রক্তরেখায় বাংলাদেশ এবং বিরুদ্ধ সময়ের এক সাহসী মানুষ
বিরুদ্ধ সময়ে মুক্তিযুদ্ধের নির্মোহ ইতিহাস ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ প্রকাশের সাহসিকতা আর কফিশপ-টেবিলে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন—তৌফিক ইমরোজ খালিদীর স্মরণে সিরাজুল ইসলাম আবেদ।
‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ: অন্তহীন যুদ্ধ, গৌরব, বেদনা আর শিকড়ের ইতিহাস’—বইয়ের নাম এত বড়! শুধু নামটিই বড় নয়, আকারটাও বেশ বড়; যাকে বলে ‘কফি টেবিল বুক’। তিন খণ্ড মিলিয়ে দেড় হাজার পৃষ্ঠা। আর সময়? সেটিও ছিল এককথায় বিরুদ্ধস্রোত।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখাবার বেশ তোড়জোড় চলছিল চারদিকে। পারলে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১—পুরো সময়টাকেই বদলে ফেলে! বাংলাদেশের জন্ম বা মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তানের শত্রুদেশের ‘ষড়যন্ত্রের ফসল’ হিসেবে দেখানোর বয়ান তৈরি করা হচ্ছে রাতারাতি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কিছু বলতে গেলেই ট্যাগ করা হচ্ছে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ তকমায়, তৈরি করা হচ্ছে ‘মব’। এমন এক সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত বড় একটি প্রামাণ্য সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া নিঃসন্দেহে সাহসের কাজ ছিল। শঙ্কা, ভয়—সবই ছিল; তারপরও তিনি ছিলেন ঋজু, সিদ্ধান্তে অবিচল। বিরুদ্ধ সময়ের সেই সাহসী মানুষটিই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
আকস্মিক তৌফিক ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে বারবার মনে পড়ছে ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’-এর সেই কয়েকটি মাস। মনে হচ্ছে, খুব অল্প সময়ের একটি কাজের ভেতর দিয়ে মানুষটিকে যেন অনেকটা কাছ থেকে দেখেছিলাম। তার সঙ্গে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল না; কিন্তু একটি বড় কাজের সহযাত্রী হিসেবে যে সময়টি তার সঙ্গে কেটেছে, সেটি আমার সাংবাদিকজীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর। একটি গবেষণার মাঠপর্যায়ের কাজে রংপুর যাচ্ছি। পথে পুরনো সহকর্মী ও বড় ভাই, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর রাজীব নূরের ফোন—‘আবেদ, আপনি কোথায়?’
রংপুর যাচ্ছি শুনে ফোনেই জানালেন, বিডিনিউজ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি বড় বই প্রকাশের পরিকল্পনা করা হয়েছে; সেখানে আপনাকে সমন্বয়ের দায়িত্ব নিতে হবে। বইটি হবে প্রায় বারোশ পৃষ্ঠার; সম্পাদক চান ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করতে।
বিষয় যেহেতু মুক্তিযুদ্ধ, কাজটির প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হতে সময় লাগেনি। কিন্তু একই সঙ্গে ভয়ও হচ্ছিল—এত বড় একটি কাজ, অথচ হাতে সময় মাত্র দুই মাসের মতো! এর মধ্যে নিজের অন্যান্য ব্যস্ততা তো আছেই। রাজীব দা অভয় দিলেন, বললেন—‘আমি তো আছি, সালেক খোকন থাকবেন। আরও কয়েকজনকে যুক্ত করা হবে, আপনি কোঅর্ডিনেশনের কাজটি করবেন।’ ৩১ অক্টোবর ঢাকায় ফিরব জানালে ওই দিন বিকেলেই সভার ব্যবস্থা করলেন। একটা প্রাথমিক বিষয়বিন্যাস পাঠিয়ে বললেন, “তাড়াহুড়ো করে এটা করেছি, আপনি দেখে সংযোজন-বিয়োজন করে অধ্যায় ভাগ করে ফেলবেন। এরপর বসে সবাই মিলে আমরা চূড়ান্ত করব।”
