Published : 25 Jul 2026, 02:14 PM
দিল্লিতে শিক্ষাখাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে তরুণদের ওপর কাঁদুনে গ্যাস ছোড়া, লাঠিপেটা আর দমন-পীড়নের দৃশ্য সারা ভারতের তরুণ সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তাই শহরে শহরে জবাবদিহিতা, সংলাপ ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবি উঠছে। তরুণরা যে তিন দফা দাবি পেশ করেছে, তার প্রতিটিই যৌক্তিক।
এক যুগ আগেও ভারতের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দেশের সম্ভাব্য ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (জনমিতিক লভ্যাংশ) হিসেবে ভাবা হতো। নির্মম দিকটা হলো, যে সুযোগ দেশের বড় শক্তি হওয়ার কথা ছিল, সেটি আজ হাতছাড়া হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাবে, ২০২৫ সালে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল ১৭ দশমিক ২ শতাংশ, ২০২৪ সালে যা ছিল ১৫ শতাংশ। একই বছরে উচ্চশিক্ষিত নারীদের বেকারত্বের হার ২১ শতাংশেরও বেশি। এত বড় সম্ভাবনা কীভাবে ধীরে ধীরে বোঝায় পরিণত হলো, তার বিশ্লেষণ হয়তো অর্থনীতিবিদরা করবেন। কিন্তু দায় এড়াতে পারে না কোনো রাজ্য সরকার, পারে না কেন্দ্রীয় প্রশাসনও। টানা তিন মেয়াদ ধরে ক্ষমতায় থাকা মোদী সরকারের দায় সবচেয়ে বেশি।
ভারতের মতো এত বড় দেশ আর এত মানুষের জন্য একটি জাতীয় ভর্তি পরীক্ষা আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত—সেই প্রশ্নই সামনে আসছে। শিক্ষাব্যবস্থার অবনতি কীভাবে ঠেকানো যায়, তা নিয়ে শিক্ষাবিদদের কথা শোনার বদলে মোদী সরকার বরাবরের মতো প্রশাসনিক বলপ্রয়োগের পথই বেছে নিয়েছে। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত এই শিক্ষাব্যবস্থার কোথায় গলদ, সেটি খুঁজে বের করার জন্য কোনো তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়নি।
শিক্ষার মান কেন কমছে, হিন্দিভাষি রাজ্যগুলো কেন পিছিয়ে পড়ছে, কিংবা সারা দেশে শিক্ষার মান কীভাবে উন্নত করা যায়—এসব নিয়েও শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো বিস্তৃত, দলনিরপেক্ষ আলোচনা করেনি। আরও বড় প্রশ্ন, পড়াশোনার সঙ্গে চাকরির বাজারের যোগসাজশ কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো গবেষণা নেই।
এরপর আন্দোলনের ক্ষেত্রেও একই পুরোনো পথ নেওয়া হলো। কেন্দ্রীয় প্রশাসন শুরুতে পুরোপুরি নীরব ছিল। দিনের পর দিন কেটে গেল, কিন্তু আলোচনায় বসার কোনো উদ্যোগ দেখা গেল না। শেষ পর্যন্ত ককরোচ জনতা পার্টির দুই প্রতিনিধি ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে. পি. নাড্ডার মধ্যে বৈঠক হয়। তখন আন্দোলনের এক মাস পেরিয়ে গেছে, কিন্তু সেই বৈঠক থেকেও কোনো সমাধান বের হয়নি।
বৈঠক চলার সময়ই দিল্লি পুলিশ সংসদমুখী তরুণ বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালায়, তবু কেউ বিক্ষোভ স্থল ছেড়ে যায়নি। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ বৈদ্যুতিক লাঠি, কাঁদুনে গ্যাস ও পেলেট বন্দুক ব্যবহার করেছে। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সামলাতে এমন অস্ত্রের ব্যবহার গণতান্ত্রিক দেশে খুবই বিরল। অথচ বিশ্বের 'বিরলতমের মধ্যে বিরল' গণতন্ত্র বলে পরিচিত ভারতেই এমন দৃশ্য দেখা গেল। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, শিক্ষার্থীদের একটি আন্দোলন দমন করতে এতটা শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন কেন পড়ল?
আরও উদ্বেগের বিষয়, আন্দোলনের সময় অনেক বেসামরিক লোককে শিক্ষার্থীদের মারধর করতে দেখা গেছে। পুলিশ সামনে থাকলেও তাদের থামানোর কোনো চেষ্টা করেনি। কেন এমনটা ঘটতে দেওয়া হলো, সেই প্রশ্নের উত্তরও মেলেনি।
ভারতে পুলিশের বাড়াবাড়ি নতুন ঘটনা নয়, তবে গত এক দশকে পরিস্থিতি জ্যামিতিক হারে বদলেছে। ২০২৪ সালে কৃষকদের ওপর গুলি চালানো, ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব আইনবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলন বলপ্রয়োগে দমন করা, আবার একই সময়ে আসাম–মিজোরাম ও হরিয়ানা–পাঞ্জাব পুলিশের সশস্ত্র মুখোমুখি অবস্থান—এসব ঘটনা একসময় কল্পনাও করা যেত না। বর্তমানে সেগুলো যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
২০ জুলাইয়ের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখার বদলে দিল্লি পুলিশ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়। বলা হলো, অনেক বিক্ষোভকারী নাকি শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে এসেছিল এবং বিরোধী দলের হয়ে কাজ করছিল। এরপর আরও একটি বেনামি দাবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়—দিল্লির আন্দোলনের সঙ্গে নাকি পাকিস্তানেরও যোগ আছে। যদি সত্যিই পাকিস্তান এক লাখ বা তার বেশি মানুষকে ভারতের রাজধানীতে এনে আন্দোলনে নামাতে পারে, তাহলে প্রশ্ন হলো, সেই সময় ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী করছিল?
এসব অভিযোগ যতই হাস্যকর শোনাক, একটি পুরোনো সমস্যাকে সামনে এনেছে। বহু বছর ধরে পুলিশ সংস্কারের কথা হচ্ছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ১৯৭৮ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে একের পর এক কমিশন যেসব সুপারিশ করেছিল, সেগুলো আজও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফাইলের স্তূপে জমা পড়ে আছে। এবার সেগুলো বাস্তবায়ন করার সময় এসেছে। সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো, পুলিশকে রাজনৈতিক চাপ বা হস্তক্ষেপের বাইরে রাখা।
২০ জুলাইয়ের ঘটনা অনেক ভারতীয়র মনে ক্ষোভের দাগ রেখে যাবে। তবে অন্তত একটি বিষয়ে বর্তমানে আর মতভেদের সুযোগ নেই—দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ। কারণ আগামী দিনের ভারতের অর্থনীতি, সমাজ গড়ে তুলবে আজকের তরুণরাই। অথচ তারাই এখন রাষ্ট্রের কাছে জবাব চাইছে। এক তরুণীর ভাষায়, “জবাবদিহিতা ছাড়া কর নয়।” তরুণ ভারত মুখ খুলেছে, এবার প্রবীণ ভারতের পালা—তরুণদের শোনার, বোঝার এবং সময় থাকতে নিজেদের বদলে ফেলার।
লেখাটি ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ থেকে অনূদিত; এর লেখক রাধা কুমার ভারতের একজন নীতি বিশ্লেষক ও শান্তি–সংঘাতবিষয়ক বিশেষজ্ঞ। জাতিগত সংঘাত, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি দিল্লি পলিসি গ্রুপের সাবেক মহাপরিচালক।