০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

পর্তুগালের জন‍্য রোনালদোর ভালোবাসা

পাঁচ মিনিটের একটি ভিডিও বার্তায় পর্তুগালের মানুষের জন‍্য হৃদয় দুয়ার খুলে দিয়েছেন এই মহাতারকা।

পর্তুগালের জন‍্য রোনালদোর ভালোবাসা

দেশকে ২০১৬ সালের ইউরো জয়ে নেতৃত্ব দেন রোনালদো। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Nov 2026, 06:42 PM

Updated : 05 Nov 2026, 06:42 PM

‘৭ নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার সময় হয়েছে’, দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে দেওয়া বিদায়ী বার্তায় এভাবেই শুরু করলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। নিষেধাজ্ঞার মধ‍্যেই জাতীয় দলের ক‍্যারিয়ারের ইতি টেনে দিলেন পর্তুগিজ মহাতারকা।

ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বললেন তিনি।

কোচের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে গত ফিফা উইন্ডোর মাঝপথে ক‍্যাম্প ছাড়েন রোনালদো। পরে বিশাল এক বার্তায় কোচকে কাঠগড়ায় তোলেন তিনি। এই ঘটনায় পান এক মাসের নিষেধাজ্ঞা।

তিনি ক‍্যাম্প ছাড়ার পর থেকেই জাতীয় দলে তার ভবিষ‍্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। নভেম্বরের উইন্ডোতে তিনি ডাক পাবেন কিনা তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকে। সে সবেরও ইতি টেনে দিলেন রোনালদো।

সামাজিক মাধ‍্যমে বৃহস্পতিবার বিদায়ের ঘোষণা দেন রোনালদো। পাঁচ মিনিটের একটি ভিডিও বার্তায় পর্তুগালের মানুষের জন‍্য হৃদয় দুয়ার খুলে দেন এই মহাতারকা।

পর্তুগালের জনগণের উদ্দেশ্যে রোনালদোর বিবৃতি:

পর্তুগালের মানুষরা, আমাদের জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার দিনটি চলে এসেছে। আমি কখনও মনে করিনি যে এটি শুধুই আমার। তবে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে এই জার্সি পরা, এটাকে রক্ষা করা এবং নিজের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল।

আজ সময় এসেছে জার্সিটি ভবিষ্যতের জন্য ছেড়ে দেওয়ার। সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না, কারণ কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মাথা দিয়ে নেওয়া যায় না, সেগুলো হৃদয় থেকে নিতে হয়।

আমি এমন একটি যাত্রার সমাপ্তি টানছি, যা ২০০৩ সালের অগাস্টে শুরু হয়েছিল এবং আমার জীবনকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। আমি যখন পেছনে ফিরে তাকাই এবং জাতীয় দলের সাথে কাটানো আমার সব অভিজ্ঞতার কথা ভাবি, তখন আমি কেবল ম্যাচ, গোল, রেকর্ড বা ট্রফি দেখি না। আমি মানুষকে দেখি।

আমি সেইসব অভিবাসীদের দেখি যারা ৯০ মিনিটের জন্য পর্তুগালকে একটু বেশি কাছে অনুভব করেছিলেন। আমি লাখো পর্তুগিজকে দেখি যাদের সঙ্গে আমার কখনও ব্যক্তিগতভাবে দেখা হয়নি, কিন্তু তারা আমার জীবনের অংশ ছিলেন। কারণ দিনশেষে ফুটবল কেবল একটি খেলার চেয়েও অনেক বড় কিছু। ফুটবল মানেই মানুষ।

জাতীয় দলের হয়ে ক্যারিয়ারজুড়ে আমি সবসময় নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি জিততে চেয়েছি, সেরা হতে চেয়েছি, ইতিহাস গড়তে চেয়েছি। নিজের প্রতি আমি সবসময়ই কঠোর ছিলাম। আমি সবসময় আরও বেশি চেয়েছি, সবসময় বিশ্বাস করেছি যে আমরা আরও দূরে যেতে পারি এবং এই জার্সির জন্য আমি আমার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি।

কিছু বিকেল ও রাত ছিল একদম নিখুঁত, এমন কিছু জয় ছিল যা আমি কখনও ভুলব না, আবার এমন কিছু পরাজয়ও ছিল যা আজও মনে করা আমার জন্য কষ্টের। আমিও ব্যর্থ হয়েছি, আমিও কষ্ট পেয়েছি, এমন কিছু মুহূর্তও ছিল যখন আমি পর্তুগিজদের তাদের কাঙ্ক্ষিত আনন্দ দিতে পারিনি। কিন্তু আমি কখনও হাল ছাড়িনি। আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে, পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমার গর্ববোধ কখনো কমেনি।

এই বছরগুলো থেকে আমি খুব সহজ কিছু জিনিস শিখেছি। গোল একসময় ফিকে হয়ে যায়, ট্রফিগুলো মিউজিয়ামে জমা থাকে, রেকর্ডও একসময় ভেঙে যায়। কিন্তু এমন কিছু জিনিস আছে যা সময় কখনও মুছে দিতে পারে না: মানুষের হৃদয়ে আমাদের তৈরি হওয়া স্থানটুকু।

