এআই এজেন্টের বিভ্রান্তি সামলাতে নেপথ্যে মানুষই কাজ করছে
উন্নত মডেল দিয়ে চললেও এআই এজেন্ট ইন্টারনেটের নানা মাধ্যমে, বিশেষ করে ফোন কলের ক্ষেত্রে এখনও নির্ভুলভাবে কাজ করতে পারছে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি যতই এগোচ্ছে জটিল ওয়েবাসাইট ব্রাউজিং ও ফোন কলের মতো বাস্তবে সূক্ষ্ম বিচার-বুদ্ধির কাজে এআই এজেন্টের ত্রুটি কাটাতে নেপথ্যে এখনো ভরসা রাখতে হচ্ছে মানবকর্মীদের ওপর।
ব্যবহারকারীর হয়ে কেবল টিভি বা ইন্টারনেটের বিল কমানোর জন্য গ্রাহকসেবা প্রতিনিধির সঙ্গে দরদাম করার বিষয়টি উন্নত এআই এজেন্ট করলেও এ কাজের পেছনে ফোন কলটি আসলে কোনো সফটওয়্যার নয়, একজন মানুষই করছেন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
এর মূল কারণ মেটা বা ওপেনএআইয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির তৈরি আধুনিক সব ফাউন্ডেশন মডেল দিয়ে চললেও এআই এজেন্ট ইন্টারনেটের নানা মাধ্যমে, বিশেষ করে ফোন কলের ক্ষেত্রে এখনও নির্ভুলভাবে কাজ করতে পারছে না।
‘ইয়াহু’র সাবেক প্রধান নির্বাহী ও নতুন এআই এজেন্ট স্টার্টআপ ‘ড্যাজেল এআই’-এর শীর্ষকর্তা মারিসা মেয়ার বলেছেন, বর্তমান উন্নত এআই মডেলগুলো গ্রাহকদের জন্য ইন্টারনেটে বিভিন্ন সেবার সন্ধান দিতে পারদর্শী।
যেমন, বাড়ি সারানোর সেরা সেবাগুলো খুঁজে দিতে তারা দক্ষ হলেও একটি ছাদ সারানোর সুনির্দিষ্ট বুকিং ও সময় নির্ধারণের চূড়ান্ত ধাপে গিয়ে এরা ভুল করে বসতে পারে।
“গ্রাহককে সেরা পরামর্শ ও সম্ভাব্য সেবাদাতাদের সঠিক তালিকা দেওয়ার জন্য আমরা আধুনিক মডেলগুলোর ওপর নির্ভর করি।
“আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে গ্রাহককে সত্যি সত্যি আমরা সর্বোচ্চ মানের সেবা দিতে পারছি কি না, আর সেজন্যই পুরো বিষয়টি আবার যাচাই করে দেখা হয়।”
এই কার্যপদ্ধতির অংশ হিসেবেই ড্যাজেল কিছু বিশেষ কাজ মানব কর্মীদের হাতে তুলে দিয়েছে।
বর্তমানে মেটা ও ওপেনএআইয়ের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের হাত ধরে এআইওয়ালা এই ডিজিটাল সহযোগীদের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।
এসব কোম্পানির দাবি, ইন্টারনেটে জুতা খোঁজা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন বহু জটিল কাজ এক নিমেষে করে দিতে পারে তাদের এসব প্রযুক্তি।
মেটার ‘মিউজ’, ওপেনএআইয়ের ‘ডটস’সহ বেশ কয়েকটি এজেন্ট ওয়েব ব্রাউজিংয়ের জগতে অনেক কাজ করতে পারছে সত্যি, তবে, তা একেবারে প্রাথমিক পর্যায় ও বাস্তবে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন ডিজিটাল বাধার মুখেও পড়ছে।
ডিজিটাল এজেন্টভিত্তিক স্টার্টআপ ‘ডাকবিল’-এর প্রধান নির্বাহী মেগান জয়েস বলেছেন, এসব সীমাবদ্ধতা দেখা দেয় যখন একটি এআই এজেন্টকে কারো পক্ষ থেকে সরাসরি ফোন কল করা, চিকিৎসকের সিরিয়াল বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া বা স্থানীয় কোনো পরিচ্ছন্নতা সেবা কোম্পানি থেকে সোফা পরিষ্কারের বুকিং দেওয়ার মতো কাজ দেওয়া হয়।
