১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

আসিফ নজরুলের বিশ্বকাপ বর্জন: যে ক্ষতি বাংলাদেশকে মেনে নিতে হয়েছিল

খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নাকি রাজনৈতিক চাল? আসিফ নজরুলের একক সিদ্ধান্তে ভারতে টি-২০ বিশ্বকাপ বর্জন করায় কী হারিয়েছে বাংলাদেশ?

আসিফ নজরুলের বিশ্বকাপ বর্জন: যে ক্ষতি বাংলাদেশকে মেনে নিতে হয়েছিল

শুরুতে সম্মিলিত সিদ্ধান্তের কথা বলা হলেও, এখন আসিফ নজরুল স্বীকার করছেন ভারতে অনুষ্ঠিত টি-২০ বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত ছিল তার একার—অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টার এমন ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ আচরণে ক্ষুব্ধ দেশের মানুষ।

কামরান রেজা চৌধুরী কামরান রেজা চৌধুরী

Published : 17 Sep 2026, 01:52 AM

Updated : 17 Sep 2026, 01:52 AM

ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পর আবারও আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। এবার তার ছাগল চুরি নিয়ে নয়; আলোচনা চলছে ভারতে অনুষ্ঠিত টি-২০ বিশ্বকাপ বর্জন নিয়ে। ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারতে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্তটি ছিল তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একার।

এই ঘোষণার পর আসিফ নজরুল নিজেও স্বীকার করেছেন যে তার একার সিদ্ধান্তেই বাংলাদেশ টি-২০ বিশ্বকাপ বর্জন করেছিল। এবং সেটি করেছিলেন খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশকে অবমাননা করার দোহাই দিয়ে। উপদেষ্টা হিসেবে তিনি খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করবেন, সেটি ঠিক আছে। তবে কতখানি চিন্তা করলে ‘মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি’ হয়ে যায়, তা নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন হয়ে থেকে যায়। কোনটি জাতিগত অবমাননা এবং কোনটি নয়, সেই সিদ্ধান্ত একা নির্ধারণ করা সঠিক কিনা, সে ব্যাপারেও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কারণ বিষয়টি একেকজন একেকভাবে দেখতে পারেন। বিষয়টি যদি তার ব্যক্তিগত হতো, তাহলে কোনো প্রশ্ন উঠত না। যেহেতু বিষয়টি জাতীয় এবং এর সঙ্গে কোটি কোটি মানুষের আবেগ-ভালোবাসা জড়িত, সেহেতু এ বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টিকে স্বৈরতান্ত্রিক বললে খুব বেশি বলা হবে না। সরকারি সিদ্ধান্ত হতে হয় সম্মিলিত—এটিই গণতন্ত্র। একলা একলা সিদ্ধান্ত নেওয়াটা স্বৈরতান্ত্রিক।

সবকিছু ছাড়িয়ে এখানে আবার সত্য-মিথ্যার একটা বিতর্ক থেকে যায়। বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের খেলতে না যাওয়ার ব্যাপারে আসিফ নজরুল বলেছিলেন, ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং খেলোয়াড়দের। এখন ওই ঘটনা নিয়ে তদন্তের পর বলছেন ভিন্ন কথা। এখানে প্রশ্ন হলো, তখন তিনি কেন মিথ্যাচার করেছিলেন? সিদ্ধান্ত তার একার ছিল, তিনি এটা মেনে নিলেই আলাপ শেষ হয়ে যায় না। অসত্য ভাষণের ব্যাখ্যাও তাকেই দিতে হবে।

এখন বোঝা যাচ্ছে, তিনি এবং তার মতো সত্যবাদীরা যেভাবে দেশের রাজনীতিবিদদের মিথ্যাবাদী বলে বছরের পর বছর ধরে গালমন্দ করে এসেছেন, তারাও চেয়ারে বসলে মিথ্যা বলেন। কথাটা অনেকটা বাংলা প্রবাদ ‘তুইও যা, মুইও তা’-এর মতো।

বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্তে দেশের সাধারণ মানুষ হতাশ হয়েছেন, কষ্ট পেয়েছেন, তবু তখন তা মেনে নিয়েছিলেন এটা সবার সিদ্ধান্ত জেনে। এখন যে বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা হচ্ছে, তা বুঝবার মতো সংবেদনশীলতা কি আসিফ নজরুলের আছে? বুঝতে পারলে হয়তো তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিতেন, যাতে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের জন্য সর্বাত্মক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হতো।

বিশ্বকাপ আয়োজন করতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা দিয়েছে ভারত সরকার। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি হতো বলে মনে হয় না। এর কারণ, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে দিন শেষে ক্ষতি হতো ভারতের; পৃথিবীর কোনো দেশ ভারতে খেলতে যেত না—অন্তত কয়েক বছরের জন্য হলেও। ভারত নিরাপদ নয়—এমন পরিচিতি সে দেশের কট্টরপন্থী হিন্দু গ্রুপগুলোও পেতে চায় বলে মনে হয় না।

