১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে দুর্নীতি ও নোট বাণিজ্য বরদাশত হবে না: কাজল

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা প্রথমত জনস্বার্থের আইনজীবী।”

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 18 Sep 2026, 05:18 PM

Updated : 18 Sep 2026, 07:13 PM

অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে নোট বাণিজ্য, দুর্নীতি ও অনৈতিক সিন্ডিকেটের কোনো জায়গা থাকবে না বলে হুঁশিয়ার করেছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

তিনি বলেছেন, “যতদিন আমি এই কার্যালয়ে আছি, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে কোনো ধরনের দুর্নীতির জায়গা থাকবে না।”

আইন কর্মকর্তাদের পেশাগত নৈতিকতা, স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতা জোরদারে দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধন করে তিনি এসব কথা বলেন।

শুক্রবার সকালে ঢাকার একটি হোটেলে ‘অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের আইন কর্মকর্তাদের প্রসিকিউটরিয়াল নৈতিকতার নীতি ও অনুশীলন জোরদারকরণ’ শীর্ষক এ কর্মশালা শুরু হয়।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর ইউএনওডিসির দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের আয়োজনে এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের সহায়তায় দুই দিনের এ কর্মশালা হচ্ছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের ১৬০ জন আইন কর্মকর্তা কর্মশালায় অংশ নিচ্ছেন। প্রশিক্ষক ও বিশেষজ্ঞ প্যানেলে রয়েছেন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন, থাইল্যান্ডের প্রসিকিউটর ওয়ারানথর্ন ওয়ানিচথাওয়ার্ন এবং মালদ্বীপের প্রসিকিউটর মারিয়াম সিমহা মুস্তফা রাশিদ।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের ভেতরে কোনো অসাধু গোষ্ঠী, দুর্নীতি চক্র বা অনৈতিক সিন্ডিকেটকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া হবে না। আদালতের কার্যক্রম নস্যাৎ করা, কারসাজি করা কিংবা দুর্নীতির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় মামলা পরিচালনাকে প্রভাবিত করার কোনো চেষ্টা বরদাশত করা হবে না।”

প্রয়োজনে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গত ১৬ এপ্রিল কার্যালয়ের এক অফিস সহায়ক সরকারি নিয়োগ-সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ রিট মামলার ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখেন। তাতে সংশ্লিষ্ট ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতে রাষ্ট্রের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

পরে ওই কর্মচারীকে শাহবাগ থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়।

কয়েকজন আইন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের ভিত্তিতেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও অ্যাটর্নি জেনারেল জানান।

অতীতের ‘নোট বাণিজ্য ও সেকশনে দুর্নীতির’ অভিযোগ প্রসঙ্গে কাজল দাবি করেন, ৩১ জুলাই নতুন আইন কর্মকর্তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর কার্যালয় এসব অভিযোগ থেকে অনেকাংশে মুক্ত হয়েছে।

‘রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা প্রথমত জনস্বার্থের আইনজীবী’

রাষ্ট্রীয় আইন কর্মকর্তাদের ভূমিকা তুলে ধরে কাজল বলেন, “রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা প্রথমত জনস্বার্থের আইনজীবী।”

সরকারের পক্ষে যে কোনো মূল্যে মামলা জেতা বা সাজা নিশ্চিত করা তাদের কাজ নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, সংবিধান, আদালত ও বৃহত্তর জনস্বার্থের প্রতি তাদের সর্বোচ্চ আনুগত্য থাকতে হবে।

প্রতিটি রিট মামলা, জামিন আবেদন ও পিটিশনের পেছনে যে মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদা জড়িত, সে কথা তুলে ধরে তিনি অপ্রয়োজনীয় হয়রানি বন্ধ করা, প্রক্রিয়াগত বিলম্ব এড়ানো এবং কার্যালয়কে নাগরিকবান্ধব রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।

সম্প্রতি তার দপ্তরে আসা এক ব্যক্তির একটি ফৌজদারি মামলার প্রসঙ্গ তুলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ওই ব্যক্তি আসামির জামিন স্থগিত করতে আপিল বিভাগে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। ফাইল পর্যালোচনা করে মামলাটি ভিত্তিহীন মনে হওয়ায় তিনি সংশ্লিষ্ট আইন কর্মকর্তাকে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তাকে জানাতে হবে যে, বাদী মিথ্যা মামলা করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এরপর ওই ব্যক্তি আবার তার কক্ষে ফিরে এসে বলেন, আপিল বিভাগে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, তিনি আপস করবেন।

অ্যাটর্নি জেনারলে বলেন, “এ ধরনের অনুরোধ আমরা কখনো কখনো পাই। কিন্তু সবাই যা চান, তা করা আমাদের কাজ নয়। আমাদের দায়িত্ব ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।”

নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার উদাহরণ দিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিচারিক আদালতে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হলেও উচ্চ আদালতে আপিল শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্ব শুধু সাজা নিশ্চিত করা ছিল না; নিরপরাধ নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

ওই মামলায় হাই কোর্ট ১৬ আসামির মধ্যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে, চারজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে এবং ১০ জনকে খালাস দিয়েছে।

কাজল বলেন, “দেশের প্রতিটি নাগরিকই আমাদের মক্কেল। শুধু রাষ্ট্রের পক্ষে সাজা নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব নয়; নিরপরাধ নাগরিকদেরও আমরা রক্ষা করছি।”

প্রসিকিউটরদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার ওপর গুরুত্ব ইউএনওডিসির

অনুষ্ঠানে ইউএনওডিসির দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক প্রতিনিধি ক্রিস্টিয়ান হোলগে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় প্রসিকিউটরদের স্বতন্ত্র ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বিচারককে নিরপেক্ষ থাকতে হয় এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীকে তার মক্কেলের পক্ষে অবস্থান নিতে হয়। অন্যদিকে, প্রসিকিউটরকে একই সঙ্গে শক্তিশালী ও সংযত হতে হয়।

জাতিসংঘের প্রসিকিউটরদের ভূমিকা-সংক্রান্ত নীতিমালার কথা তুলে ধরে হোলজ বলেন, প্রসিকিউটরদের ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে উচ্চ মানের সততা বজায় রাখতে হবে এবং আইন ও আইনি ব্যবস্থার পরিবর্তন সম্পর্কে নিজেদের হালনাগাদ রাখতে হবে।

জনমত, গণমাধ্যম বা রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে জনস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “জনপ্রিয় কাজটি করা সহজ, সঠিক কাজটি করাই আপনাদের দায়িত্ব।”

জাতিসংঘের নির্দেশিকার বিভিন্ন অনুচ্ছেদ তুলে ধরে হোলজ বলেন, নিরপেক্ষ তদন্তে অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে মামলা শুরু বা চালিয়ে যাওয়া যাবে না। আসামির পক্ষে যায় এমন প্রমাণও বিবেচনায় নিতে হবে এবং বেআইনিভাবে সংগৃহীত প্রমাণ ব্যবহার করা যাবে না।

ন্যায়বিচার শেষ পর্যন্ত মানুষকে নিয়ে’: ইউএনডিপি প্রতিনিধি

ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিগেস বিচারব্যবস্থায় মানুষের মর্যাদা ও সমান আচরণের ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, “ন্যায়বিচার শুধু আইন, আদালত, প্রক্রিয়া বা সাজা নিয়ে নয়। ন্যায়বিচার শেষ পর্যন্ত মানুষকে নিয়ে।”

আইনের সামনে ধনী-দরিদ্র, লিঙ্গ, পরিচয় বা অবস্থান নির্বিশেষে প্রত্যেকের যে র্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে আচরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে, সে কথা মনে করিয়ে দেন ইউএনডিপি প্রতিনিধি।

তিনি বলেন, “সততা কোনো খণ্ডকালীন বিষয় নয়। প্রতিটি দিন, প্রতিটি সিদ্ধান্তে এর প্রতিফলন থাকতে হবে।”

বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জবাবদিহি ও আইনের শাসন নিয়ে মানুষের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে রড্রিকস বলেন, বিচার প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা এই একটি সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে পুনর্গঠন করা সম্ভব।

ইউএনডিপি এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের বিচার খাতে কাজ করছে জানিয়ে তিনি আদালতের কার্যক্রম ডিজিটাল করা, মামলাজট কমানো ও বিশেষায়িত আদালত প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সঙ্গে ইউএনডিপির সমঝোতা স্মারকের আওতায় প্রশিক্ষণ, আইন বিষয়ে ইন্টার্নশিপ এবং কার্যালয়ের সক্ষমতা ও পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর কাজ রয়েছে বলেও তিনি জানান।

উদ্বোধনী বক্তব্যে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক বলেন, “আজকের এ কর্মশালার মাধ্যমে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় সর্বোচ্চ নৈতিক মান বজায় রাখবে এবং বিচার বিভাগের মর্যাদা সমুন্নত রাখার একটি পথচলা শুরু হবে।”

দুই দিনের কর্মশালায় প্রসিকিউটরদের নৈতিকতা, গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা, সাক্ষ্য-প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সুরক্ষা এবং পুলিশ-প্রসিকিউশন সমন্বয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল তার বক্তব্যে প্রশিক্ষণটিকে গতানুগতিক কর্মসূচি হিসেবে না দেখে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে নেওয়ার আহ্বান জানান।

নৈতিকতার চেকলিস্ট, বাস্তব পরিস্থিতির বিশ্লেষণ ও আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আইনগত কাজে প্রয়োগের কথাও বলেন তিনি।