চীনে ফাটল এআই বুদ্বুদ: চার মাসে ক্ষতি ৪৮০০০ কোটি ডলার
এর মাধ্যমে শেয়ারবাজারের চড়া ওঠানামার চক্র ভেঙে স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী ‘ধীরগতির উর্ধ্বমুখী বাজার’ গড়ে তোলার যে চেষ্টা বেইজিং করছিল তা-ও মুখ থুবড়ে পড়ল।
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজার যখন দুলুনি খাচ্ছে তখনই চীনে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ধস।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও চীনা রপ্তানির ওপর আন্তর্জাতিক নানা বিধিনিষেধের আশঙ্কায় বাজারদরের অতিরিক্ত ফোলাফাঁপা বেলুন বা বুদ্বুদই ফেটে চীনে ধস নেমেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
কেবল চার মাসেরও কম সময়ে চীনের মূল ভূখণ্ডের এআই ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের শীর্ষ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ‘স্টার৫০’ সূচকটি ৪০ শতাংশের বেশি নিচে নেমেছে।
এতে বাজার থেকে এক ঝটকায় মুছে গেছে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি ডলারের মূলধন। বৈশ্বিক বাজারের জন্য যা অশুভ বার্তা দিচ্ছে।
পাশাপাশি, নিজেদের সঞ্চয়কারীদের শেয়ারবাজারে টেনে এআই বিপ্লবে অর্থায়নের যে উদ্যোগ চীন নিয়েছিল এতে বড় ধাক্কা খেল বেইজিং।
এই ধসের কারণে গত দুই বছর ধরে চাঙ্গা শেয়ারবাজার একমুহূর্তে স্থবির হয়ে পড়েছে। অথচ অর্থনৈতিক প্রণোদনার আশ্বাসে এই বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে ছিল উত্থানের ধারাবাহিকতা।
এর মাধ্যমে শেয়ারবাজারের চড়া ওঠানামার চক্র ভেঙে স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী ‘ধীরগতির উর্ধ্বমুখী বাজার’ গড়ে তোলার যে চেষ্টা বেইজিং করছিল তা-ও মুখ থুবড়ে পড়ল।
চীনের প্রধান সূচকটি জুন মাসের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ২০ শতাংশ নেমেছে।
বেইজিংভিত্তিক ফান্ড ম্যানেজার ডং বাওঝেন বলেছেন, “পরবর্তী সময়ে শেয়ারবাজারটি স্রেফ জুয়াড়ড়িদের পাগলাটে চাঙ্গা বাজারে রূপ নিয়েছিল। আর এখন আমরা সেই বুদ্বুদ বা ফোলাফাঁপা বেলুন ফেটে যেতে দেখছি।”
পশ্চিম বা এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় চীনের বাজারে অস্বাভাবিক উত্থান হয়েছিল বলেই এ পতনের গতি এতটা তীব্র।
এর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের এআই শেয়ারে প্রভাব একেবারেই সামান্য, যেখানে রেকর্ড উচ্চতা থেকে দেশটির নাসডাক সূচকে পতন ঘটেছে কেবল ৬ শতাংশের।
চীনে হঠাৎ করে এই শেয়ার বিক্রির ঢল নামার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ পাওয়া না গেলেও ট্রেডাররা বলছেন, মাত্রাতিরিক্ত দর, করের অতিরিক্ত বোঝা ও বিভিন্ন দেশের ডেটা সেন্টারে চীনা প্রযুক্তি সরঞ্জাম ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞাই এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের দেওয়া তথ্য অনুসারে, চীনা এআই কোম্পানিগুলোর শেয়ার মূল ভূখণ্ডের ‘এ-শেয়ার’ ও হংকংয়ের ‘এইচ-শেয়ার’ মিলিয়ে মোট বাজারদরের ৪২ শতাংশ এবং মোট লেনদেনের ৫৭ শতাংশ দখল করে ছিল।
এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীনির্ভর এই বাজারে এমন আকস্মিক ধসের ধাক্কা থেকে রক্ষা পাননি কেউই।
খুচরা বিনিয়োগকারীদের পছন্দের শেয়ারে ধস
হংকংয়ের বাজারে তালিকাভুক্তির সময় খুচরা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে মূল চাহিদার চেয়ে ৮ হাজার গুণ আবেদন পেয়েছিল চীনা রোবট নির্মাতা কোম্পানি ‘ইউনিট্রি’।
তবে অগাস্টে লেনদেন শুরুর পর থেকে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম অর্ধেকে নেমেছে। একইভাবে আরেক চিপ নির্মাতা কোম্পানি ‘সিএক্সএমটি’র শেয়ারের দাম গেল এক মাসেই হারিয়েছে ২৫ শতাংশের বেশি।
এ ছাড়া, গেল বছর বাজারে পা রাখার পরপরই যথাক্রমে ৭০০ শতাংশ ও ৪০০ শতাংশ লাভ করা চিপ নির্মাতা কোম্পানি ‘মেটাক্স ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটস’ ও ‘মুর থ্রেডস টেকনোলজি’র শেয়ারের দাম জুলাই থেকে প্রায় অর্ধেক কমেছে।
চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় হাইনানের এক ছোট ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী চেন ওয়েনশেং বলেছেন, ইউনিট্রি’র মতো রাষ্ট্রায়ত্ত তহবিল পুষ্ট কোম্পানিগুলোর পেছনে বেইজিংয়ের জোরালো সমর্থনের ওপর ভরসা রেখেই তিনি বাজারের এই চাঙ্গা ভাবে বিনিয়োগ করেছিলেন।
তবে এখন তিনি ও তার বন্ধুরা সবাই বড় অংকের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন।
