ঢালাও এআই ব্যবহার বাদ দিয়ে এই সিইও হাঁটছেন উল্টা পথে
সবার হাতে এআই প্রযুক্তি তুলে দিলেই যে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল মিলবে তা বিশ্বাস করেন না অ্যামাজন, ইবে ও স্টার্লিং ব্যাংকে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকা এই সিইও।
অর্থ পরিশোধ সংক্রান্ত লন্ডনভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানি পেসেন্ড-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের সুযোগ সহজে মেলে না, অর্জন করে নিতে হয়।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি’কে পেসেন্ডের প্রধান নির্বাহী বেন চিসেল বলেছেন, প্রযুক্তির এই তুঙ্গে থাকা এআইয়ের জোয়ার নিয়ে তিনি বেশ ‘সংশয়বাদী। তবে এর কার্যকারিতাকে তিনি পুরোপুরি অস্বীকারও করেন না।
অ্যামাজন, ইবে ও স্টার্লিং ব্যাংকে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকা চিসেল হিসাব করে দেখেছেন, তাদের বর্তমান প্রকৌশলী দলটিকেই এআই ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ায় কাজের পরিধি প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
তবে সবার হাতে এআই প্রযুক্তি তুলে দিলেই যে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল মিলবে তা বিশ্বাস করেন না তিনি, বরং প্রতিষ্ঠানের সেরা কর্মীদের হাতেই এআই টুলস তুলে দেন তিনি, তাও আবার এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা প্রমাণের পর।
ভুল মানুষের হাতে পড়লে এআই তাদের অলসতা ও ভুল সিদ্ধান্তের মতো বাজে অভ্যাসগুলোকে ‘আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে’ বলে মনে করেন চিসেল।
চলতি ঝোঁকের পিছে না ছুটে গ্রাহকদের সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দেওয়ার ওপর জোর দেন এই সিইও।
এআই ও প্রযুক্তির এই যুগে পদ্ধতিটিকে সাধারণ মনে হতে পারে স্বীকার করে চিসেল বলেছেন, “আমি জানি টোকেনম্যাক্সিং ও এআইয়ের দুনিয়ায় এভাবে চিন্তা করাটা খুব একটা আকর্ষণীয় শোনায় না, তবে আমি মনে করি এমন ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ।”
আইন খাত থেকে শুরু করে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও অর্থসংস্থান সব খাতেই এখন এআইয়ের গুরুত্ব প্রমাণের চাপ বাড়ছে। অনেক কোম্পানিই এখন যত বেশি সম্ভব কর্মীর হাতে এই প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক ‘লয়েডস ব্যাংকিং গ্রুপ’ কর্মীদের জন্য ৪০ হাজার মাইক্রোসফট ৩৬৫ কোপাইলট লাইসেন্স বিতরণ করেছে।
ব্যাংকটি বলেছে, যাদের এই লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে তাদের ৯৭ শতাংশই এটা নিয়মিত ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে, নিউক্যাসেলভিত্তিক সফটওয়্যার কোম্পানি ‘সেজ’ বলেছে, তাদের এআই কোডিং টুলস শত শত ঘণ্টার কাজ বাঁচিয়ে দিচ্ছে।
এ ছাড়া, লন্ডনের পেশাদার সেবাদাতা কোম্পানি ‘গ্রান্ট থর্নটন ইউকে’ তাদের ৬৬ কোটি ডলার এআই বিনিয়োগের অংশ হিসেবে সব কর্মীকে অ্যানথ্রপিকের এআই মডেল ক্লড ব্যবহারের উৎসাহ দিচ্ছে।
তবে এআই ব্যবহারে উৎপাদনশীলতার হার বাড়লেও ব্যবসার নিট মুনাফায় তা সবসময় প্রতিফলিত হচ্ছে না।
এ বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশ পাওয়া যুক্তরাজ্য সরকারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ব্যবহারকারী কোম্পানির মধ্যে ৭৫ শতাংশই কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ার কথা বলেছে।
তবে ৭৭ শতাংশ কোম্পানি বলেছে, এতে তাদের আয়ে কোনো বড় পরিবর্তন আসেনি।
চিসেলের মতো ব্রিটিশ এআই কোম্পানি ‘ইউনিই’র সিইও লোকদিপ সিংও এআই’কে কেবল উচ্চ পারফর্ম করা কর্মীদের জন্যই উপযোগী ‘সুপারপাওয়ার’ বা বিশেষ সক্ষমতা মনে করেন।
ঢালাওভাবে সবাইকে এআই ব্যবহার করতে দিয়ে খরচ কমানোর প্রবণতা নিয়ে সতর্ক বার্তা দিয়েছেন তিনি।
