চীনা নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছালে বাংলাদেশে থাকা দেশটির নাগরিকরা তাদের স্বাগত জানান।
Published : 18 Sep 2026, 03:44 PM
বঙ্গোপসাগরে চীনা যুদ্ধজাহাজের নোঙর ফেলা নতুন বিশ্ববাস্তবতার স্পষ্ট সংকেত। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই উত্তাল সময়ে কোনো পরাশক্তির রণতরীর আগমন কেবল ‘বন্ধুত্বের বার্তা' বহন করে না। এই সফরের মধ্য দিয়ে যেমন চীন তার আঞ্চলিক উপস্থিতির জানান দিচ্ছে, তেমনি বাংলাদেশের সামনে দাঁড়িয়েছে নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থ পুনর্মূল্যায়নের কঠিন পরীক্ষা।
চট্টগ্রাম বন্দরে পাঁচ দিনের শুভেচ্ছা সফরে এসেছে চীনা নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজ—‘থাং শান’, ‘দা ছিং’ ও ‘থাই হু’। ১৭ সেপ্টেম্বর জাহাজ তিনটি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে তাদের স্বাগত জানানো হয়। এর আগে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশের সময় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ ‘বানৌজা ওমর ফারুক’ তাদের অভ্যর্থনা জানায়। সফরকালে দুই দেশের নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে সৌজন্য সাক্ষাৎ, পেশাগত অভিজ্ঞতা বিনিময়, পারস্পরিক জাহাজ ও স্থাপনা পরিদর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময়ের কথা রয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর জাহাজ তিনটির বাংলাদেশ ত্যাগ করার কথা।
সাধারণ চোখে এটি একটি নিয়মিত শুভেচ্ছা সফর। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় কোনো দেশের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের সফরকে শুধু সৌজন্যের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর তাৎপর্যটি হয়তো আমাদের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। তবে এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া এবং সন্দেহ সৃষ্টি করারও কোনো কারণ নেই। প্রয়োজন হলো ঘটনাটিকে বাস্তবতার আলোকে দেখা এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের জায়গা থেকে এর তাৎপর্য অনুধাবনের চেষ্টা করা।
কারণ পৃথিবী বদলাচ্ছে। দীর্ঘদিনের এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার জায়গায় ধীরে ধীরে বহু শক্তিকেন্দ্রের উত্থান ঘটছে। অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত শক্তিরও পুনর্বিন্যাস হচ্ছে। চীন তার অর্থনৈতিক শক্তিকে বৈশ্বিক প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত করেছে। ভারত ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজের কৌশলগত ভূমিকা বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া-প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার উপস্থিতি ও স্বার্থকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে। জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোরও এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আগ্রহ বাড়ছে। ফলে বঙ্গোপসাগর আর শুধু বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা, মৎস্যসম্পদ ও নৌবাণিজ্যের বিষয় নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর ভূরাজনীতির প্রশ্নও যুক্ত হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় চীনা নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজের চট্টগ্রাম সফর নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। কোনো একটি দেশের নৌবাহিনীর জাহাজ যখন অন্য দেশের বন্দরে আসে, তখন তার প্রকাশ্য উদ্দেশ্য বন্ধুত্ব ও পেশাগত যোগাযোগ হতে পারে; একই সঙ্গে এর মধ্যে কৌশলগত যোগাযোগেরও একটি মাত্রা থাকে। কিন্তু সেই বার্তার অর্থ নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দেশের। বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, চীন কী বার্তা দিচ্ছে শুধু তা নয়; বাংলাদেশ নিজের অবস্থান থেকে এই পরিবর্তিত বিশ্বকে কীভাবে দেখছে এবং নিজের স্বার্থকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নতুন নয়। বাণিজ্য, অবকাঠামো, শিল্প, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহেও চীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নৌবাহিনীর পেশাগত যোগাযোগ, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্কের ধারাবাহিকতা রয়েছে। ২০২৪ সালেও চীনা নৌবাহিনীর জাহাজ শুভেচ্ছা সফরে বাংলাদেশে এসেছিল। ফলে এবারের সফরকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—আমরা কি চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার মতো দেশগুলোকে শুধু তাদের চোখ দিয়ে দেখব, নাকি পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে বাংলাদেশের চোখ দিয়ে দেখব?
