Published : 16 Sep 2026, 06:40 PM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বিকাশ যৌথভাবে ধীর করার জন্য শীর্ষ প্রযুক্তিবিদদের আহ্বান থেকে নিজেদের সরিয়ে নিলেন মেটা প্ল্যাটফর্মের প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ।
মঙ্গলবার এআই প্রযুক্তির লাগাম টেনে ধরার যৌথ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে জাকারবার্গ বলেছেন, বাজার প্রতিযোগিতা ও আইনি দায়বদ্ধতার কারণেই কোম্পানিগুলো নিজ থেকেই নিরাপদ ও সতর্কতার সঙ্গে এআই তৈরিতে বাধ্য।
প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের একাংশের দাবি, এ প্রযুক্তি বর্তমানে বিভিন্ন কোম্পানির প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরির চেয়েও দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে এবং তা মানবজাতির জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করতে পারে।
এ সতর্কবার্তার জবাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত তা নিয়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষ ও শিল্পপতিদের মধ্যে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে জাকারবার্গের এ মন্তব্য তা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে জাকারবার্গ বলেছেন, “প্রতিটি ল্যাবেরই নিজেদের বিবিন্ন এআই মডেলকে নিরাপদে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গতি ধরে রাখার দায়িত্ব রয়েছে এবং তা নিশ্চিতের জন্য তাদের নিজস্ব পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে।”
গবেষকদের কাছ থেকে মানুষের জন্য অস্তিত্বের ঝুঁকির সতর্কবার্তা আসার পরপরই শনিবার বিভিন্ন এআই কোম্পানিকে তাদের মডেলের সক্ষমতা বাড়ানোর গতি ধীর করার আহ্বান জানিয়েছেন অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই।
তার এ বক্তব্যের কেবল তিন দিন পরই জাকারবার্গ এমন মন্তব্য করলেন। আমোদেইয়ের এ আহ্বানকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান ও এক্সএআইয়ের ইলন মাস্ক।
এআই নিয়ন্ত্রণ ও ধীর করার প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের অনীহা
এদিকে, সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এআইয়ের সম্ভাব্য ক্ষতিকর দিক নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, প্রযুক্তির সুরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এরইমধ্যে পর্যাপ্ত নীতিমালা রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, এআইয়ের উন্নয়নে কোনো ধরনের সংশয় তৈরি হলে শেষ পর্যন্ত চীনের লাভ হবে। মার্কিন বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি যাতে তাদের চীনা প্রতিদ্বন্দীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে সে কারণে কড়া নিয়ন্ত্রণের বিরোধী এমন ধারণার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াংয়ের মতো প্রযুক্তি জগতের শীর্ষ নির্বাহীরাও।
নিরাপত্তা ও নৈতিকতার দিকটির ওপর জোর দিয়ে জাকারবার্গ বলেছেন, “বিশ্বাস ও অ্যালাইনমেন্ট দ্রুতই গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা হয়ে উঠছে, যা বিভিন্ন এজেন্ট ও মডেলকে একে অপরের থেকে আলাদা করবে। যে ল্যাবই অ্যালাইনমেন্টের ওপর জোর দেবে না তারা পিছিয়ে পড়বে।”
জাকারবার্গ বলেছেন, নিজেদের মডেলের কারণে কোনো ধরনের ক্ষতি ঠেকানোর ক্ষেত্রে ল্যাবগুলোর শক্তিশালী প্রণোদনা রয়েছে। অন্যথায় তাদের আইনি দায়বদ্ধতার মুখে পড়তে হবে। নিরাপত্তার মান আরও জোরদার করতে এ বছরের শুরুতে মেটা তাদের ‘মিউজ এআই’ এজেন্টের প্রকাশ কিছুদিনের জন্য পিছিয়ে দিয়েছিল।
“অন্য সবাই এমনটা না করা পর্যন্ত আমরা কাউকে তা করতে বলিনি। আমরা দৈনন্দিন কাজের অংশ হিসেবেই এমনটা করেছি। কারণ তা মানুষ ও আমাদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।”
স্বাধীন মূল্যায়নই ‘শিল্পের সেরা অভ্যাস’
এআইয়ের নিজে নিজে উন্নত হওয়ার সক্ষমতা বা ‘রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’ সম্মিলিতভাবে ধীর করার আহ্বান জানিয়েছিলেন অ্যানথ্রপিক প্রধান দারিও আমোদেই।
তবে এর বিপরীতে জাকারবার্গ বলেছেন, মেটা তাদের মোট কম্পিউটিং সক্ষমতার ‘বড় অংশই’ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেকে উন্নত করা এআই ব্যবস্থার পেছনে না খাটিয়ে ব্যবহারকারীদের চাহিদা মেটায় এমন পণ্য তৈরিতে নিয়োজিত করেছে।
মেটার এআই বিভাগ ‘মেটা সুপারইনটেলিজেন্স ল্যাবস’ এরইমধ্যেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বাধীন মূল্যায়নকারীদের যুক্ত করেছে। বিষয়টিকে ‘শিল্পের সেরা অভ্যাস’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেছেন, “অন্যান্য ল্যাবও ঠিক একইভাবে কাজ করতে পারে।”
নিরাপত্তার বিষয়ে মেটাকে একজন দায়িত্বশীল কোম্পানি হিসেবে তুলে ধরার জন্য জাকারবার্গের এ তৎপরতা এমন এক সময়ে সামনে এল, যার কেবল কয়েক সপ্তাহ আগে শিশুদের আসক্ত করার অভিযোগে ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামের নকশা করার বিরুদ্ধে মার্কিন অঙ্গরাজ্যগুলোর করা মামলা নিষ্পত্তিতে মেটা ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার পর্যন্ত দিতে রাজি হয়েছে। তবে কোম্পানিটি কোনো অন্যায় স্বীকার করেনি।
বিভিন্ন এআই কোম্পানির যে কোনো সমন্বিত পদক্ষেপের প্রচেষ্টাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছেন ‘ফেডারেল ট্রেড কমিশন’ বা এফটিসি’র চেয়ারম্যান অ্যান্ড্রু ফার্গুসন।
মঙ্গলবার তিনি বলেছেন, নতুন নিয়মের পক্ষে লবিয়িংয়ের পাশাপাশি যেসব এআই কোম্পানি অ্যান্টিট্রাস্ট বা একচেটিয়া ব্যবসা নীতি থেকে ছাড় পাওয়ার চেষ্টা করছে তাদের বিষয়ে সবারই ‘গভীরভাবে সন্দিহান’ হওয়া উচিত।
ফার্গুসন সরাসরি অ্যানথ্রপিকের নাম না নিলেও গেল সপ্তাহে নিরাপত্তার কারণে এআইয়ের উন্নয়নের গতি ধীর করার বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন কোম্পানি যেন একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে সেজন্য অ্যান্টিট্রাস্টের অনুমতি চেয়েছিলেন আমোদেই।