স্মৃতিতে তৌফিক: একজন পরামর্শক, একজন বন্ধু
দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকলেও বন্ধুত্বের স্মৃতি যে অমলিন, সেই কথাই স্মরণ করেছেন তীর্থঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তার স্মৃতিতে তৌফিক ইমরোজ খালিদী এমন এক সাংবাদিক, যার আন্তরিকতা ও উদারতা মনে রাখার মতো।
দিনটি ছিল ২ অক্টোবর; শুক্রবার। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে গাড়িতে জ্বালানি নিতে একটি পেট্রোল স্টেশনে থামি। জ্বালানি দেওয়ার পাইপটি খুলতে যাব, এমন সময় বেজে ওঠে মোবাইল ফোন। কলকাতা থেকে ফোন করেছিলেন আমার কাছের বন্ধু ঈশানী দত্ত রায়। তিনি জানতে চাইলেন, ‘তৌফিক ভাইয়ের’ কোনো খবর পেয়েছি কি না।
আমি কিছুটা হতভম্ব হয়ে পড়ি।
তৌফিকের সঙ্গে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না।
‘কী হয়েছে?’ আমি জানতে চাইলাম।
ঈশানী বলল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানতে পেরেছেন, তৌফিক লন্ডনে মারা গেছেন।
মুহূর্তের জন্য মনে হলো, আমি যেন আমার এক নিভৃত শুভাকাঙ্ক্ষীকে হারালাম।
ঈশানী এখন আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক। আমরা তিনজনই একসময় বিবিসির বাংলা বিভাগে একসঙ্গে কাজ করেছি।
আমি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কাজ শুরু করি ১৯৯৯ সালের জুনে। এর কয়েক মাস পর যোগ দেন তৌফিক। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে তিনি আমাকে পেশাগতভাবে পথ দেখিয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনেও পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তৌফিক আমাকে সহকর্মীর চেয়ে ছোট ভাই হিসেবেই বেশি দেখতেন। তার স্নেহ, উদারতা ও আন্তরিকতার জন্য আমি তার কাছে গভীর কৃতজ্ঞ।
২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে লন্ডনের ক্ল্যারিজেস হোটেলে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নিতে আমাকে সঙ্গে নেওয়ার জন্য বিবিসির বাংলা বিভাগের কর্মকর্তাদের রাজি করানোর তার সেই প্রচেষ্টার কথা আমার আজও মনে পড়ে।
আমি তখন তরুণ, অভিজ্ঞতাও ছিল কম। ওই সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ আমার জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা।
তৌফিকের এ সিদ্ধান্তে বিবিসির কয়েকজন অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন।
২০১২ সালে বিবিসি ছাড়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তৌফিক যেভাবে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। এরপরের বছরগুলোতেও তার সমর্থন পেয়েছি।
ওই বছরের ডিসেম্বরে বিবিসি ছাড়ার পর কয়েক মাস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে কাজ করি। ইংরেজি সংবাদ সম্পাদনা করে ভাষার মান বাড়ানোই আমার দায়িত্ব। কঠিন এক সময়ে এই কাজ আমার পেশাগত মনোবল ধরে রাখতে সাহায্য করেছিল।
সাংবাদিকতার প্রতি তৌফিকের অঙ্গীকার ছিল অবিচল। সাংবাদিক হিসেবে তার নির্ভীকতা ছিল অনুকরণীয়। বাংলা ও ইংরেজি–দুই ভাষাতেই তার দক্ষতা ছিল বিরল।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাফল্য তার নেতৃত্ব ও ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতার সাক্ষ্য বহন করে। তৌফিক সম্পর্কে আমার যে অনুভূতি, ঈশানীও একইভাবে তাকে স্মরণ করেন বলে আমি জানি।
২০১৩ সালের মাঝামাঝি থেকে আমাদের আর যোগাযোগ হয়নি। কিন্তু তৌফিক আমাদের হৃদয়ে ছিলেন, আগামীতেও বহু বছর থাকবেন।
যাদের ছেড়ে আমরা চলে যাই, তাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকাই হলো প্রকৃত অমরত্ব।
তৌফিককে খুব খুব অনুভব করব।
তীর্থঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সাবেক কর্মী। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমেও কাজ করেছেন।