সর্বোপরি বাংলাদেশের মানুষ চেয়েছে দেশ বিশ্বকাপে খেলতে যাক। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলছে, সেটি দেশের মানুষের কাছে একটি গর্বের বিষয়। গর্ব ছাড়াও এর সঙ্গে অর্থনীতি, জাতীয়তাবাদ, জাতীয় ঐক্য, আনন্দ-উচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন বিষয় জড়িত।

বিশ্বকাপ নিয়ে গ্রামেগঞ্জে জুয়া খেলা চলে, সেটি সত্য। কিন্তু সেটি বাংলাদেশ না খেললেও চলে; পাকিস্তান-ভারত খেলা নিয়ে বেশ ভালোই চলে।

যাই হোক, প্রথমেই স্বল্প পরিসরে অর্থনৈতিক দিকটি উল্লেখ করা যাক। বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাংলাদেশে একটি বাড়তি অর্থনৈতিক কার্যক্রম চলে। যেমন: ছোট-বড় পতাকা, জার্সি, টুপি বানানো ও বিক্রি। বাংলাদেশের খেলা থাকলে ছেলেমেয়েরা জার্সি ও টুপি পরে পতাকা সঙ্গে নিয়ে একত্র হয়ে খেলা উপভোগ করে। যোগ দেন অভিভাবকরাও। যখন অনেক মানুষ একত্র হয়, তখন সেখানে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন হয়। তৈরির ঝামেলা এড়াতে খাবার অর্ডার করেন দর্শকরা। পটকা-আতশবাজি চলে, অনেকটা উৎসবের আমেজ থাকে। রেস্তোরাঁয় বাড়তি অর্ডার হয়, খাবার সরবরাহকারীরাও বাড়তি আয় করেন। অর্থাৎ, এই বাড়তি অর্থনৈতিক সুফল ভোগ করেন কিছু প্রান্তিক মানুষ ও ব্যবসায়ী। এছাড়া, বিশ্বকাপ চলাকালে প্রায় সবাই খেলার দিকে মনোযোগ দেয় বলে কিছুটা হলেও অন্যান্য খারাপ কাজ থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখে।

উপদেষ্টা আসিফ নজরুল দেশের মানুষকে সেই উৎসব থেকে বঞ্চিত করেছেন। এর উদ্দেশ্য হতে পারে রাজনৈতিক; কারণ তার সরকারের বিদ্বেষ বাড়ানো ছাড়া তেমন কোনো অর্জন ছিল না।

রাজনীতিতে একটি নোংরা খেলা আছে। যখন কোনো সরকার অজনপ্রিয় হয় অথবা তেমন কোনো অর্জন থাকে না, তখন তারা সস্তা জাতীয়তাবাদের ধারণা দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে অথবা কোনো দেশের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ায়। এতে দেশের মানুষ সরকারের পক্ষে আসে, একত্র হয় এবং সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। এর মাধ্যমে নিজেকে জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। এটি শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য প্রযোজ্য নয়; ভারতবিরোধী কথাবার্তা বাংলাদেশে সবসময়ই জনপ্রিয়তার সস্তা উপকরণ।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই, সেটা অবশ্য ভারতবিদ্বেষের গল্প নয়। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ সরকার। এই সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনাকে ‘কাজের বেটি মর্জিনা’ বলে কটাক্ষ করেন এবং ঢাকা সফরকারী এক মার্কিন কর্মকর্তাকে নিম্ন পদের কর্মচারী বলে সংবাদমাধ্যমে মন্তব্য করেন দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তখন দেশের মানুষ সেই আলোচনা নিয়েই ব্যস্ত ছিল এবং বলা হয়েছিল, সরকারের হেডম আছে, আমেরিকার দূতকে নিয়ে এমন মন্তব্য করেছে!

৫ অগাস্ট-পরবর্তী সময়ে ভারত-বিরোধিতাকে আরও উসকে দিয়ে নিজেকে দেশপ্রেমিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা অথবা সুসংহত করাই হয়তো আসিফ নজরুলের উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু তিনি এই কাজ করতে গিয়ে, অর্থাৎ কিছু বাড়তি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য দেশের অপূরণীয় ক্ষতি করে গেলেন।

প্রশ্ন আসতে পারে, এতে কী ক্ষতি হলো? একটি বিশ্বকাপ না খেললে কী ক্ষতি? প্রথম ক্ষতি দেশের ক্রিকেটের। বিশ্বকাপ সারা বছর হয় না, কয়েক বছর পর পর হয়। এই বিশ্বকাপের সময় যেসব খেলোয়াড় ফর্মে ছিলেন, আগামী বিশ্বকাপের সময় সেসব খেলোয়াড় ফর্মে থাকবেন অথবা তাদের বয়স থাকবে—এমন নিশ্চয়তা আছে?

