২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

স্মৃতি হারানো মানেই কি বয়সের স্বাভাবিক পরিণতি?

বয়সের কারণে কি প্রবীণরা কথা ভুলে যান, নাকি নেপথ্যে লুকিয়ে আছে ডিমেনশিয়ার মতো জটিল ব্যাধি? আলঝেইমার্স নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সময় এসেছে, লিখেছেন মাহমুদা মাহমুদা।

স্মৃতি হারানো মানেই কি বয়সের স্বাভাবিক পরিণতি?

স্মৃতি মুছে গেলেও অবিকল থেকে যায় মানুষের অনুভূতি; আলঝেইমার্সে প্রয়োজন চিকিৎসা, ধৈর্য ও গভীর মানবিক সম্পর্ক।

মাহমুদা মাহমুদা মাহমুদা মাহমুদা

Published : 21 Sep 2026, 10:57 PM

Updated : 21 Sep 2026, 11:29 PM

“মা, আমাকে চিনতে পারছ?”

প্রশ্নটি খুব সাধারণ। কিন্তু আলঝেইমারে আক্রান্ত কোনো মানুষের সন্তানের জন্য একদিন এটাই হয়ে উঠতে পারে জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা অনেক কিছু ভুলে যাই। চাবি কোথায় রেখেছি মনে থাকে না, পরিচিত কারও নাম কিছুক্ষণ মনে আসে না, কখনো কোনো কাজ করার কথা ভুলে যাই। তাই পরিবারের বয়স্ক কেউ একই কথা বারবার বললে এবং কিছু মনে রাখতে না পারলে আমরা সহজেই বলে দিই, “বয়স হয়েছে, তাই এমন হচ্ছে।”

কিন্তু সব ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক বার্ধক্য নয়।

ডিমেনশিয়া এমন একটি অবস্থা, যা মানুষের স্মৃতি, চিন্তা, আচরণ, ভাষা এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতাকে ধীরে ধীরে প্রভাবিত করতে পারে। আলঝেইমার রোগ ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) হিসাব অনুযায়ী, ডিমেনশিয়ার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে আলঝেইমারের ভূমিকা রয়েছে। ২০২১ সালে বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ডিমেনশিয়া নিয়ে বসবাস করছিলেন এবং প্রতিবছর প্রায় এক কোটি নতুন রোগী যুক্ত হচ্ছেন। তাদের ৬০ শতাংশের বেশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বাস করেন।

অর্থাৎ, এটি শুধু উন্নত বিশ্বের সমস্যা নয়; বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও এটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশে ২০১৯ সালে সাতটি প্রশাসনিক বিভাগের ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী ২,৭৯৫ জনকে নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় ডিমেনশিয়ার প্রাদুর্ভাব ৮ শতাংশ পাওয়া যায়। গবেষণাটিতে শহর ও গ্রাম—দুই ধরনের জনগোষ্ঠীই অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ডিমেনশিয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো দেরিতে শনাক্ত হওয়া। কারণ পরিবার অনেক সময় প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেয় না।

সাম্প্রতিক ঘটনা বারবার ভুলে যাওয়া, একই প্রশ্ন বারবার করা, পরিচিত জায়গায় গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলা, পরিচিত কাজ করতে অসুবিধা হওয়া, কথার মধ্যে সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া, সময় ও স্থান সম্পর্কে বিভ্রান্ত হওয়া এবং আচরণ ও ব্যক্তিত্বে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন—এসব বিষয় নজরে রাখা প্রয়োজন।

তবে প্রতিটি স্মৃতিভ্রংশ আলঝেইমার নয়। ঘুমের সমস্যা, বিষণ্নতা, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, শারীরিক অসুস্থতা এবং স্ট্রোকের মতো কারণেও স্মৃতি ও চিন্তায় পরিবর্তন আসতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে নিজের মতো রোগের নাম না দিয়ে চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি।

২০২৬ সালের বিশ্ব আলঝেইমার্স মাসের মূল বার্তা হলো—“The Earlier You Know, The More You Can Do: A Dementia Diagnosis Matters.” অর্থাৎ, যত আগে জানা যায়, তত বেশি কিছু করার সুযোগ থাকে। আলঝেইমার্স ডিজিজ ইন্টারন্যাশনালের এবারের প্রচারে প্রাথমিক রোগ নির্ণয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কারণ রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে চিকিৎসা, যত্ন ও সহায়তার বিভিন্ন পথ খুলে যেতে পারে।

আলঝেইমারকে শুধু একজন ব্যক্তির রোগ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত প্রভাব বোঝা যায় না।

একজন মা হয়তো ধীরে ধীরে নিজের সন্তানের নাম ভুলে যাচ্ছেন। একজন বাবা হয়তো বহু বছরের পরিচিত বাড়ির পথ চিনতে পারছেন না। একজন জীবনসঙ্গী হয়তো বুঝতে পারছেন না, পাশে থাকা মানুষটি কেন আগের মতো নেই।

এই পরিবর্তন পরিবারের জন্য গভীর মানসিক চাপ তৈরি করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের যত্নের বড় অংশ পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনরাই দিয়ে থাকেন। বিশ্বজুড়ে অনানুষ্ঠানিক পরিচর্যাকারীরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা যত্ন ও তদারকিতে ব্যয় করেন। এই দায়িত্বের মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক প্রভাবও কম নয়।

আমাদের সমাজে তাই একটি প্রশ্ন করা জরুরি—যিনি প্রতিদিন একজন ডিমেনশিয়া আক্রান্ত মানুষের যত্ন নিচ্ছেন, তার যত্ন কে নিচ্ছে?