বিডিনিউজের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে অনেক আগে থেকেই জানতাম—তার কাজের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সরাসরি দেখা বা কথা হয়নি, কাজের অভিজ্ঞতাও ছিল না। বন্ধুদের কাছে তার যে পরিচয় শুনেছিলাম, তাতে তিনি মেধাবী, জেদি, নাকউঁচু এবং শতভাগ কেতাদুরস্ত একজন মানুষ। ফলে খানিকটা নার্ভাসনেস নিয়েই প্রথম সভায় গেলাম। সভা হলো, কিন্তু তিনি সভায় নেই। বিডিনিউজের প্রধান বার্তাসম্পাদক জাহিদুল কবির ভাই, রাজীব দা, আকিব ভাইসহ কয়েকজনকে নিয়ে সেই সভা হলো। তৌফিক ভাই কোনো কাজে আটকে যাওয়ায় সময়মতো আসতে পারেননি। পরে ভেবেছি, সেটা হয়তো আমার জন্য ভালোই হয়েছিল। মিটিংয়ের পর প্রথম ভয়টা অনেকটাই কেটে গিয়েছিল। শুরুতেই আমি সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলাম, এত বড় কাজ মাত্র দুই মাসে শেষ করা প্রায় অসম্ভব। জাহিদ ভাই সেটা স্বীকারও করলেন; কিন্তু তার কথাটি ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ—অসম্ভব জেনেও আমরা কাজটি শুরু করতে চাই। এরপর তো আর কথা থাকে না।
সভায় অধ্যায়বিন্যাস হলো, সম্ভাব্য লেখক ও সংকলকদের তালিকা করা হলো। এক পার্শ্ব-মিটিংয়ে আমার সম্মানীর বিষয়টিও জাহিদ ভাই এবং রাজীব দা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আলোচনা করলেন। সভা শেষে রাজীব দা আমার ব্যবহারের জন্য একটি ডেস্ক দেখিয়ে দিলেন, বুঝলাম আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া ছিল। মিটিং শেষে সেই ডেস্কে বসে কাজ করছি, এর মধ্যে এলেন তৌফিক ভাই। রাজীব দা আমাকে তার ঘরে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সৌজন্যমূলক কথাবার্তা শেষ হতেই রাজীব দা হঠাৎ নিউজরুমে তার কী একটা জরুরি কাজ আছে বলে বেরিয়ে গেলেন। রাজীব দা প্রায়ই এমন করতেন; সত্যিই হয়তো তার জরুরি কাজ থাকত, আবার এটাও হতে পারে তিনি ইচ্ছে করেই এমন করতেন যাতে আমি তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পাই। আমার ধারণা, দ্বিতীয়টিই সত্যি।
যাহোক, সেদিন থেকেই তার সঙ্গে আমার সরাসরি কাজ শুরু। প্রথম আলাপেই বুঝলাম, বন্ধুদের কাছে পাওয়া তৌফিক ভাইয়ের চরিত্রচিত্রণের সঙ্গে বাস্তব মানুষটির মিল-অমিল দুটোই আছে। তার মধ্যে দৃঢ়তা ছিল, নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা ছিল, কাজের ব্যাপারে আপসহীনতাও ছিল—সেই সঙ্গে আমি দেখলাম কৌতূহলী, মনোযোগী এবং কোনো বিষয়কে বড় পরিসরে দেখার দৃষ্টিসম্পন্ন একজন মানুষকে। তখনও বইয়ের নাম ঠিক হয়নি, কিন্তু বইয়ের বিষয়ভাবনা ছিল পরিষ্কার। সেটা তিনি যথার্থভাবে ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের সূচনাতেও লিখেছিলেন। তিনি লিখেছেন: “…মুক্তিযুদ্ধ শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই নয়, শত বছরের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের প্রকাশ। স্বাধীনতার এই যুদ্ধকে আমরা সাধারণত ইতিহাসের একটি ‘সমাপ্ত অধ্যায়’ মনে করে থাকি। প্রকৃতপক্ষে এটি যে এক অন্তহীন যুদ্ধ, তা বারবার প্রমাণিত।” তিনি বলতেন, মুক্তিযুদ্ধ এত বিশাল একটি ক্যানভাস যে এর সামান্য অংশই এখন পর্যন্ত আমাদের সামনে এসেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ঘটনা, আত্মত্যাগ, প্রতিরোধ, গণহত্যা, নির্যাতন, বেঁচে থাকার গল্প। সেসব যতটা সম্ভব তুলে