আমি যদি কখনও আপনাদের আনন্দ দিয়ে থাকি, আমার কোনো গোল দেখে যদি কখনও আপনি কাউকে আলিঙ্গনে বাঁধেন, কোনো কঠিন মুহূর্ত ভুলিয়ে দিয়ে থাকে কিংবা আমাদের দেশকে নিয়ে গর্বিত করে থাকে- তবে আমার এই পুরো পথচলা সার্থক। কারণ পর্তুগিজ হওয়ার আসল অর্থ তো এটিই। আমরা একসঙ্গে কষ্ট পাই, একসঙ্গে ঘুরে দাঁড়াই এবং একসঙ্গে আবারও বিশ্বাস করি।

পর্তুগালের সবসময় এমন তরুণদের প্রয়োজন যারা স্বপ্ন দেখে, এমন খেলোয়াড়দের প্রয়োজন যারা কখনো হাল ছাড়ে না, এমন নতুন প্রজন্মের প্রয়োজন যারা বিশ্বাস করে যে যেখানে আগে কেউ পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে পৌঁছানো সম্ভব। কারণ যে দেশ নতুন নতুন বীর তৈরি করতে পারে, সে দেশ কখনও নিজের ওপর বিশ্বাস হারায় না।

আমার সতীর্থদের উদ্দেশ্যে আমি একটি বিশেষ কথা বলতে চাই। প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি আলিঙ্গন, প্রতিটি আলোচনা এবং মাঠে নামার আগের প্রতিটি মুহূর্তের নীরবতার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। আমরা একসাথে যে সব জয় উদযাপন করেছি এবং প্রতিটি পরাজয় যা আমাদের আরও শক্তিশালী করেছে, তার জন্য ধন্যবাদ। অধিনায়ক হওয়ার সুযোগ আমি পেয়েছিলাম, কিন্তু কোনো অধিনায়কই একা পথ চলতে পারে না। আর সব সতীর্থ আমার গল্পের অংশ।

সব কোচ, ম্যানেজার, চিকিৎসক, ফিজিও, কিট ম্যান, স্টাফ এবং এই দীর্ঘ সময়ে যারা আমার সঙ্গে কাজ করেছেন, তাদের সবাইকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। আপনাদের মধ্যে অনেকেই কখনও ছবিতে আসেননি, কিন্তু আপনাদের ছাড়া এই ছবিগুলোর কোনোটিই তোলা সম্ভব হতো না।

আমার পরিবারকে ধন্যবাদ আমার সঙ্গে এই স্বপ্নটি ভাগ করে নেওয়ার জন্য। আমার অনুপস্থিতি, ত্যাগ এবং জাতীয় দল যখন তোমাদের প্রাপ্য সময়টুকু কেড়ে নিয়েছে, তা সুন্দরভাবে মানিয়ে নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমি যে আজ এতদূর আসতে পেরেছি, তার কারণ আমরা সবসময় একে অপরের হাত ধরে চলেছি।

আর পর্তুগিজদের উদ্দেশ্যে, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সমস্ত পর্তুগিজদের জন‍্য আমি একটি শেষ কথা বলতে চাই। একটি দৃশ্য আমি আজীবন আমার সাথে বহন করব: সেটি হলো জাতীয় সঙ্গীত শুরু হওয়ার মুহূর্তটি। আমি চারপাশে তাকাই, আমার সতীর্থদের দেখি, গ্যালারি দেখি, শিশু, মা, বাবা এবং দাদা-দাদিদের দেখি; আমি সেইসব পর্তুগিজদের দেখি যারা কেবল সেখানে থাকার জন্য লম্বা পথ পাড়ি দিয়েছেন।

আর সেই কয়েক মিনিটের জন্য আমাদের মধ্যে সব পার্থক্য মুছে যায়। সেখানে কোনো ক্লাব থাকে না, কোনো বর্ণ থাকে না, কোনো শ্রেণী, পেশা বা ভিন্ন মতামত থাকে না। সেখানে থাকে কেবল একটিই আবেগ: পর্তুগাল। আমি আমার বাকি জীবনের জন্য এই অনুভূতিটি নিজের সাথে বহন করব।

আজ জাতীয় দলের হয়ে মাঠের ভেতর আমার যাত্রা শেষ হলো। আমি মাথা উঁচু করে বিদায় নিচ্ছি, আমি যে পথ চলেছি তা নিয়ে আমি গর্বিত এবং আমার এই আত্মতৃপ্তি আছে যে আমি পর্তুগালের জন্য আমার সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি। কিন্তু আমি কখনও আপনাদের থেকে আলাদা হব না। আমি পর্তুগালের প্রতিটি জয়ের জন্য দূর থেকেই পুরো হৃদয় দিয়ে রোমাঞ্চিত হব, উদযাপন করব, (হারে ) কষ্ট পাব।

আমি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার জন্য আমার পুরো জীবন কাজ করেছি। আজ আমি বুঝতে পেরেছি যে, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় জয় হলো বিশ্বের সেরা দেশটির প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার অর্জন করা।

এই ২৩ বছরের জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আমার ওপর বিশ্বাস রাখার জন্য ধন্যবাদ। মাদেইরার এক সাধারণ ছেলে হিসেবে বলের পেছনে ছুটে চলা থেকে শুরু হওয়া একটা স্বপ্নকে সত্যি করতে দেওয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।

৭ নম্বর জার্সিটি আমার কাছেই থাকবে; এটি পরার গর্ব চিরকাল আমারই থাকবে। পর্তুগাল সবসময় আমার একটি অংশ হয়ে থাকবে।