০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি বৃহস্পতিবার, ‘কালো চুক্তি’ বলছে আন্দোলনকারীরা

ঢাকায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় এনসিটির কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর হবে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Oct 2026, 09:46 PM

Updated : 07 Oct 2026, 10:16 PM

আন্দোলনের মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আগামী ১৫ বছর পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার চুক্তি হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার।

ঢাকায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামে বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় এনসিটির কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ও সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ইসা কাজিম উপস্থিত থাকবেন।

এরআগে ১ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এনসিটির দায়িত্ব আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার খসড়া চুক্তি অনুমোদন করার কথা বলা হয়। তবে সে বিজ্ঞপ্তিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম ছিল না।

এদিকে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বুধবার সন্ধ্যায় বন্দর এলাকায় মশাল মিছিল করেছে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এটিকে ‘কালো চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে এর বিরোধিতায় বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় চট্টগ্রামে বন্দর ভবনের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দিয়েছে তারা।

সেখান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন বন্দরের শ্রমিক নেতারা। পাশাপাশি বন্দর রক্ষা কমিটি ও শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) এই চুক্তি স্বাক্ষরের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠা-নামার চারটি প্রধান টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এবং সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) কাঠামোর অধীনে এনসিটি পরিচালনার কাজ ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সেসময় ওই উদ্যোগ পরিণতি পায়নি।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এনসিটির দায়িত্ব বিদেশি অপরাটেরের হাতে দেওয়ার কার্যক্রম আবার শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এ বিষয়ে চুক্তির জোর আলোচনা শুরু হলে আন্দোলনে যায় বন্দরের শ্রমিক কর্মচারীরা। এর প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার ৮ ফেব্রুয়ারি এনসিটি বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত করে।

পরে বিএনপির নতুন সরকার গেল ৪ জুন দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়। সরকারের নির্দেশনার পর আলোচনা প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ১২ সদস্যের একটি সাপোর্ট টিমও গঠন করে।

এনসিটির ইজারা প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে কয়েক মাস ধরে বন্দর রক্ষা কমিটি গণঅনশন, বিক্ষোভ মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। গত সেপ্টেম্বরে একই দাবিতে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দেয় বন্দর শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা পরিষদ।

এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি অপারেটরকে দেওয়ার পেছনে সরকারের মূল যুক্তিগুলো হল, বন্দরের অপারেশনাল দক্ষতা বাড়াতে এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও গতিশীল করা। লজিস্টিকস ও পোর্ট অবকাঠামো খাতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিধি ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। একইসঙ্গে বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থানীয় জনবলের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা অর্জন।

অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা বলছেন, এনসিটি পরিচালনার ভার বিদেশিদের দিলে চট্টগ্রাম বন্দর যেমন লোকসানের দিকে যাবে ও দক্ষ কর্মশক্তি হারাবে তেমনিভাবে ভূ-রাজনৈতিক ভাবেও বাংলাদেশ বিপদের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা আছে। এছাড়া বহুজাতিক কোম্পানিকে ইজারা দিলে সরকার আয় থেকে বঞ্চিত হবে, দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হয়ে যাবে এবং ‘কনসেশন’ চুক্তির কারণে বিপজ্জনক পণ্য খালাসেরও আশঙ্কা রয়েছে।

বুধবার চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজনের খবর আসতেই বন্দর এলাকায় আবার বিক্ষোভ শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। চুক্তির এই সিদ্ধান্তের ফলে সৃষ্ট জনক্ষোভ ও আন্দোলনের দায় সরকারকেই বহন করতে হবে বলে সেখানে হুশিয়ারী দেয় বন্দর রক্ষা কমিটি।

স্কপ চট্টগ্রামের নেতারা অবিলম্বে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া বন্ধের দাবি জানিয়েছে।

কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ বিষয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ জানাতে পারবে। আমরা অনুষ্ঠানের আয়োজন করছি না। পুরো বিষয়টি তারা দেখাশোনা করছে। হয়ত বন্দরের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকতে পারেন। এখন এ সম্পর্কে নো কমেন্টস।”

চুক্তির বিষয়ে জানতে বন্দর চেয়ার‌ম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানকে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জাকারিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অনুষ্ঠানটি ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের আয়োজনে হবে। ডিপি ওয়ার্ল্ডকে কনসেশন চুক্তির অধীনে এনসিটি ১৫ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।

“চুক্তির আওতায় বার্ষিক একটি নুন্যতম ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই পরিমাণ ট্যারিফ দিতেই হবে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে। এর নিচে দিতে পারবে না। আর নূন্যতম ১২ লাখ ৩০ হাজার কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পর আরও বেশি সংখ্যক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হলে সংখ্যার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে ট্যরিফের হার বাড়বে।”

মশাল মিছিল ও ক্ষোভ

এনসিটি পরিচালনার ভার বিদেশি অপারেটরদের দেওয়ার প্রতিবাদে সন্ধ্যায় মশাল মিছিলে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সমন্বয়ক শ্রমিক নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, “আমরা বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় বন্দর ভবনের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল করব। আমরা শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করব। আগামীকালের মিছিল থেকে পরবর্তী আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।”

মশাল মিছিলে অংশ নেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির ও বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম।

অন্যদিকে এক বিবৃতিতে ‘জনমত উপেক্ষা করে’ ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম। বিবৃতিতে সংগঠনটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার এবং সদস্য সচিব ফজলু কবির মিন্টু বলেন, “এ চুক্তি ইতিহাসে কালো চুক্তি হিসাবে চিহ্নিত হবে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ নিয়ে জনগণের মতামত উপেক্ষা করে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

“জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এই চুক্তির শর্ত, পরিচালনার অধিকার, আর্থিক দায় এবং শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে জনগণকে স্পষ্টভাবে অবহিত না করে স্বাক্ষরের আয়োজন গভীর উদ্বেগের বিষয়। উন্নয়ন ও বিনিয়োগের কথা বলে জনমত উপেক্ষার এই প্রক্রিয়াকে গ্রহণযোগ্য করা যাবে না।”

জনমত উপেক্ষা করে চুক্তি স্বাক্ষরের পথে এগোলে এর বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে এবং সৃষ্ট জনক্ষোভ ও আন্দোলনের দায় সরকারকেই বহন করতে হবে বলে হুশিয়ার করা হয় বিবৃতিতে।

বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় শ্রমিকসমাজসহ সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও আহ্বান জানায় বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম।

চুক্তি নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে পৃথক বিবৃতি দিয়েছে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), চট্টগ্রাম। বিবৃতিতে বলা হয়, “জনগণের কাছে জবাবদিহি এড়িয়ে এই বন্দরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চেষ্টা গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থি।”

স্কপ চট্টগ্রাম অবিলম্বে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া বন্ধ, প্রস্তাবিত চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশ এবং শ্রমিক, বন্দর ব্যবহারকারী, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট জনগণের মতামত গ্রহণের দাবি তুলেছে। এ চুক্তির বিরোধিতায় আন্দোলনরত সব সংগঠনের সঙ্গেও স্কপ চট্টগ্রাম একাত্মতা ও সংহতি প্রকাশ করেছে।

স্কপ চট্টগ্রামের যুগ্ম সমন্বয়ক খোরশেদ আলম ও রবিউল হক শিমুল, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইদ্রিস মিয়া, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রামের বিভাগীয় সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি তপন দত্ত, সাধারণ সম্পাদক মছিউদ দৌলাসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা এই বিবৃতি দেন।