কোডিংয়ের দৌড়ে ডিপসিকের নতুন ‘সুপার এজেন্ট’
এ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য একাধিক এআই এজেন্টের সমন্বয় করা ও সেগুলোর কাজের অগ্রগতি তদারকিতে মানুষের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা।
প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের সঙ্গে সফটওয়্যার কোডিং অ্যাসিস্ট্যান্ট তৈরির প্রতিযোগিতা জোরদার করার অংশ হিসেবে এবার এক নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কোম্পানি ডিপসিক।
কোম্পানিটি নতুন এক অটোনমাস এআই এজেন্টের পরিকল্পনা উন্মোচন করেছে, যা মানুষের কোনো রকম হস্তক্ষেপ ছাড়াই একসঙ্গে একাধিক কাজ সামলাতে পারবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে চীনা সংবাদমাধ্যম সাইথ চায়না মর্নিং পোস্ট।
শনিবার ডিপসিকের ‘ডিপসিক হারনেস’ দলের প্রকাশ করা এক প্রবন্ধে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত এ ব্যবস্থার নাম ‘সুপার এজেন্ট’।
এর মূল লক্ষ্য একাধিক এআই এজেন্টের সমন্বয় করা ও সেগুলোর কাজের অগ্রগতি তদারকিতে মানুষের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা।
তাদের দাবি, বর্তমান জটিল কর্মপ্রবাহ পরিচালনায় বড় এক প্রতিবন্ধকতা দূর করবে এই প্রযুক্তি।
ডিপসিক বলেছে, এআই মডেলগুলোর ধারাবাহিক অগ্রগতির ওপর ভর করেই এসব এজেন্টের উত্থান ঘটেছে, যা ক্যালেন্ডার সামলানো ও ইমেইল খসড়া করা থেকে শুরু করে কাজের প্রতিবেদন তৈরি ও কোড লেখার মতো নানা কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারদর্শী।
তবে একাধিক এজেন্টকে একসঙ্গে পরিচালনা করা এখনো মানুষের মনোযোগের ওপর বড় চাপের কারণ বলে উল্লেখ করেছে দলটির সদস্যরা।
গবেষণাপত্রে তারা লিখেছে, “একক কোনো কাজের সীমাবদ্ধতা নির্ভর করে এআই মডেলের নিজস্ব সক্ষমতার ওপর। তবে একসঙ্গে একাধিক কাজের যে সীমাবদ্ধতা তা মূলত নির্ভর করে মানুষের মনোযোগের পরিমাণের ওপর।”
ডিপসিক দলটির ধারণা, একজন মানুষ একসঙ্গে কেবল তিন থেকে পাঁচটি সক্রিয় এআই এজেন্ট সেশন পর্যবেক্ষণ বা তদারকি করতে পারেন।
একাধিক ভার্চুয়াল সহকারী নিয়োগ করেও কাজের সার্বিক উৎপাদনশীলতা খুব একটা বাড়ানো সম্ভব নয়।
ডিপসিকের প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থাটি বিভিন্ন এজেন্টের মধ্যে কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বণ্টন ও সমন্বয় করার মাধ্যমে এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ফলে মানুষের কাজ থাকবে কেবল সিদ্ধান্ত নেওয়া ও চূড়ান্ত ফলাফলের পর্যালোচনা করা।
বর্তমানে জটিল সফটওয়্যার তৈরির কাজ পরিচালনা করতে পারে অ্যানথ্রপিকের এমন ‘ক্লড কোড’ ও ওপেনএআইয়ের ‘কোডেক্স’-এর মতো আধুনিক বিভিন্ন কোডিং অ্যাসিস্ট্যান্টেরর বাজার ক্রমেই দখল করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে বৈশ্বিক এআই ডেভেলপাররা।
এমন সময়ে নতুন উদ্যোগ আনল ডিপসিক।