“আমি বিশ্বাস করি, দল ছোট করার বদলে কোম্পানির লক্ষ্য আরও বড় করার কাজে এআই ব্যবহার করা উচিত। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, সার্বিক অর্থনীতির কারণে অনেক শিল্পেই একে দেখা হচ্ছে এভাবে, ‘আচ্ছা, আমি কি খরচ কমাতে পারি? আমি কি কর্মী ছাঁটাই করতে পারি?’ মূল সত্যটা হয়ত এই দুইয়ের মাঝামাঝি কোথাও।”
এআইয়ের প্রকৃত মূল্যায়ন
পেসেন্ডে কোনো নতুন এআই সরঞ্জাম আসলেই কী কাজে আসছে তা প্রমাণ করে দেখাতে হয় কর্মীদের। নতুন যোগ দেওয়া কর্মীরা এআই টুল ব্যবহার ও পর্যবেক্ষণের জন্য এক মাস সময় পান।
এই সময়ে তারা কী ধরনের ফলাফল পেয়েছেন তা ব্যাখ্যা করতে হয় কোম্পানি প্রধানের কাছে। সম্প্রতি নিজের এই নীতি পরীক্ষা করে দেখেছেন চিসেল।
কোম্পানির নতুন সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন প্রধান জনপ্রিয় এআই মডেল ক্লড ব্যবহারের অনুরোধ জানালে তাকে এক মাসের সময় দেওয়া হয়।
মাস শেষে ওই কর্মী চিসেলকে বলেছেন, সাধারণ এআই টুলের আর প্রয়োজন নেই তার। কারণ, কেবল দ্রুত সংক্ষিপ্ত কনটেন্ট বিবরণী তৈরি ছাড়া এটা খুব একটা কার্যকর নয়।
এর পরিবর্তে, তিনি নির্দিষ্ট কাজের জন্য ডেডিকেটেড এক ‘কনটেন্ট-ব্রিফ এজেন্ট’ তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন, যা নিয়ে তিনি বর্তমানে কাজ করছেন।
অন্যদিকে, সফটওয়্যার কোম্পানি ‘কোরভিউ’-এর কৌশল কিছুটা ভিন্ন। লন্ডনভিত্তিক কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী সায়মন আজোপার্দি বলেছেন, শুরুতে তারা এআই ব্যবহারে বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন এবং তাদের প্রকৌশলীদের মধ্যে এটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
শুরুতেই প্রকৌশলীরা ডেটা ও তথ্যের বিশ্লেষণ, প্রযুক্তিগত নথিপত্র তৈরি এবং নতুন প্রকৌশলীদের দ্রুত কাজের উপযোগী করে তুলতে এআই ব্যবহার করেছেন।
আজোপার্দি বলেছেন, বর্তমানে তাদের ডেভেলপাররা ব্যাক-এন্ড ও ফ্রন্ট-এন্ড কোডিং, কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স ও ডকুমেন্টেশনের মতো বিভিন্ন কাজের জন্য একাধিক ‘এআই এজেন্ট’ পরিচালনা করছেন।
এর মাধ্যেমে অতীতে যে কাজ শেষ করতে সপ্তাহে লেগে যেত তা এখন কেবল কয়েক দিনেই সম্ভব হচ্ছে। তবে নিজের দক্ষতার বাইরের কাজ এআই দিয়ে করাতে গেলে তা সব সময় উৎপাদনশীল নাও হতে পারে বলে সতর্ক করেন আজোপার্দি।
“এমন অবস্থায় আপনার মনে হতে পারে কাজ দ্রুত হচ্ছে। তবে বাস্তবে আপনার কাজের দক্ষতা মোটেই বাড়ে না।”
যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস’ বা এনএইচএস-এর মতো বড় গ্রাহকের কাজ শুরুর সময় কোরভিউকে কেবল একজন অতিরিক্ত প্রকৌশলী নিয়োগ করতে হয়েছিল, যার মাধ্যমে কোম্পানিটি তাদের অন্যান্য প্রকল্পগুলোও নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে নিয়েছে।
বর্তমানে কর্মী ছাঁটাইয়ের বদলে নতুন কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে কোম্পানিটি ও বাড়তি এআই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আরও বেশি কাজের দায়িত্ব নিচ্ছে।
স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার যুগে কর্মসংস্থান
প্রযুক্তি যত মানুষের কাজের দায়িত্ব নিচ্ছে ততই প্রশ্ন উঠছে বর্তমান কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
চিসেল বলেছেন, এআইয়ের মাধ্যমে কাজ স্বয়ংক্রিয় করার পর কর্মীদের ছাঁটাই না করে তাদের নতুন দায়িত্বে রূপান্তর করতে সহায়তা করলেই বিভিন্ন কোম্পানি লাভবান হবে।
তিনি বলেছেন, গ্রাহকসেবা প্রতিনিধিরা বছরের পর বছর ধরে জটিল সমস্যার সমাধান করে আসছেন। তাদের এ অভিজ্ঞতা পুরো ব্যবসায়ের যে কোনো খাতেই মূল্যবান।
চিসেলের ভাষ্য, প্রযুক্তি কখনোই মানুষের দায়বদ্ধতা ও মালিকানার জায়গা দখল করতে পারে না।
“কাজের প্রক্রিয়ায় কোনো মানুষকে যোগ রাখার মানে এই নয় যে, তাকে কেবল ইমেইলে সিসি করে রাখা হল। এর মানে হচ্ছে কাজের চূড়ান্ত দায়িত্ব ও স্বত্বাধিকার মানুষের হাতেই থাকতে হবে।”
