বন্ডের সুদের হার বাড়ায় বিপদে ঋণনির্ভর এআই কোম্পানি
নতুন করে ঋণ নিতে বাজারে যাওয়া বিভিন্ন কোম্পানিকে এখন প্রায় ৫ দশমিক ১৭ শতাংশের কাছাকাছি ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি ইল্ডের মুখে পড়তে হচ্ছে, যা বছরের শুরু থেকে প্রায় ১ শতাংশ বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রে এ সপ্তাহে ট্রেজারি ইল্ড বা সরকারি বন্ডের সুদের হার ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ায় ঋণনির্ভর বিভিন্ন কোম্পানির ঋণের খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবকাঠামো নির্মাণে এরইমধ্যে যে রেকর্ড পরিমাণ ব্যয় হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে চলেছে।
এআই খাতের জোয়ারে ডেটা সেন্টার ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কোম্পানি ব্যবহারকারীদের ক্রমাগত চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
এ প্রেক্ষাপটে এ বছরের জুনে ‘জেপি মরগান চেজ’ পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০৩০ সাল পর্যন্ত এআই-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলারের ঋণ ইস্যু করা হবে।
নতুন করে ঋণ নিতে বাজারে যাওয়া বিভিন্ন কোম্পানিকে এখন প্রায় ৫ দশমিক ১৭ শতাংশের কাছাকাছি ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি ইল্ডের মুখে পড়তে হচ্ছে, যা বছরের শুরু থেকে প্রায় ১ শতাংশ বেশি।
এর মানে, বন্ড বা ঋণ ইস্যুকারী বিভিন্ন কোম্পানিকে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে আরও বেশি মুনাফার হার বা আকর্ষণীয় রেট অফ রিটার্ন অফার করতে হবে।
বাজার অবশ্য এখনও আতঙ্কিত হয়ে পড়েনি, এ মুহূর্তে তো নয়ই। ঋণভারে জর্জরিত ‘নিওক্লাউড’ কোম্পানি কোরওয়েভের শেয়ারের অবস্থা বেশ ভালো রয়েছে ও এ সপ্তাহে এগুলোর দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে, এআই খাতের সম্প্রসারণের জন্য ঋণ বাজারের ওপর নির্ভর করা ওরাকলের সময়টা কিছুটা কঠিন যাচ্ছে। এ সপ্তাহে তাদের শেয়ারের দাম ৭ শতাংশ ও এ বছর সার্বিকভাবে প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।
এদিকে, এআই প্রকল্পগুলোতে মূলধন জোগানদাতা জাপানের সফটব্যাংক এ সপ্তাহে ‘জাংক বন্ড’ বা উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বন্ড বিক্রির মাধ্যমে ১ হাজার ১১০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে, যার মধ্যে ৭ বছর মেয়াদি বন্ডের ওপর সুদের হার ছিল ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
‘সিবার্ট ফিন্যান্সিয়াল’-এর চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসার মার্ক ম্যালেক বলেছেন, “তাদের এই অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাজারের নির্ধারিত শর্তই মেনে নিতে হচ্ছে।
“আমার মতে, এসব কোম্পানির বেশিরভাগেরই দাম নিয়ে দরকষাকষির সুযোগ নেই। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তাদের যেভাবেই হোক সর্বোচ্চ পরিমাণ মূলধন সংগ্রহ করতেই হবে।”
এআই উন্মাদনার কেন্দ্রে রয়েছে শীর্ষ মডেল ডেভেলপার ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক, যাদের প্রত্যেকেরই বাজার মূল্য প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
তাদের উন্নত বিভিন্ন মডেলের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিতের পাশাপাশি অন্যান্য কোম্পানির মডেল ও সেবাপ্রদানের লক্ষ্যে অ্যামাজন, গুগল, মেটা ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টরা এ বছরে শত শত কোটি ডলার মূলধনী ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২৭ সালে এই ব্যয় আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিনিয়োগের বড় অংশ ঋণ সংগ্রহের মাধ্যমে মেটানো হলেও ওইসব প্রযুক্তি জায়ান্টের সবারই ইনভেস্টমেন্ট গ্রেড ক্রেডিট রেটিং রয়েছে। ফলে তারা তুলনামূলক কম খরচে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে।
তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বাকি বিভিন্ন কোম্পানির জন্য সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
সতর্কবার্তা কি উঁকি দিচ্ছে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাইভেট ক্রেডিটের এক জ্যেষ্ঠ বিনিয়োগকারী বলেছেন, ভবিষ্যতে বিভিন্ন নিওক্লাউডের জন্য ঋণ বা অর্থায়ন পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠবে। কারণ এসব কোম্পানির বাড়তি খরচ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত আর্থিক নিরাপত্তা নেই।
‘মিতসুবিশি এইচসি ক্যাপিটাল আমেরিকা’র ভাইস প্রেসিডেন্ট রাইলি টম্পসন বলেছেন, ঋণগ্রহীতারা উচ্চ সুদে ঋণ দিতে রাজি থাকলেও ঋণদাতারা কোন প্রকল্পে অর্থায়ন করবেন সে বিষয়ে এখন অনেক বাছাই বা কড়াকড়ি করছেন।
“বাজারে ৫০টি নিওক্লাউডের তালিকা থাকার পরিবর্তে সম্ভবত এমন ২০টি কোম্পানি রয়েছে, যেগুলোর প্রতি বাজার প্রকৃতপক্ষেই আগ্রহী।”
গত বছর পাবলিক হওয়া কোরওয়েভ সুদের হার নিয়ে আগেই সতর্ক করেছিল।
