এআই বিনিয়োগের সুফল পেতে শুরু করেছে বিশ্বের শীর্ষ কোম্পানিগুলো
এ বছরেই মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, গুগল ও মেটার মতো প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর সম্মিলিত খরচের হিসাব দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি ডলারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ঘিরে প্রাথমিক তুমুল আলোচনার পর এবার এই প্রযুক্তির পেছনে করা বিনিয়োগ থেকে আর্থিক সুফল পেতে শুরু করেছে বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানি।
সাম্প্রতিক প্রান্তিকে কোম্পানিগুলোর আর্থিক হিসাবে এই বিনিয়োগের ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
‘স্ট্যানফোর্ড হিউম্যান-সেন্টারড এআই ইনস্টিটিউট’-এর ‘এআই ইনডেক্স ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুসারে, ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও মুনাফা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কর্পোরেট খাতে এআই বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে।
২০২৫ সালে এ খাতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ হাজার ১৭০ কোটি ডলার, যা তার আগের বছরের তুলনায় ১৩০ শতাংশ বেশি।
এআই অবকাঠামো নির্মাণে এ বছরেই মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, গুগল ও মেটার মতো প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর সম্মিলিত খরচের হিসাব দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি ডলারে।
মোটা অংকের এই খরচের পর বিনিয়োগকারীরা যখন সরাসরি আর্থিক রিটার্ন বা আয়ের প্রত্যাশায় ছিলেন ঠিক তখনই এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে একাধিক বৈশ্বিক কোম্পানি তাদের পাওয়া সুফলের সুনির্দিষ্ট হিসাব সামনে আনতে শুরু করেছে।
সান্তান্দার ব্যাংক: এআই থেকে সরাসরি ব্যবসা বাড়ানো
বুধবার স্প্যানিশ ব্যাংকিং জায়ান্ট ‘সান্তান্দার’ বলেছে, ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসে তাদের পরিচালিত এআই কার্যক্রমগুলো ২১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের ব্যবসায়িক অবদান রেখেছে।
সান্তান্দার ব্যাংকের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হোসে গার্সিয়া কানতেরা বলেছেন, “ব্যাংকের কম গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো কমিয়ে আনতে সাহায্য করছে এআই, যাতে কর্মীরা বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দিতে পারেন।
“আয় ও ব্যয় দুটি জায়গাতেই প্রভাব ফেলছে এআই। ফলে আমরা এই প্রান্তিকে এসে এআইয়ের ইতিবাচক অবদানকে সরাসরি যোগ করতে সক্ষম হয়েছি।”
ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়ে কানতেরা বলেছেন, “আমরা ব্যাংকের প্রতিটি ধাপে এআই যোগ করছি। ফলে ঠিক কতটা এআই থেকে এসেছে তা আলাদা করে নির্দিষ্ট করা কঠিন হলেও এআই নিশ্চিতভাবেই গ্রাহকদের সেবার মান উন্নত করছে।”
নোভার্টিস ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড: আর্থিক ফলাফলে এআইয়ের সুফল
সুইজারল্যান্ডের ওষুধ নির্মাতা জায়ান্ট ‘নোভার্টিস’-এর প্রধান নির্বাহী ভাস নরসিমহান বলেছেন, এআই এখন কোম্পানি নেট মুনাফায় অবদান রাখতে শুরু করেছে।
এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে নোভার্টিস ৬০৪ কোটি ডলারের মূল পরিচালন মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি।
এআই থেকে ঠিক কতটুকু আয় এসেছে তা নির্দিষ্ট করে প্রকাশ না করলেও নরসিমহান বলেছেন, “আমার মনে হয় এটাই প্রথম প্রান্তিক, যেখানে আমরা খুব স্পষ্টভাবে আমাদের লাভ-ক্ষতির হিসাবে এআইয়ের বাস্তব ও দৃশ্যমান প্রভাব দেখতে পাচ্ছি।
“আমরা গবেষণাগার ও উন্নয়ন খাতে কাজ করছি, যাতে সেখানে এআই উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। বিপণন ও বিক্রয় খাতে এআই ব্যবহার করে আমরা যে সুফল পাচ্ছি তার প্রমাণ এরইমধ্যে আমাদের মূল মুনাফায় প্রতিফলিত হয়েছে।”
অন্যদিকে, বুধবার ‘স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক’-এর সিএফও মানুস কস্টেলো বলেছেন, তাদের ব্যাংকিং ব্যবসার প্রতিটি ক্ষেত্র জুড়েই এআইয়ের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
কোম্পানিটি তাদের তৃতীয় প্রান্তিকে মূল ব্যবসায় ১৪ শতাংশ পরিচালন আয় বাড়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে।
কস্টেলো বলেছেন, “আমাদের আয়ের প্রবৃদ্ধিতে ও ব্যয়ের তুলনায় আয় বাড়ানোর কৌশলে আপনারা এআইয়ের সুফল দেখতে পাবেন। এআই প্রযুক্তি কর্মকর্তাদের গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে ও অতিরিক্ত আয় ধরে রাখতে সাহায্য করছে।
“ব্যয়ের চেয়ে আয় যেভাবে দ্রুত বাড়ছে তার অন্যতম কারণ আমরা মূল ব্যাংকিং কার্যক্রমগুলোকে উন্নত ও সক্ষমতার সঙ্গে পরিচালনা করতে এআই টুল ব্যবহার করছি।”
কার্লসবার্গ ও প্রযুক্তি জায়ান্টদের আর্থিক প্রতিবেদনে এআই
বিয়ার উৎপাদক আন্তর্জাতিক কোম্পানি কার্লসবার্গের প্রধান নির্বাহী জ্যাকব আরুপ-অ্যান্ডারসন বলেছেন, তাদের কোম্পানিতে এআইয়ের সুফল এখনো বড় পরিসরে দৃশ্যমান হয়নি।
তবে এই প্রযুক্তি তাদের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম, খরচ কমানো, বাণিজ্যিক ও দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়া, বিপণন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কার্লসবার্গের আয় ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে।
বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতে এআইচালিত প্রবৃদ্ধি
বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো এআই থেকে সরাসরি আয়ের কথা বলেছে। ২১ অক্টোবর প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে মেটা বলেছে, এআই খাতে তাদের করা বিনিয়োগ ‘উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিজ্ঞাপন রাজস্ব বাড়িয়েছে’।
৩০ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত প্রান্তিকে কোম্পানিটির মোট আয় বেড়েছে ২৬ শতাংশ।
একই সময়ে এআই প্রতিযোগিতার মুখে গুগলের সার্চ খাতের আয়ের গতি কিছুটা ধীর হলেও তাদের ক্লাউড ব্যবসায় ব্যাপক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
বুধবার প্রকাশ পাওয়া প্রতিবেদন অনুসারে, তৃতীয় প্রান্তিকে গুগল ক্লাউডের আয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