পরিচর্যাকারীর ক্লান্তি, হতাশা বা বিরক্তিকে আমরা অনেক সময় স্বার্থপরতা হিসেবে দেখি। অথচ দীর্ঘদিনের পরিচর্যা নিজেই একটি কঠিন মানসিক ও শারীরিক দায়িত্ব। রোগীর পাশাপাশি পরিচর্যাকারীর জন্যও তথ্য, প্রশিক্ষণ, বিশ্রাম ও মানসিক সহায়তা প্রয়োজন।

স্মৃতি কমে গেলেও মর্যাদা কমে না এটা আমাদের মনে রাখতে হবে। ডিমেনশিয়ার সঙ্গে লড়াই করা মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজনগুলোর একটি হলো এই মর্যাদা।

একই প্রশ্ন বারবার করলে তাকে ধমক দেওয়া সহজ। ভুল করলে হাসাহাসি করা আরও সহজ। কিন্তু তিনি যে প্রশ্নটি আগেও করেছেন, সেটি হয়তো তার নিজের কাছে নতুন মনে হচ্ছে।

আমরা যদি এটুকু বুঝতে পারি, তাহলে আমাদের আচরণ বদলে যেতে পারে।

একজন মানুষ তার নাম ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু তার অনুভূতি হারিয়ে যায় না। তিনি হয়তো বুঝতে পারছেন না আমরা কে, কিন্তু আমাদের কণ্ঠের কোমলতা, বিরক্তি কিংবা ভালোবাসা অনুভব করতে পারেন।

তাই আলঝেইমারের যত্ন শুধু ওষুধ বা চিকিৎসার বিষয় নয়; এটি সম্পর্ক, ধৈর্য এবং মানবিকতারও বিষয়।

আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ার সব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবু প্রতিরোধের কথাও ভাবতে হবে। বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। তবে কিছু ঝুঁকি পরিবর্তনযোগ্য।

২০২৬ সালের নতুন নির্দেশনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির একটি বড় অংশ পরিবর্তনযোগ্য কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বায়ুদূষণ এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ। এসব ঝুঁকি কমানোর মাধ্যমে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমানো বা এর সূত্রপাত বিলম্বিত করার সুযোগ রয়েছে।

এখানেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। মস্তিষ্কের সুস্থতা শুধু বৃদ্ধ বয়সের বিষয় নয়; এর প্রস্তুতি শুরু হয় অনেক আগে।

বাংলাদেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাই ডিমেনশিয়া নিয়ে শুধু সচেতনতামূলক দিবস পালন যথেষ্ট নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় স্মৃতি ও জ্ঞানীয় সক্ষমতার পরিবর্তন শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি করা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, পরিবারকে সহজ ভাষায় তথ্য দেওয়া এবং পরিচর্যাকারীদের জন্য সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক কলঙ্ক কমানো। কারণ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষটি তার স্মৃতি হারাচ্ছেন—তার মানবিক মর্যাদা নয়।

বিশ্ব আলঝেইমার্স দিবস আমাদের শুধু একটি রোগের কথা মনে করিয়ে দেয় না; এটি আমাদের সম্পর্কগুলোর দিকে তাকাতেও শেখায়।

একদিন হয়তো প্রিয় মানুষটি আমাদের নাম মনে রাখতে পারবেন না। সেদিন প্রশ্নটা হবে না—“তিনি আমাকে চিনতে পারছেন কি না?”

প্রশ্নটা হবে—“আমি কি এখনও তাকে তার মতো একজন মানুষ হিসেবে দেখতে পাচ্ছি?”

স্মৃতি হারিয়ে যেতে পারে, পরিচয় ঝাপসা হয়ে যেতে পারে; কিন্তু একজন মানুষের প্রতি আমাদের সম্মান, ধৈর্য ও ভালোবাসা যেন হারিয়ে না যায়।

কারণ আলঝেইমার একজন মানুষের স্মৃতি কেড়ে নিতে পারে, তবে মানুষ হিসেবে তার মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার অধিকার আমাদের নেই।

মাহমুদা মাহমুদা মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা (এমএইচপিএসএস) বিশেষজ্ঞ। ই-মেইল: mahmuda101@gmail.com