বেইজিং সমর্থিত এ ব্যবসায়িক খাতে এমন শোচনীয় পতনে ক্ষুব্ধ হয়ে অনেকেই এখন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বা রক্ষণশীল সম্পদে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন।
এতে করে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ার ছেড়ে মূলধন সংগ্রহের গতি আরও শ্লথ করে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এদিকে, অপটিক্যাল যন্ত্রাংশ নির্মাতা ‘ঝংজি ইনোলাইট’ ও ‘ইওপ্টোলিংক টেকনোলজি’র শেয়ারের দর জুন ও জুলাইয়ের সর্বোচ্চ দাম থেকে প্রায় ৬০ শতাংশের মতো পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারগুলোতে এসব সাবেক জনপ্রিয় কোম্পানির পণ্য সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার দিকে ওয়াশিংটনের এগোনোর খবরই এ দরপতনের প্রধান কারণ।
স্টার৫০ সূচক এখনও গত এক বছরের আয়ের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ উচ্চতায় রয়েছে। যদিও একসময় তা প্রায় ২৫০ গুণে উঠেছিল। অন্যদিকে, নাসডাক ১০০ সূচকের ক্ষেত্রে এই অনুপাত ৩০ গুণ। এ তুলনা থেকে বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, শেয়ারবাজারের দরপতন আরও গভীর হতে পারে।
হংকংয়ের ‘লোটাস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’-এর ম্যানেজিং পার্টনার ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা হং হাওয়া বলেছেন, “এখন যা ঘটছে তা পুঁজিবাজারে নতুন করে তালিকাভুক্ত হতে চাওয়া অনেক কোম্পানির সামনে বড় বাধা তৈরি করবে।”
‘সব বুদ্বুদই শেষ পর্যন্ত ফেটে যায়’
পুঁজিবাজারে শেয়ারের অতিরিক্ত ওঠানামা ঠেকাতে ও এর সুফল নিশ্চিতে বেশ কিছুদিন ধরেই ঋণ নিয়ে শেয়ার কেনা ও হাই-ফ্রিকোয়েন্সি ট্রেডিংয়ের ওপর কঠোর নজরদারি চালাচ্ছিল চীনা কর্তৃপক্ষ।
তবে সেই চেষ্টার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র উঠে এল সাম্প্রতিক এই পাগলাটে উত্থান ও এর পরবর্তী ধসে। বাজারের অস্বাভাবিক বাড়বাড়ন্ত নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগকারীরাও এই উত্থানের সময় শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি চীনের শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘চায়না সিকিউরিটিজ রেগুলেটরি কমিশন’।
তবে, নিজেদের ওয়েবসাইটে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি বলেছে, পুঁজিবাজারের সার্বিক উন্নয়নে বাজারের অংশীদারদের কাছ থেকে পরামর্শ শুনতে এ মাসের শুরুতে বৈঠকে অংশ নিয়েছেন সিএসআরসি’র চেয়ারম্যান উ ছিং।
বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশের মতে, সাম্প্রতিক এই উন্মাদের মতো উত্থান বাজারের মৌলিক কাঠামোরই বড় ক্ষতি করেছে।
বেইজিংভিত্তিক ‘কিয়ানচুয়াং ক্যাপিটাল’-এর পার্টনার লিও ওয়াং বলেন, “প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোকে বাজারদরে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে পুঁজির স্বাভাবিক প্রবাহে বৈষম্য ও ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।”
“ফলে নির্দিষ্ট কিছু খাতে যেমন বুদ্বুদ তৈরি হয়েছে তেমনই অন্যান্য খাত থেকে পুঁজি পুরোপুরি হারিয়ে গেছে।”
এই পতনকে অনেকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখছেন। তাদের মতে, এটা মোটেই কোনো বিস্ময়কর ঘটনা নয় ও দীর্ঘমেয়াদী বাজার সংস্কারের জন্য ক্ষতিকরও নয়। সম্প্রতি এসব সংস্কারের মাধ্যমে ভালো রিটার্ন বা আয় আসতে শুরু করেছিল।
এইচএসবিসির তথ্য অনুসারে, গেল তিন মাস ধরে এশীয় তহবিলগুলো শেয়ার বিক্রি করলেও সার্বিকভাবে তারা চীনের বাজারের প্রতি এখনও বেশ ভরসা রাখছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের এ মাসের আপডেটেড সুপারিশের তালিকায় চীনের বেশ কিছু এআই শেয়ারের সঙ্গে ‘ইনোলাইট’ ও ‘সিএক্সএমটি’র নামও রয়েছে।
পাশাপাশি, ‘বিএনপি পারিবাস সিকিউরিটিজ’-এর কৌশলবিদ উইলিয়াম ব্র্যাটন বলেছেন, সতর্ক বিনিয়োগকারীদের জন্য এই বাজার এখনও নতুন ক্রয়ের সুযোগ করে দিচ্ছে।
এরপরও চীনের মূল ভূখণ্ডের অনেক বিনিয়োগকারী নতুন করে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্যান্য খাতের দিকে বা শেয়ারের দাম আরও নিচে নামার অপেক্ষা করছেন।
সাংহাইয়ের ‘ঝুওঝু ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট’-এর ফান্ড ম্যানেজার ও পার্টনার ওয়াং ঝুও বলেছেন, “চীনের অন্যান্য উৎপাদনকারীর মতোই শেষ পর্যন্ত এই চিপ নির্মাতা ও এআই সরবরাহকারীদেরও দামের প্রতিযোগিতায় জড়াতে হবে।
“এর কোনো ব্যতিক্রম নেই। সব বুদ্বুদই শেষ পর্যন্ত ফেটে যেতে বাধ্য।”