আনতে হবে, জানাতে হবে সবাইকে। বিশেষ করে তিনি চাইতেন তৃণমূলের মানুষের কথা উঠে আসুক। শুধু পরিচিত মুক্তিযোদ্ধা বা বড় রাজনৈতিক নেতাদের ইতিহাস নয়; যে কৃষক অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন, যে তরুণ সীমান্ত পেরিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, যে মা তার সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন, যে নারী পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, যে পরিবার একাত্তরে ঘরবাড়ি হারিয়েছিল—তাদের কথা যেন বইয়ের পাতায় জায়গা পায়।
বইয়ের তিনটি খণ্ডের পৃথক তিনটি প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়েছিল—২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে প্রথম, ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুরের ‘শেষ রণক্ষেত্র’ স্মরণে রেখে দ্বিতীয় এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে তৃতীয় খণ্ডের। প্রতিটিতেই তিনি গ্রামের সেই সব মুক্তিযোদ্ধাদের আমন্ত্রণ জানান, যাদের খোঁজ খুব কম মানুষই রাখেন, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে যাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এই জায়গাটিই আমার এবং আমাদের জন্য ছিল অনন্য।
আমরা তৌফিক ভাইয়ের নির্দেশনা মতো সেভাবেই কাজ শুরু করলাম। সেই কাজে সম্পাদনা পরিষদের অন্যতম সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষক-লেখক সালেক খোকনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার গবেষণা, মাঠপর্যায়ের জানা-বোঝা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রান্তিক ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান আমাদের কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছিল। সম্পাদনা সহযোগী ও সংকলক হিসেবে যুক্ত হলেন আজিজুল পারভেজ, শাহেদ কায়েস, রুমা মোদক, নবনীতা সাহা, অপু মেহেদী, আহমাদ শামীম, মারুফ বিল্লাহ তন্ময়, মাছুম কামাল ও পাভেল রহমান। তাদেরও ছিল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কাজের অভিজ্ঞতা এবং অনুসন্ধিৎসুতা। গ্রাফিক্সে ছিলেন নূরুল মোস্তফা জিনাত ও সজল কর্মকার। শেষ পর্যায়ে ছবি কিউরেটিংয়ে যুক্ত হন শাহাদাত পারভেজ। প্রচ্ছদ করে দেন শিল্পী আনিসুজ্জামান সোহেল। সবার পঠন-পাঠন এবং অভিজ্ঞতায় দৃশ্যমান হতে থাকে ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’-এর একেকটি অধ্যায়।
কাজের ভিতর দিয়ে, বাস্তবতার নিরীখে বইয়ের পরিকল্পনাতে কিছু পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে ভাবা হয়েছিল এক খণ্ডে বারোশ পৃষ্ঠার একটি বই হবে। কাজ করতে গিয়ে বোঝা গেল, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টি একটি মলাটে ধারণ করা বেশ কষ্টকর। উপকরণ বাড়ছে, ছবি বাড়ছে, লেখা বাড়ছে, নতুন নতুন তথ্য আসছে। আবার এত ঢাউশ বই পাঠকের জন্যও কতটা পাঠযোগ্য হবে—সেটাও বিবেচনায় নেওয়া হলো। সেই সঙ্গে সময়ের বিষয়টি তো ছিলই। শেষ পর্যন্ত বইটি রূপ নিয়েছিল তিন খণ্ডে, এক হাজার ৪৯৬ পৃষ্ঠায়। তৌফিক ভাই বললেন, “আমি চাই বইটা যেন শেলফে কেউ সাজিয়ে রাখতে না পারে, পাঠকের টেবিলেই যেন থাকে। ইচ্ছা-অনিচ্ছাতেও বইয়ের পাতা যেন উল্টাতে হয়।” কাজেই বইয়ের আকার কফি টেবিল বুকই থাকবে এবং সেটাই থাকল। তৌফিক ভাই যেন একটি ঘোরের মধ্যে টেবিলের ওপরে রাখা ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ দেখতে পাচ্ছিলেন।
