০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়ে হারমানপ্রিত বললেন, ‘রক্ত, ঘাম, ত্যাগ, সবটুকু দিয়েছি’

নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়ে ভারতের সফল অধিনায়ক হারমানপ্রিত কৌর বললেন, এখন শুধু ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসার টানে খেলে যাবেন।

অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়ে হারমানপ্রিত বললেন, ‘রক্ত, ঘাম, ত্যাগ, সবটুকু দিয়েছি’

হারমানপ্রিতের নেতৃত্বেই গত বছর প্রথমবার ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায় ভারত। ছবি: বিসিসিআই। 

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 06 Oct 2026, 01:03 PM

Updated : 06 Oct 2026, 01:11 PM

ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের এক বছর হয়নি এখনও। এই তো, মাত্রই ভারতীয় দল ধরে রেখেছে এশিয়া গেমস ক্রিকেটের সোনার পদক। এর কদিন আগে পুনরুদ্ধার করেছে এশিয়া কাপের শিরোপা। কিন্তু এই সাফল্যযাত্রার মধ্যেই নিজের নেতৃত্বের পথচলার সমাপ্তি দেখে ফেললেন হারমানপ্রিত কৌর। নেতৃত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে ভারতের সফল অধিনায়ক বললেন, এখন কেবল ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা থেকেই খেলে যাবে।

৩৭ বছর বয়সী ব্যাটার মঙ্গলবার সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “সব সংস্করণ মিলিয়ে ভারতীয় নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়কের পদ থেকে আজ আমি সরে দাঁড়াচ্ছি।”

ভারতকে ৫ টেস্ট, ৫১ ওয়ানডে ও রেকর্ড ১৫৫ টি-টোয়েন্টিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন হারমানপ্রিত। তার অধিনায়কত্বেই বহু আরাধ্য ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রথম শিরোপা জেতে ভারত গত বছর। এছাড়াও দুটি এশিয়া কাপ ও দুবার এশিয়ান গেমসে সোনার পদক জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

দল সাফল্যের পথ ধরে ছুটলেও হারমানপ্রিতের নেতৃত্ব নিয়ে গুঞ্জন চলছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। যেটির একটি বড় কারণ তার বয়স। এছাড়া ব্যাটিংয়েও হিসেবে কিছুটা অধারাবাহিক হয়ে পড়েছিলেন। দলে তার জায়গা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন ছিল না কখনোই। তবে তার জায়গা সহ-অধিনায়ক স্মৃতি মান্ধানাকে অধিনায়ক করার আলোচনা উঠছিল নানা দিক থেকেই।

এশিয়ান গেমসের পর নারী দলের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে হারমানপ্রিত, মান্ধানা ও কোচ অমল মজুমদারের সঙ্গে গুয়াহাটিতে সোমবার আলোচনায় বসেন ভারতীয় বোর্ডের সচিব দেবাজিৎ সাইকিয়া। ক্রিকেট ওয়েবসাইট ক্রিকইনফোন জানতে পেরেছে, হারপ্রানপ্রিতকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত ছিল নির্বাচক কমিটি। ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকস পর্যন্ত তাকে রেখে দেওয়ার পক্ষেও মত ছিল কিছু। তবে বোর্ড কর্তার সঙ্গে বৈঠকের পরদিন সিদ্ধান্ত নিলেন হারমানপ্রিত নিজেই।

Image

এশিয়ান গেমসে টানা দুবার সোনার পদক জিতে শেষ করলেন অধিনায়ক হারমানপ্রিত। ছবি: বিসিসিআই। 

হারমানপ্রিত ভারতকে প্রথম নেতৃত্ব দেন ২০১২ সালে একটি টি-টোয়েন্টিতে। তবে ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ঘরের মাঠে গ্রুপ পর্ব থেকে ভারতের বিদায়ের পর এই সংস্করণে নিয়মিত অধিনায়ক করা হয় তাকে।

হারমানপ্রীত ২০১২ সালে প্রথম টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কত্ব করেন, কিন্তু ২০১৬ সালে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই ভারত বিদায় নেওয়ার পরেই তাকে এই পদের জন্য একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়।

কিংবদন্তি মিতালি রাজের বিদায়ের পর ক্রমে সব সংস্করণেই দায়িত্ব পান হারমানপ্রিত। সেই পথচলা এবার শেষ হলো।

সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা কঠিন ছিল, তা ফুটে উঠল হারমানপ্রিতের দীর্ঘ বিদায়ী বার্তায়।

“এটা কোনো সহজ সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে বছরের পর বছরের স্মৃতি, আবেগ, ত্যাগ এবং এমন সব মুহূর্ত, যা আমার বাকি জীবনজুড়ে সঙ্গী হবে।