প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা নির্দেশের অপেক্ষা না করেই যাতে একাধিক এআই এজেন্ট একই সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে পারে এবং বার্তা ও নতুন কোড আপডেটের মতো বিষয়ে নিজে থেকেই সাড়া দিতে পারে।
সেই লক্ষ্যেই তাদের এজেন্ট অটোমেশনকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে ডিপসিক। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার অধীনে কেন্দ্রীয় এক সমন্বয়কারী এআই এজেন্ট বিভিন্ন স্বতন্ত্র এজেন্টের মধ্যে কাজগুলো বণ্টন করে দেবে।
এসব এজেন্ট স্বাধীনভাবে ও একই সময়ে এদের বরাদ্দকৃত কাজ সম্পাদন করতে পারবে এবং কাজের অগ্রগতি সরাসরি কেন্দ্রীয় এজেন্টের কাছে রিপোর্ট করবে। ফলে মানুষ বা ব্যবহারকারীর সরাসরি তদারকির প্রয়োজন কমে আসবে।
ডিপসিক বলেছে, কোনো গ্রুপ চ্যাটে সফটওয়্যারের কোনো ত্রুটি বা বাগ সংক্রান্ত রিপোর্ট এলে তা এআই এজেন্ট নিজে থেকেই শনাক্ত করবে। এরপর বাইরে থেকে কোনো প্রত্যক্ষ নির্দেশনা না পেলেও এজেন্টটি নিজ উদ্যোগে ত্রুটিটি তৈরি করে তা সমাধানের চেষ্টা করবে।
গবেষণা পত্রে দলটি বলেছে, যদি এআই এজেন্টটি কার্যকর কোনো সমাধান খুঁজে পায় তবে তা চূড়ান্ত পর্যালোচনার জন্য মানুষের কাছে প্রস্তাবিত কোড হিসেবে পেশ করবে। কোনো সমাধান না মিললে অপ্রয়োজনীয় বাধা এড়াতে এটা নীরব থাকবে।
পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণে ডিপসিকের গবেষকরা দেখেছেন, নতুন পদ্ধতির সাহায্যে নির্ধারিত কাজ শেষ করতে ১৬ মিনিটেরও কম সময় লেগেছে, সেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে একই কাজ করতে সময় লেগেছিল ২৯ মিনিটের বেশি।
শিল্প খাতের কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, ডিপসিক সঠিক দিশাতেই এগোচ্ছে। তবে বর্তমানে থাকা বিভিন্ন ব্যবস্থার তুলনায় এ প্রস্তাবিত রূপরেখা আসলেই কোনো অগ্রগতি আনছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
চীনের প্রশ্নোত্তরের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ‘ঝিহু’তে বেইজিংভিত্তিক এআই উদ্যোক্তা লিউ মিং লিখেছেন, “বর্তমানে এআই সফটওয়্যার উন্নয়নের মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এর নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা... দ্রুত কাজ শেষ করা এখানে প্রধান বিষয় নয়।”
খোদ ডিপসিকও এর পেছনে নিরাপত্তা ও প্রাইভেসি সংক্রান্ত কিছু সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বলেছে, বিশেষ করে ক্ষতিকর কোনো নির্দেশনা বা ভাইরাসের কারণে অন্যান্য সেবা ও সিস্টেমের সঙ্গে যোগ এআই এজেন্টগুলো যেন নিয়ন্ত্রিত না হয়ে পড়ে সেই আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছে।
কোড হোস্টিং প্ল্যাটফর্ম ‘গিটহাব’-এ 'সুপার এজেন্ট'-এর ওপেন-সোর্স গবেষণা প্রোটোটাইপ প্রকাশ করেছে ডিপসিক।
কোম্পানিটি বলেছে, উদ্যোগটি এখনও কাঠামোগত প্রাথমিক পরীক্ষা মাত্র। এটাকে এখনও কোনো পূর্ণাঙ্গ পণ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