ধীরে ধীরে আমরাও সেই ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম। এ যেন বইয়ের কাজের চেয়েও বেশি কিছু। আমরা বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো এক জায়গায় জড়ো করছিলাম। দিনের পর দিন পুরনো ছবি দেখা, লেখা সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, অধ্যায়বিন্যাস, সম্পাদনা, পুনঃসম্পাদনা, ছবির সূত্র খোঁজা, ক্যাপশন ঠিক করা—কাজের কোনো শেষ ছিল না। কখনো মনে হতো কাজ শেষ হবে না; আবার কোনো একটি দুর্লভ ছবি কিংবা কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ হাতে এলে মনে হতো, এই একটি উপাদানের জন্যই এত পরিশ্রম সার্থক। সবার কাজ শেষ হলে মধ্যরাতে বাসায় ফিরে শুরু হতো রাজীব দা আর আমার কাজ। ভোররাতে ঘুমিয়ে আবার ১১টায় অফিস। সে এক সময় গেছে। আর তৌফিক ভাই ছিলেন সেই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে। তিনি শুধু একটি বই প্রকাশ করতে চাননি; তিনি চেয়েছিলেন বইটি যেন সময়ের দলিল হয়ে ওঠে। তার কাছে নান্দনিকতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা। কোনো তথ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তিনি জানতে চাইতেন, কোনো লেখা অতিরিক্ত ব্যক্তিনির্ভর হয়ে গেলে সেটি নিয়েও কথা বলতেন। আর এভাবেই আমরা একেকটি খণ্ড শেষ করেছি।
কাজ করতে করতে তার আরেকটি দিকও আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছিল—তিনি যেমন বড় স্বপ্ন দেখতে জানতেন, তেমনি জানতেন অন্যকে কাজের স্বাধীনতা দিতে, সঙ্গে থেকে কাজটি এগিয়ে নিতে। একটি ছবি দেখে আমরা যখন শুধু তার ক্যাপশন ঠিক করছি, তিনি তখন ভাবছেন ছবিটির সঙ্গে যুক্ত ইতিহাসটি আর কীভাবে পাঠকের সামনে আনা যায়। এই বড় করে ভাবার ক্ষমতাটিই সম্ভবত তার সাংবাদিকতারও বড় শক্তি ছিল।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে নানা বাধা পেরিয়ে তিনি যে জায়গায় নিয়ে গিয়েছেন, সেটিও তো এক অর্থে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করারই গল্প। অনলাইন সাংবাদিকতাকে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দীর্ঘ পথের সঙ্গে তার নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’-এর কাজে তাকে আমি অন্য এক জায়গায় দেখেছি—একজন সম্পাদক হিসেবে শুধু নয়, একজন ইতিহাসসচেতন মানুষ হিসেবেও। মাঝে মাঝে কাজের চাপ এতটাই বেড়ে যেত যে মনে হতো, এই প্রকল্পটি বোধহয় সময়মতো শেষ করা যাবে না। তখন তার সঙ্গে কথা হয়েছে; তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট—সময়ের চাপ আছে, কিন্তু কাজের মানের সঙ্গে আপস করা যাবে না। এই দৃঢ়তা আমাদের জন্য নিশ্চয় চাপের ছিল; কিন্তু এখন পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই চাপটিই হয়তো কাজটিকে এত দূর নিয়ে গিয়েছিল। প্রায় পনেরোশ পৃষ্ঠার এই বিশাল সংকলনে শুধু ইতিহাসের ঘটনাই নেই; আছে স্মৃতি, আলোকচিত্র, মানুষের কথা, যুদ্ধের বহুমাত্রিকতা এবং একটি জাতির জন্মের দীর্ঘ ও রক্তাক্ত পথ।