বাস্তবজগতের সূক্ষ্ম বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে এমন সব কাজে এআইয়ের চেয়ে মানুষ এখনও অনেক এগিয়ে রয়েছে উল্লেখ করে জয়েস বলেছেন, গ্রাহক-পর্যায়ের ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নির্মাতা কোম্পানিগুলোকে বাধ্য হয়েই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত কাজ করার জন্য মানুষের সাহায্য নিতে হচ্ছে।
এ কারণেই ডাকবিল সম্প্রতি একটি ‘অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেইস’ বা এপিআই চালু করেছে, যার মাধ্যমে এআই এজেন্ট নির্মাতা কোম্পানিগুলো সরাসরি চুক্তিভিত্তিক মানবকর্মীদের সঙ্গে তাদের সিস্টেম যোগ করতে পারবে।
রাইড-শেয়ারিং কোম্পানি উবারের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেছেন, “আমরা অনেকটা উবারের মডেলেই কাজ করি, যেখানে জটিল কাজকে ছোট ছোট ও সুনির্দিষ্ট অংশে ভাগ করে নেওয়া হয়।”
যেসব কাজ করতে গিয়ে এআই এজেন্ট ভুল করতে বা আটকে যেতে পারে, ডাকবিলের এপিআই ব্যবহার করে এজেন্ট নির্মাতা কোম্পানিগুলো সেসব কাজকে হস্তান্তর করতে পারবে।
এরপর ডাকবিল সেসব জটিল কাজকে এমনভাবে ছোট ছোট ধাপে রূপান্তর করে, যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ খুব সহজেই ও ধারাবাহিকভাবে শেষ করতে পারেন।
জয়েস বলেছেন, “এরপর ঠিক কী ঘটছে ও কাজটি কীভাবে শেষ হচ্ছে, আমরা সেটির ওপর নজর রাখি।”
বিভ্রান্ত এজেন্ট
মেয়ার বলেছেন, এআই মডেলগুলোর মধ্যে এখনও কমন সেন্সের অভাব রয়েছে। তাদের এক প্রযুক্তিটির মাধ্যমে একই সঙ্গে ছাদ পরিবর্তন, ভাঙা জানালা সারানো ও টেবিলটপের জন্য একটি কাঁচ কেনার মতো কয়েকটি সংস্কার কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করছিলেন।
এআই এজেন্টটি জানালার কাঁচ ও টেবিলটপের কাঁচকে গুলিয়ে ফেলে। ফলে ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্টটি ‘টেবিলটপের কাঁচটি কীভাবে জানালার ফ্রমে ফিট করানো যায়, তারই কুলকিনারা খোঁজার চেষ্টা করছিল’।
এ বিভ্রান্তি খুব বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। কারণ ড্যাজেলের প্রযুক্তি সময়মতো বিষয়টি শনাক্ত করে কাজটি চূড়ান্ত করতে একজন মানুষের কাছে পাঠায়।
মেয়র বলেছেন, “কেবল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেই মানবকর্মী পুরো বিষয়টি সমাধান করে ফেলেন। অথচ একটি এআই এজেন্ট হলে অযৌক্তিক পরিমাণে টোকেন অপচয় করত বা হয়ত কখনই সঠিক সমাধানে পৌঁছাত না।”
পার্সোনাল এআই এজেন্ট সংক্রান্ত স্টার্টআপ ‘ওয়াজো এআই’-এর প্রধান নির্বাহী শিবানি পোদ্দারও ফোন কল ও ওয়েবসাইটগুলোতে বট আটকানোর ক্যাপচা পরীক্ষা পার হতে মানবকর্মীদের যোগ করছেন।
“আমার মনে হয়, কাজটি সঠিকভাবে করতে ‘এআই প্লাস মানুষ’ বা যৌথভাবে কাজ করে এমন এআই-ই এখন প্রয়োজন।
এআই এজেন্ট যদি সঠিকভাবে কাজ শেষ করতে না পারে তবে মানুষ একসময় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা বন্ধ করে দেবে।