আমাদের যেসব খেলোয়াড় বিশ্বকাপে ভালো করতেন, তারা পুরস্কারের অর্থ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতেন। বিভিন্ন দেশের লিগে খেলার অফার আসত। খেলোয়াড়রা আর্থিকভাবে লাভবান হতেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়দের সঙ্গে একই টিমে খেলে নিজের দক্ষতা বৃদ্ধি করতেন, যা দিন শেষে বাংলাদেশ জাতীয় দলকেই লাভবান করত।

ভালো খেলোয়াড়দের জন্য বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের অফার আসত। এতে ব্যক্তি খেলোয়াড় যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হতেন, তেমনি বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানেরও লাভ হতো। বাংলাদেশের ক্রিকেট উন্নয়নের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন দরকার, তেমনি দরকার খেলোয়াড়দের সামাজিক সম্মান ও আর্থিক সচ্ছলতা।

একজন খেলোয়াড়ের জীবনে সবচাইতে বড় স্বপ্ন থাকে বিশ্বকাপে খেলার। তিনি খেলবেন, সারা দেশ ও সারা বিশ্ব তাকে দেখবে। এটি যেমন দেশকে তুলে ধরবে, তেমনি সেই খেলোয়াড়ের পরিবার, পরিজন, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীকে গর্বিত করবে। সমাজে তাদের সম্মান বাড়বে। তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তী প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বিশ্বজয়ী খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন পূরণে কাজ করবে।

একটি দল রাতারাতি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় না। এর জন্য দল হিসেবে দশকের পর দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বকাপসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পর্যায়ে খেলতে হয়। তাদের শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশেও খেলতে হয়। এগুলো তাদের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে এবং জাতীয় দলকে এগিয়ে নেয়। ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপে অংশ নিলে হয়তো আমাদের খেলোয়াড়দের শত্রুভাবাপন্ন একটি পরিবেশে খেলতে হতো; কিন্তু খেলোয়াড়দের সেই পরিস্থিতিতেও কীভাবে খেলতে হয়, সেই যোগ্যতা তৈরি হতো।

ভালো খেললে দেশের মানুষ সম্মান পায়। একটি উদাহরণ উল্লেখ করতে চাই। ২০১৫ সালে সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির একটি ফেলোশিপে আমি কয়েক মাস সেখানে অবস্থান করেছিলাম। সেই সময় বাংলাদেশ সফরে এসেছিল পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে। সবকটি ম্যাচেই বাংলাদেশ দারুণভাবে সফরকারী দলগুলোকে হারিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সাড়া ফেলে দেয়। সিঙ্গাপুরে আমি যে অ্যাপার্টমেন্টে অবস্থান করছিলাম, সেখানে ভারতের একজন ফেলো ছিলেন, যিনি ভীষণরকমের মুসলিম ও বাংলাদেশ-বিদ্বেষী। আরেক পাকিস্তানি ছিলেন, তিনিও প্রবল বাংলাদেশ-বিদ্বেষী। বাংলাদেশ প্রথমে পাকিস্তান ও পরে ভারতকে হারানোর পর দেখলাম তাদের সুর বদলে গেল। তারা আর বাংলাদেশবিরোধী কথা বলেন না; বলতে শুরু করলেন, “ইউ আর ডুইং ভেরি গুড; দে আর আ গুড টিম।” অথচ কয়দিন আগেও দুজনই বলতেন, “বাংলাদেশ ইজ আ রাবিশ টিম।”

ফিরে আসি মূল কথায়। আসিফ নজরুলের স্বীকারোক্তির মাধ্যমে একটি বিষয় ধরে নেওয়া যায়: অনির্বাচিত শাসকেরা নিজেদের অথবা গোষ্ঠীগত সামান্যতম স্বার্থ রক্ষার জন্য দেশের যেকোনো বড় স্বার্থ বিসর্জন দিতে দ্বিধা করে না। জনগণের কাছে তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। ক্ষমতা থেকে সরে গেলেই একসময় দেখবেন জনগণের সামনে থেকে উধাও। এদের কিছুই করা যাবে না। যেমনটি ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও তাদের সমর্থকদের কথা মানুষ ভুলে গেছে। একদিন হয়তো আসিফ নজরুলদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথাও মানুষ ভুলে যাবে। তবে নানা ক্ষেত্রে এই সরকার যে ক্ষতি করে গেছে, তা বাংলাদেশ আদৌ পুষিয়ে নিতে পারবে কিনা, সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে।

কামরান রেজা চৌধুরী পেশায় সাংবাদিক–সংসদীয় রাজনীতি নিয়ে প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছেন তিন দশক ধরে। ই-মেইল: kamran.reza@gmail.com