আরেকটি বড় বিষয় হলো, এই কাজের মধ্য দিয়ে আমরা একটি দল হয়ে উঠেছিলাম। কেউ মধ্যরাত পর্যন্ত অফিসে থেকেছেন, কেউ বাড়িতে বসে লেখা তৈরি করেছেন, সম্পাদনা করেছেন। আবার কেউ ভারতভাগ, দাঙ্গা, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ—পুরনো দিনের ছবি খুঁজেছেন, তথ্য যাচাই করেছেন। লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ, সম্পাদনা, গ্রাফিক্সে পৃষ্ঠা সজ্জা—কত রকমের কাজ! একটি বইয়ের পেছনে যে কত মানুষের অদৃশ্য শ্রম থাকে, ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ তৈরি করতে গিয়ে সেটি খুব কাছ থেকে আরেকবার পরখ করেছি। সেই সঙ্গে আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করলে প্রতিকূলতার মধ্যেও যে কাজ করা সম্ভব, সেটাও খুব ভালোভাবে অনুভব করেছি। তাই তো কাজ শেষ হওয়ার পরও মনে হয়েছে, আমরা যেন কাজটি পুরোপুরি শেষ করতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল একটি ইতিহাসকে কয়েক খণ্ডের বইয়ে সম্পূর্ণ করা সম্ভবও নয়। তৌফিক ভাই নিজেও তা মনে করতেন; তিনি বলতেন, “আমরা এমন একটা কিছু করতে চাই, যা ভবিষ্যতে অনুসন্ধানের আরও দরজা খুলে দেবে।” তার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর সেই কথাটিই বারবার মনে পড়ছে।
‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’-এর একেকটি পৃষ্ঠা উল্টালে আমার চোখে শুধু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভেসে উঠবে না; ভেসে উঠবে সেই কয়েক মাসের রাতজাগা পরিশ্রম, অগণিত ফোন, অসংখ্য সংশোধন, শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত, পুরনো ছবি নিয়ে উত্তেজনা, একটি তথ্য নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা এবং কাজের মাঝখানে তৌফিক ভাইয়ের সেই মৃদু কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠ।
মনে পড়বে প্রথম দিনের সেই মানুষটিকেও, যাকে নিয়ে আমার খানিকটা ভয় ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই ভয় আর থাকেনি; সম্পর্কটা হয়ে উঠেছিল এক ধরনের শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার। খুব অল্প সময়ে কাউকে খুব গভীরভাবে চেনা যায় না, কিন্তু কখনো কখনো একটি কাজই মানুষকে চেনার জন্য যথেষ্ট হয়। ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ আমার কাছে তেমনই একটি কাজ।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতা নিয়ে অবশ্যই অনেকে লিখবেন, তার প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম নিয়ে আলোচনা হবে। তার পেশাগত জীবন, সাফল্য, বিতর্ক, অর্জন নানা দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়িত হবে। কিন্তু আমার স্মৃতিতে তিনি থাকবেন আরও ব্যক্তিগত এক পরিচয়ে—একজন মানুষ হিসেবে, যিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য একটি বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন; যিনি জানতেন কাজটি কঠিন, সময় কম, পথ সহজ নয়—তারপরও বলেছিলেন, “শুরু করতে হবে।”
‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ তাই আমার কাছে শুধু একটি বই নয়, এটি তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে কাটানো কয়েক মাসের স্মৃতিও। এটি আমাদের সম্মিলিত মেধা ও শ্রমের দলিল। এটি মুক্তিযুদ্ধের অগণিত অজানা মানুষের গল্পকে জায়গা দেওয়ার একটি প্রয়াস। আর ব্যক্তিগতভাবে এটি এমন এক মানুষের সঙ্গে আমার অল্প সময়ের পরিচয়ের স্মারক, যার সঙ্গে হয়তো আরও কাজের সুযোগ তৈরি হতো। সেটি আর হলো না; হলো না তার বাসায় গিয়ে করলা ভাজি দিয়ে সাদা ভাত খাওয়ার দাওয়াত রক্ষা করাও। কিছু অপূর্ণতা থাকুক।
সিরাজুল ইসলাম আবেদ: সাংবাদিক ও গবেষক।