আমার মনে হয়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্রীয় কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই। বড় রাষ্ট্রগুলোর প্রত্যেকটির নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ আছে। তারা বন্ধুত্ব করে, সহযোগিতা করে, অংশীদারত্ব গড়ে—কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সিদ্ধান্ত পরিচালিত হয় নিজেদের স্বার্থের ভিত্তিতে। বাংলাদেশকেও একইভাবে নিজের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশের ভূগোল এই বাস্তবতাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ভারত আমাদের নিকটতম বৃহৎ প্রতিবেশী। অভিন্ন নদী, সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য অনিবার্য। চীন আমাদের প্রতিবেশী নয়, কিন্তু অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার সঙ্গেও রয়েছে জ্বালানি ও অন্যান্য সহযোগিতার সম্পর্ক। অতএব বাংলাদেশের জন্য কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি মানে সবাইকে খুশি রাখা নয়। ভারসাম্য মানে নিজের জাতীয় স্বার্থের জায়গাটি স্পষ্ট রাখা।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই নীতিই প্রযোজ্য। চীনের বিপুল প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সক্ষমতা বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো যেতে পারে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী পুনরুদ্ধার, কৃষি, অবকাঠামো, যোগাযোগ ও শিল্পায়নের মতো ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু সহযোগিতা আর নির্ভরশীলতা এক বিষয় নয়। অংশীদারত্ব আর আনুগত্যও এক বিষয় নয়।
এই জায়গাতেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রশ্নটি সামনে আসে। তিস্তা শুধু একটি নদীর প্রশ্ন নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন, কৃষি, জীবিকা, পরিবেশ ও অর্থনীতির প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা মহাপরিকল্পনার দাবি নিয়ে উত্তরাঞ্চলের মানুষ আন্দোলন করে আসছে। চীনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো—এই সহযোগিতাকে আমরা কীভাবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগাব।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অর্থ চীনের কাছে বাংলাদেশের কোনো কৌশলগত দায় সৃষ্টি করা নয়। এর অর্থ হলো, যে দেশের কাছে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা আছে, তার সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব নদী, কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন রক্ষা করা। এখানে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু হবে বাংলাদেশ। অর্থায়ন, প্রযুক্তি, বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা থাকবে। আর তিস্তা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ভারতের সঙ্গে পানি-বণ্টন ও আন্তঃসীমান্ত নদীর প্রশ্নকে আলাদা করে দেখতে হবে।
বিশ্ব এখন এক মেরু থেকে বহু মেরুর দিকে এগোচ্ছে। এই পরিবর্তনের সুযোগ বাংলাদেশের জন্যও আছে। কিন্তু সুযোগ তখনই কাজে লাগবে, যখন বাংলাদেশ অন্যের ভূরাজনীতির অনুসারী না হয়ে নিজের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে নিজের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করতে পারবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বও এখানেই। এই বন্দর শুধু বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির প্রধান প্রবেশদ্বার নয়; বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতের অর্থনীতি, নৌবাণিজ্য, জ্বালানি, মৎস্যসম্পদ, সামুদ্রিক সম্পদ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বাংলাদেশের জন্য তাই বঙ্গোপসাগরকে কোনো বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে নয়, সবার শান্তি, সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য ভূরাজনীতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—বড় শক্তির দ্বন্দ্বে পক্ষ হয়ে যাওয়া নয়, নিজের স্বার্থের জায়গা তৈরি করা। কারণ বৃহৎ শক্তিগুলো যখন প্রতিযোগিতায় নামে, তখন তার অভিঘাত প্রথমে পড়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর। আবার সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হলে তার সুফলও তারা পেতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতির এই জায়গায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি মৌলিক জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। সরকার পরিবর্তন হলে পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক জাতীয় স্বার্থ যেন পরিবর্তিত না হয়। বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতি যেন বিভক্ত না হয়। কে চীনের পক্ষে, কে ভারতের পক্ষে, কে আমেরিকার পক্ষে—এই প্রশ্নের বদলে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত বাংলাদেশ কোথায় এবং বাংলাদেশের স্বার্থ কোথায়।
আমাদের অবস্থান হতে পারে—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়; কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস নয়। চট্টগ্রাম বন্দরে চীনের তিনটি নৌবাহিনীর জাহাজ কয়েক দিনের জন্য এসেছে। তারা ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের জলসীমা ত্যাগ করবে। জাহাজগুলো চলে যাবে, কিন্তু যে প্রশ্নটি থেকে যাবে তা দীর্ঘমেয়াদি—পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশ কি অন্যের ভূরাজনীতির অংশ হবে, নাকি নিজের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে নিজের উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করবে?
নজরুল ইসলাম হক্কানী শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও সভাপতি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ। ই-মেইল: nazrul.hakkani@gmail.com