ইউক্রেইনকে সাইবার প্রতিরক্ষা টুল দিচ্ছে ওপেনএআই
ওপেনএআইয়ের এ সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি যে কোনো ডিজিটাল সিস্টেমের ভেতর থাকা ত্রুটি দ্রুত চিহ্নিত করতে ও সেগুলোর কার্যকর সমাধান তৈরিতে বিশেষভাবে সক্ষম।
হাসপাতাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো সংবেদনশীল বেসামরিক অবকাঠামোকে যে কোনো ধরনের সাইবার হামলা থেকে রক্ষা করতে ইউক্রেইন সরকারকে নিজেদের তৈরি উন্নত সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিনামূল্যে দেবে ওপেনএআই।
ইউক্রেইনের জাতীয় ‘সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম’ বা সার্ট-ইউএ- এর দেওয়া তথ্য অনুসারে, পূর্ব ইউরোপের দেশটিতে কেবল ২০২৫ সালেই প্রায় ৬ হাজার সাইবার হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
বিবিসি লিখেছে, ওপেনএআইয়ের ‘ডেসব্রেক’ নামের সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি যে কোনো ডিজিটাল সিস্টেমের ভেতর থাকা বিভিন্ন ত্রুটি দ্রুততার সঙ্গে চিহ্নিত করতে ও সেগুলোর কার্যকর সমাধান তৈরিতে বিশেষভাবে সক্ষম।
চুক্তির শর্ত অনুসারে, ইউক্রেইন সরকার ওপেনএআইয়ের আধুনিক ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ‘জিপিটি ৫.৬ সল’-এর অ্যাক্সেস পাবে।
মডেলটি অ্যানথ্রপিকের ‘মিথোস’ ও ‘ফেইবল’-এর মতো শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন এআই মডেলের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।
এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের সাবেক চ্যান্সেলর ও বর্তমানে ওপেনএআইয়ের ‘হেড অফ কান্ট্রিজ’ জর্জ অবসবর্ন বলেছেন, “বেসামরিক অবকাঠামো রক্ষার মানে শারীরিক ও ডিজিটাল উভয় ধরনের আক্রমণ থেকেই সেগুলোকে সুরক্ষিত রাখা, যাতে মানুষ স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন, কাজ করতে ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবাগুলো পেতে পারেন।”
ওপেনএআইয়ের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি ‘সফোস’-এর থ্রেট ইন্টেলিজেন্সের সিনিয়র ডিরেক্টর রাফে পিলিং বলেছেন, ২০১৪ সাল থেকে ইউক্রেইনের বিরুদ্ধে ক্রেমলিনের চালানো আগ্রাসনের ‘মূল উপাদান’ ছিল রাশিয়ার আক্রমণাত্মক সাইবার অভিযান।
“ইউক্রেইনের সাইবার প্রতিরক্ষা কার্যক্রম এমনিতেই বেশ দক্ষ ও সক্ষম। তবে তারা বর্তমানে প্রচণ্ড চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে এমন যে কোনো পদক্ষেপই চমৎকার অগ্রগতি ও কার্যকরী শক্তি বা ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।”
এদিকে, ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট’-এর সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক সিনিয়র রিসার্চ ফেলো জেমি ম্যাককল বলেছেন, পশ্চিমা বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরেই ইউক্রেইনকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে আসছে।
এর পেছনে যেমন পরোপকারী বা মানবিক উদ্দেশ্য রয়েছে তেমনই বাস্তব সংঘাতের ময়দান থেকে মূল্যবান ডেটা ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করার সুযোগ পাওয়ার বিষয়টিও এর অন্যতম বড় কারণ বলে উল্লেখ করেছেন ম্যাককল।
“এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে ওপেনএআই এখন সাইবার সুরক্ষার প্রতিরক্ষামূলক বিভিন্ন সেবাও দিচ্ছে– এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।”
তার ভাষ্য, রাশিয়ার লাগাতার সাইবার হামলার যে পরিমাণ ইউক্রেইনকে ঠেকাতে হচ্ছে, তা বিবেচনায় নিলে ‘ডেসব্রেক’ ব্যবহারের সুযোগটি দেশটির জন্য কার্যকর প্রমাণিত হবে।
তিনি বলেছেন, ইউক্রেইনের কাছে এরইমধ্যে ওপেনএআইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি যেমন গুগলের বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে।
সম্মুখভাগে আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা
এআই পরিভাষায় ‘ফ্রন্টিয়ার’ নামে পরিচিত আধুনিক ও সবচেয়ে শক্তিশালী বিভিন্ন মডেলের সাইবার সক্ষমতা সাইবার-প্রতিরক্ষাকারীদের জন্য যেমন আশীর্বাদ হতে পারে তেমনই একই সক্ষমতা আক্রমণকারীদের কাজেও ব্যবহার করা সম্ভব।
যেমন, সিস্টেমের বিভিন্ন ত্রুটি খুঁজে বের করা ডিফেন্ডারদের জন্য হ্যাকারদের ব্লক করার ক্ষেত্রে সহায়ক হলেও কোনো কোম্পানিতে অনধিকার প্রবেশের উপায় খুঁজতে থাকা আক্রমণকারীদের জন্যও তা সমানভাবে কার্যকর।
অ্যানথ্রপিক তাদের সিস্টেমের অপব্যবহার ঠেকাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার কথা জানিয়ে বলেছে, এগুলো ভুল মানুষের হাতে পড়ার মতো অতিরিক্ত শক্তিশালী। তবে এর বিপরীতে ওপেনএআই ইউরোপের কিছু নির্দিষ্ট কোম্পানি ও যুক্তরাজ্যের ব্যাংকগুলোকে তাদের আধুনিক সাইবার মডেলগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।
নিউ ইয়র্কে বর্তমানে চলমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালেই ঘোষণাটি দিয়েছে ওপেনএআই।
এই উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনে এআই বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ও ওপেনএআই প্রধান স্যাম অল্টম্যান ও অ্যানথ্রপিকের দারিও আমোদেইয়ের মতো শীর্ষ মার্কিন প্রযুক্তি প্রধানদের সেখানে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
সম্মেলনের শেষ ভাষণে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এর নাম পরিবর্তন করে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ করা উচিত।
রাশিয়া-ইউক্রেইন সংঘাতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমশ বাড়ার পেছনেও জোরালো প্রমাণ রয়েছে।
এ মাসের শুরুতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অ্যানথ্রপিক দাবি করেছে, ইউক্রেইনে হামলার জন্য তৈরি ‘কামিকাজে’ ড্রোন ঝাঁকের সফটওয়্যার তৈরিতে একদল রুশ ডেভেলপার তাদের ‘ক্লড’ প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করেছে।
কোম্পানিটি বলেছে, প্রযুক্তি সংস্থার বসানো ভৌগোলিক বা জিও-ব্লক এড়িয়ে চলার জন্য ওই দলটি ‘ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক’ বা ভিপিএন ব্যবহার করেছিল।
পাশাপাশি ইউক্রেইনের সরকার, সামরিক বাহিনী ও কূটনৈতিক সেগুলোতে অনুপ্রবেশের প্রচেষ্টাতেও এআই ব্যবহৃত হয়েছে বলে দাবি করেছে অ্যানথ্রপিক।