তাদের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক ফাইলিংয়ে কোম্পানিটি বলেছে, জুন পর্যন্ত তাদের বকেয়া ফ্লোটিং রেট ঋণের পরিমাণ অনুসারে, সুদের হার প্রতি ১০০ বেসিস পয়েন্ট বা ১ শতাংশ বাড়লে তাদের সুদের খরচ ৩ কোটি ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
সম্ভবত এর এক প্রাথমিক সতর্কবার্তা এ সপ্তাহেই এসেছে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রকাশনা ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনের পর ওরাকলের শেয়ারের দামে পতন ঘটে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অতিরিক্ত খরচ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে কোম্পানিটি নিউ মেক্সিকোর ডেটা সেন্টার প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত এক ‘ফোর্স মেজর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতির নোটিশ পাঠিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘প্রজেক্ট জুপিটার’ নামের ক্যাম্পাসটি যদি ২০২৮ সালে প্রত্যাশিতভাবে চালু হতে ব্যর্থ হয় তবে কোম্পানিটি এর অর্থ দেওয়া পিছিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
তবে, ওরাকল বলেছে, প্রকল্পটি তাদের ‘নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ীই এগিয়ে চলেছে’।
কেবল ক্রমাগত সুদের হারই একমাত্র উদ্বেগের বিষয় নয়। এ সপ্তাহে বন্ডের সুদের হার হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আগেই উন্নত বিভিন্ন মডেল মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে গবেষকদের উদ্বেগ প্রকাশের পর অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী এআই উন্নয়নের গতি কিছুটা ধীর করার আহ্বান জানাতে শুরু করেছিলেন।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে এআই ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে জনরোষ একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
এনবিসি নিউজ ডিসিশন ডেস্ক ও সার্ভে মাংকির সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে, ৬৯ শতাংশ উত্তরদাতা তাদের স্থানীয় এলাকায় এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতা করেছেন।
গেল মাসে বিদ্যুৎ সংযোগ অনুমোদনের ওপর স্থগিতাদেশ জারির পর পুনর্নির্বাচনের কঠিন লড়াইয়ের মুখে থাকা টেক্সাসের রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট সোমবার সব ডেটা সেন্টার-সংক্রান্ত পরিবেশগত ছাড়পত্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
এর মধ্যেই এআই সেবার চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। যার সর্বশেষ উদাহরণ, মেটার ব্যক্তিগত সহকারী অ্যাপ ‘মিউজ’। সেপ্টেম্বরের শুরুতে চালুর পর থেকেই দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে অ্যাপটি।
অ্যাপ স্টোরে আসার প্রথম দুই সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে মিউজের ডাউনলোড ছাড়িয়েছে ২৫ লাখ, যার ফলে অ্যাপটি অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরের শীর্ষে থাকা চ্যাটজিপিটিকেও পেছনে ফেলেছে।
এ সপ্তাহে ‘এভারকোর’-এর মার্ক মহানেলি বলেছেন, আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে অ্যাপটি ১০ কোটি ব্যবহারকারীর মাইলফলক স্পর্শ করতে পারে।
ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি ‘কেবিআরএ’-এর কর্পোরেট, প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্সের বৈশ্বিক প্রধান অ্যান্ড্রু গিউডিসি বলেছেন, সুদের হার বাড়ার ফলে ভবিষ্যতের বিভিন্ন চুক্তিতে প্রভাব পড়তে পারে ঠিকই তবে ঋণগ্রহীতাদের চাহিদায় এর কোনো বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
“স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মানুষ হয়ত কিছুটা পিছু হটত বা বিরতি নিত। তবে আমার মনে হয় না এখানে তেমনটি ঘটবে, বরং আপনারা দেখতে পাবেন যে বড় বড় বন্ড বা ঋণ ইস্যু করার প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে অব্যাহত রয়েছে।”
এআই অবকাঠামো অর্থায়ন নিয়ে কাজ করা ‘লাথাম অ্যান্ড ওয়াটকিন্স’-এর ‘ইমার্জিং কোম্পানিজ অ্যান্ড গ্রোথ প্র্যাকটিস’-এর ভাইস চেয়ার হাইম জাল্টসমান বলেছেন, খরচ বাড়লে যে ‘কাউকে না কাউকে তা বহন করতেই হবে’ এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
ডেটা সেন্টার বা জিপিইউ অর্থায়নের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা ‘আমেরিকান কম্পিউট’-এর সিইও বার্নি মারগিউলিসের কাছে সমীকরণটি আরও সহজ।
তিনি বলেছেন, ঋণগ্রহীতারা উচ্চ খরচেও অর্থায়ন নিশ্চিত করতে উদগ্রীব হয়ে আছেন, বিশেষ করে যদি তাদের ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের সঙ্গে চুক্তি থাকে। কারণ এসব কোম্পানি আগামী বেশ কয়েক বছরের জন্য কম্পিউটিং সক্ষমতা নিশ্চিত করতে এরইমধ্যে বড় বড় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
“আপনার যদি অ্যানথ্রপিকের সঙ্গে কোনো চুক্তি থেকে থাকে তবে সুদের হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়ার কারণে কি আপনি সত্যিই কাজ থামিয়ে দেবেন?”