এই দলকে এবং ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটকে আমি সবকিছু দিয়েছি — আমার রক্ত, আমার ঘাম, আমার সময়, এবং অনেক সময়, আমার নিজের খেলা ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার অংশও। এমন অনেক মুহূর্ত ছিল, যখন আমাকে আমার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, আমার নিজের উন্নতি এবং নিজের জন্য যা চেয়েছিলাম, তা একপাশে সরিয়ে রাখতে হয়েছে, কারণ বিশ্বাস করতাম দলকেই সবার আগে রাখতে হবে।”

নেতৃত্বের কারণে অনেক সময় অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হয়েছে, যে কারণে এমনকি তার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারে ক্ষতিও হয়েছে। তবে তার দাবি, সবকিছুই ছিল দলের স্বার্থে।

“একজন অধিনায়ক হিসেবে আমাকে অনেক সময় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এমন সব সিদ্ধান্ত যা সবসময় বোঝা যেত না, সবসময় সহজ ছিল না এবং কখনও কখনও যেসবের জন্য আমাকে ব্যক্তিগতভাবে মূল্য দিতে হয়েছে।

কিন্তু আমার নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে একটাই উদ্দেশ্য ছিল - এই দলকে আরও ভালো করে তোলা এবং অন্য ক্রিকেটারদের বেড়ে ওঠার, নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখার এবং নিজেদের সেরা সংস্করণ হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেওয়া।”

নেতৃত্বের অভিযানে তলানিতে আছড়ে পড়ার যন্ত্রণা থেকে চূড়ায় ওঠার উত্তুঙ্গ উচ্ছ্বাস, সবকিছুর স্বাদ তিনি পেয়েছেন।

“আমি সবকিছুই দেখেছি। দেখেছি সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তগুলো, হৃদয়ভঙ্গ, সমালোচনা, সন্দেহ এবং সেই দিনগুলো, যখন মনে হচ্ছিল কিছুই আমাদের পক্ষে যাচ্ছে না। জীবনের সর্বোচ্চ আনন্দগুলোও অনুভব করেছি - জয়, উদযাপন, আমাদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করার গর্ব এবং সেই মুহূর্তগুলো যা প্রতিটি ত্যাগকে সার্থক করে তুলেছে।”

বিদায়বেলায় তার কোনো আক্ষেপ নেই, আছে পূর্ণতার তৃপ্তি।

আজ আমি অধিনায়কত্ব ছাড়ছি আবেগাপ্লুত হৃদয়ে, কিন্তু সঙ্গে শান্তি নিয়েও। কারণ মন থেকে বিশ্বাস করি, আমার দল একটি ভালো অবস্থানে আছে। এমন একটি দল যেখানে প্রতিভা, দৃঢ়তা, বিশ্বাস এবং একটি ভবিষ্যৎ রয়েছে, যা দেখার জন্য এবং যার অংশ হতে আমি অত্যন্ত আগ্রহী।

আমার মনে হয় আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি। আমি এই দলকে আমার সর্বস্ব দিয়েছি। গর্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি এবং ভারতীয় নারী ক্রিকেটকে নেতৃত্ব দেওয়ার এই সুযোগের জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব।”

তার যে বয়স, এই পর্যায়ে এসে শুধু নেতৃত্ব নয়, পুরোপুরিই অবসরে চলে যান অনেকে। তবে হারমানপ্রিত এখন স্রেফ মনের আনন্দে খেলে যাওয়ার সেই রোমাঞ্চ অনুভব করছেন আবার।

“এখন আমার জন্য নতুন অধ্যায় শুরু করার সময়। অধিনায়কত্ব হয়তো আজ শেষ হলো, কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটের প্রতি আমার ভালোবাসা কখনো শেষ হবে না। আমার উত্থান-পতনের সময়ে পাশে থাকা প্রত্যেক সতীর্থ, কোচ, সাপোর্ট স্টাফ, ম্যানেজমেন্ট, বিসিসিআই, পরিবারের সদস্য এবং প্রত্যেক ভক্তকে ধন্যবাদ।

রক্ত। ঘাম। ত্যাগ। গর্ব। আমি আমার সবটুকু দিয়েছি। এখন আমি আবার খেলার প্রতি ভালোবাসার টানে খেলতে প্রস্তুত। অধিনায়কত্বের অবসান। যাত্রা অব্যাহত।”

অতি নাটকীয় কিছু না হলে নতুন অধিনায়ক হতে যাচ্ছেন স্মৃতি মান্ধানা। গত কয়েক মাসে নেতৃত্বের প্রশ্নে তিনি বারবারই বলেছেন, নিজেকে প্রস্তুত মনে করছেন এই দায়িত্বের জন্য। উইমেন’স প্রিমিয়ার লিগে (নারী আইপিএল) তার নেতৃত্বে টানা দুবার শিরোপা জিতেছে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু।

৩০ বছর বয়সী স্টাইলিশ এই ব্যাটারকে মনে করা হয় এই সময়ে বিশ্বের সেরা ব্যাটার। ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে নানা সময়ে ১৮ টি-টোয়েন্টি ও ৪টি ওয়ানডেতে দলকে এর মধ্যেই নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা তার হয়েছে।