চ্যাটবট ও এআই এজেন্টের সঙ্গে ব্যবহারকারীদের যোগাযোগ ব্যক্তিগত স্তরে হয়। ফলে কোনো কোম্পানি আগে থেকে না জানিয়ে নেপথ্যে মানুষের উপস্থিতি রাখলে, ব্যবহারকারীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার যৌক্তিক কারণ থেকেই যায়।
এর আগে, মেটার নিজস্ব ‘মিউজ’ এআই এজেন্টের হয়ে মানব কন্ট্রাক্টরদের মাধ্যমে ফোন কল করানোর অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা নিয়ে প্রাইভেসি সংক্রান্ত উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন মেটারই কর্মীরা।
ওই সময় বিবৃতিতে মেটার একজন মুখপাত্র বলেছিলেন, প্রযুক্তিটি তৈরির ক্ষেত্রে এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা তাদের ‘পণ্য উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মূল অংশ’। বর্তমানে মেটা ব্যবহারকারীদের মিউজ সম্পর্কিত কাজে কোনো মানুষের ব্যবহার করছে না।
ডাকবিলের প্রধান নির্বাহী জয়েস বলেছেন, তাদের স্টার্টআপটি যোগ থাকা ১০৯৯ চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ব্যাকগ্রাউন্ড বা প্রয়োজনীয় তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে।
উবার ও ডোরড্যাশের ড্রাইভারদের সঙ্গে তাদের তুলনা করে তিনি বলেছেন, “এরা যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা, যারা বাড়তি আয়ের সুযোগ খুঁজছেন।”
পাশাপাশি বিভিন্ন কোম্পানির কলসেন্টার সেবা দিয়ে থাকে এমন কন্ট্রাক্টরদের থেকেও কর্মী নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, মেয়ার বলেছেন, ড্যাজেলও কর্মীদের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করে একজন ব্যক্তিগত মানব সহকারীর কাছে যে ধরনের গুণাবলি আশা করা হয় এআইয়ের মধ্যেও সেগুলো খোঁজা হয়।
“আমরা এমন মানুষদের বেছে নিই যারা প্রাইভেসি ধরে রাখতে পারেন, যাদের রুচিবোধ ভালো ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তারা যেমন ব্যবহারকারীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করবেন তেমনই কাজ শেষে সেই ব্যক্তিগত তথ্যগুলো গুটিয়ে ফেলার সক্ষমতাও রাখবেন।
“আমি বুঝি এটা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তির বিষয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে আমার ব্যক্তিগত সহকারী রাখার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে আমি জানি তাদের কাছে আমার প্রত্যাশা কী ও কীভাবে এদের নির্দেশনা দিতে হয়।”
ফাউন্ডেশন মডেলগুলোর উন্নতি অব্যাহত থাকলেও বাজারটি এখন ‘রূপান্তর পর্বের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
মেয়রের ভাষ্য, এআই প্রযুক্তি যত দিন না মানুষের মতো সক্ষমতার সঙ্গে জটিল ওয়েব কাজ ও ফোন কল পরিচালনা করতে পারছে তত দিন এই পরিস্থিতি থাকবে।
“আমরা বিষয়টি লুকিয়ে রাখার কোনো চেষ্টা করছি না, বরং আমরা মনে করি এ প্রক্রিয়ায় মানুষের উপস্থিতি বড় ইতিবাচক দিক।”
