয়েকটি বিষয়কে জাপানিদের দীর্ঘায়ুর কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশটির প্রধান খাবার তালিকায় রয়েছে মাছ, শাকসবজি ও ভাত; যা বহু পশ্চিমা খাবারের তুলনায় কম স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত। এছাড়া, প্রবীণ ব্যক্তিরা নিয়মিত হাঁটেন, গণপরিবহন ব্যবহার করেন, সাইকেল চালান এবং শরীরচর্চা করেন।
কয়েক বছর ধরেই জাপানের জনসংখ্যায় বয়স্কদের হার বাড়ছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটিতে শিশুদের চেয়ে প্রবীণদের ডায়াপার বিক্রি বেশি হচ্ছে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নতুন পণ্যও তৈরি করেছে, যার মধ্যে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ চালনায় সহায়তাকারী ‘পাওয়ার্ড এক্সোস্কেলেটন’ এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফোকাস সামঞ্জস্যকারী চশমা অন্যতম।
একটি দেশের জনসংখ্যা স্বাভাবিক ভারসাম্যে রাখতে প্রতি নারীর গড়ে ২ দশমিক ১ জন সন্তানের জন্ম দেওয়া প্রয়োজন। তবে গত বছর জাপানের মোট প্রজনন হার রেকর্ড সর্বনিম্ন ১ দশমিক ১৪-এ নেমে এসেছে।
‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পপুলেশন অ্যান্ড সোশ্যাল সিকিউরিটি রিসার্চ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০৭০ সালের মধ্যে দেশটির মোট জনসংখ্যা ৮ কোটি ৭০ লাখে নেমে আসতে পারে; যা ২০০৮ সালের সর্বোচ্চ ১২ কোটি ৮০ লাখ জনসংখ্যার তুলনায় ৩০ শতাংশ কম।
বর্তমানে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ, যা ২০৭০ সালের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাপানি কর্তৃপক্ষ এই প্রবণতাকে ‘অস্তিত্বের সংকট’ বলে অভিহিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এই জনসংখ্যা হ্রাসকে একটি ‘নীরব জরুরি অবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
২০২৫ সালে জাপানের ৪৭টি প্রশাসনিক অঞ্চলের মধ্যে দুটি বাদে বাকি সবকটিতেই মোট জনসংখ্যা কমেছে এবং এই হ্রাসের গতি দিন দিন ত্বরান্বিত হচ্ছে।
তরুণদের বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করতে সরকারের নেওয়া নানা কর্মসূচি ও ভর্তুকি জন্মহার বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিয়ের হার কমে যাওয়া এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার পাশাপাশি সন্তান লালন-পালনের খরচ বেড়ে যাওয়ার মতো নানা জটিল কারণ এর পেছনে রয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে অভিবাসীর সংখ্যা বাড়লেও দেশটির মোট জনসংখ্যার মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ বিদেশি এবং অতিরিক্ত বিদেশি নাগরিক গ্রহণের ক্ষেত্রে জনমনে বিরোধিতা বেড়েছে।
১৯৬৩ সালে জাপান যখন শতবর্ষীদের নিয়ে জরিপ শুরু করে, তখন ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষ ছিলেন মাত্র ১৫৩ জন। ১৯৮১ সালে এই সংখ্যা ১ হাজারে পৌঁছায় এবং ১৯৯৮ সালে তা দাঁড়ায় ১০ হাজারে।
জাপানের বার্ষিক সরকারি ছুটি ‘বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধা দিবস’-এর আগে সাম্প্রতিক এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়। এই দিনে ১০০ বছরে পা দেওয়া নাগরিকদের সরকার ব্যক্তিগত চিঠি ও ঐতিহ্যবাহী সাকে কাপ দিয়ে সম্মানিত করে।
তবে আগের গবেষণাগুলোতে বিশ্বব্যাপী শতবর্ষী মানুষের সংখ্যার নির্ভুলতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, উপাত্তের ভুল, অনির্ভরযোগ্য সরকারি রেকর্ড এবং জন্ম সনদের অনুপস্থিতি অতিরিক্ত সংখ্যা দেখানোর কারণ হতে পারে।
২০১০ সালে জাপানে পারিবারিক নিবন্ধনের একটি সরকারি অডিটে দেখা যায়, ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সী হিসেবে তালিকাভুক্ত ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষের কোনও খোঁজ নেই; যাদের অনেকেই কয়েক দশক আগে মারা গেছেন।
হিসাবের এই বৈষম্যের পেছনে দুর্বল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং বয়স্ক স্বজনদের পেনশন পাওয়ার সুবিধা বজায় রাখতে কিছু পরিবার তাদের মৃত্যুর খবর লুকিয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়েছিল।