২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

তৌফিক ভাই: যে হাতটি মাথার ওপর ছিল

দুই মিনিটের বক্তব্যে বাক্য শেষ করতে না দেওয়া থেকে শুরু করে জীবনের নানা মোড়ে আস্থার আশ্রয় হয়ে থাকা—তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে নিয়ে সায়ন্তনী ত্বিষার স্মৃতিচারণ।

তৌফিক ভাই: যে হাতটি মাথার ওপর ছিল

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিশেষ লাইভ সম্প্রচারে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে সায়ন্তনী ত্বিষা।

সায়ন্তনী ত্বিষা সায়ন্তনী ত্বিষা

Published : 26 Oct 2026, 03:04 PM

Updated : 26 Oct 2026, 03:04 PM

বেশ কিছুদিন সময় নিলাম। ভেবেছিলাম কিছু লিখব না; কিন্তু অস্থির লাগে। লিখে ফেলতে পারলে মনে হয় একটু হালকা লাগবে।

আমার জীবনের প্রথম চাকরির ইন্টারভিউ নেন তৌফিক ভাই। বাংলাদেশে ডিজিটাল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তৌফিক ইমরোজ খালিদী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক। তিনি ২০১০-২০১১ সালের দিকে কিছুদিন ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সিইও এবং এডিটর ইন চিফ হিসেবেও কাজ করেছিলেন। ইন্টারভিউ বোর্ডে কঠিন কঠিন প্রশ্ন করে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন। একটি বিষয়ের ওপর দুই মিনিট কথা বলতে বলেছিলেন। আমি বলছিলাম, কিন্তু ঠিক দুই মিনিট হতেই থামিয়ে দিলেন, বাক্য শেষ করতে দিলেন না। পরে বুঝেছিলাম এটাই তার শিক্ষা: যা বলার আছে, সময়ের মধ্যে বল। এছাড়া আমার উচ্চারণ বেশ খারাপ এবং জড়ানো ছিল। ইন্টারভিউয়ের সময় বারবার আমাকে থামিয়ে পরখ করে নিচ্ছিলেন আসল উচ্চারণ জানি কী না। সে সময় আমার সঙ্গে যারা ট্রেইনি ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে ইনডিপেনডেন্ট টিভিতে জীবনের প্রথম চাকরি শুরু করে, তাদের সবার ইন্টারভিউই তৌফিক ভাইয়ের নেওয়া।

চাকরিটা হয়েছিল আমার; যে কারণে পরবর্তীতে তৌফিক ভাইয়ের অনেকগুলো ওয়ার্কশপ আর ট্রেনিং সেশনে অংশ নিতে পেরেছিলাম। সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতা, স্ক্রিপ্ট লেখার কৌশল, ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার ভাষা, ক্যামেরার ফ্রেমিং, এডিটিং—এসব বিষয় নিয়ে ছিল তার ওয়ার্কশপগুলো। খুবই কঠোর ধরনের মানুষ মনে হতো তাকে। হালকা হাসি-ঠাট্টার মধ্যে একদম ছিলেন না। কাজ নিয়েই থাকতেন সারাক্ষণ; আর নৈতিকভাবে সাংবাদিকতা করার জন্য আমাদের উৎসাহ দিতেন। এতটাই মুগ্ধ ছিলাম তার প্রতি যে, উনি যখন ইনডিপেনডেন্ট টিভি ছেড়ে দিলেন, তখন ঠিক করেছিলাম আমিও চাকরি ছেড়ে দেব। পরে বাবার উপদেশে চাকরিটা ছাড়িনি।

যেদিন তৌফিক ভাই ইনডিপেনডেন্ট টিভি ছেড়ে যাচ্ছিলেন, সেদিন তাকে দেখে বুঝতে পারছিলাম তিনি মনে মনে কষ্ট পাচ্ছেন। যাওয়ার আগে আমার মাথায় হাত রেখে বিদায় নিলেন। সেই হাতটাই এরপরের ১৫ বছর অদৃশ্যভাবে আমার মাথার ওপর ছিল।

২ অক্টোবর এক কনসার্টের মাঝখানে হঠাৎ সৌমিকের টেক্সট এলো। কোনো কিছুর মধ্যে থাকলে আমি সাধারণত পরিবারের মানুষ ছাড়া কারও টেক্সট বা ফোন রিসিভ করি না। মাত্র চারটা শব্দ ছিল ওই টেক্সটে: “তৌফিক স্যার মারা গেছেন”। বিষয়টা এতটাই আচমকা এবং দুর্বোধ্য ছিল আমার জন্য যে, প্রথমে মাথায় এলো, তৌফিক স্যার কে? তারপর মাথায় এলো সৌমিক ভুলে টেক্সট করেছে আমাকে। তারপর মাথায় এলো সৌমিক মজা করছে। তারপর পাগলের মতো কিছুক্ষণ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাইট ঘাঁটলাম; কিছু পেলাম না। অবশেষে সৌমিককে লিখলাম, “কীভাবে?”

সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর এলো, “হঠাৎ করেই হলো। কীভাবে, জানি না। লন্ডনে ছিলেন। শুনলাম, ওনার দরজা ভেঙে ঢুকে দেখা যায়, অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো, কিন্তু কিছু করার ছিল না। আপাতত কাউকে বোলো না। আমরা স্টেটমেন্ট দেব।” এবার ধীরে ধীরে মাথা কাজ করা শুরু করল। কিছুক্ষণ পর দেখলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম স্টেটমেন্ট দিল তৌফিক ভাইয়ের মৃত্যুর খবর জানিয়ে।

শুধু আমার প্রথম চাকরি নয়, সৌমিকের প্রথম চাকরির ইন্টারভিউও তৌফিক ভাই নিয়েছিলেন এবং আজ পর্যন্ত সৌমিক সেখানেই কাজ করে যাচ্ছে। সৌমিক যখন একসময় বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল এবং ওর একটা চাকরি দরকার ছিল, আমি তৌফিক ভাইকে ফোন করেছিলাম। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারভিউয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। পরে সৌমিক আমাকে বলেছিল, ইন্টারভিউতে তৌফিক ভাই আমার কথা জিজ্ঞেস করেছেন; জানতে চেয়েছেন আমি কেমন আছি, কী করছি। এত মানুষের ভিড়ে, এত ব্যস্ততার মাঝেও আমার কথা আলাদা করে মনে রেখেছিলেন তিনি।

আমার আর তৌফিক ভাইয়ের দেখা হয়েছে বহুবার, বহু অনুষ্ঠানে। সবসময় খুব আদর করে আপন ভাবে কথা বলতেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় জোর করে ধরে নিয়ে গেলেন বিডিনিউজের ইলেকশন লাইভ হোস্ট করার জন্য। এরপরেও বহুবার বলেছেন বিডিনিউজে প্রোগ্রাম হোস্ট করার জন্য। আমি নানা ছলে পাশ কাটিয়ে গেছি। কিন্তু আমি সবসময় জানতাম, আমার যদি কখনও চাকরি না থাকে, তৌফিক ভাইকে বললেই কিছু একটা ম্যানেজ হয়ে যাবে।

স্পেন থেকে ফেরার পর তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করি আমি, তার বাসায়। যথারীতি কী করব, পরবর্তী পরিকল্পনা কী—এসব নিয়েই কথা হয়। উনি বললেন বিডিনিউজে যোগ দিতে; কিন্তু আমি যোগ দিলাম না, কারণ ততদিনে আমি ইইউ বিজনেস স্কুলে পড়ানো শুরু করে দিয়েছি। শেষবার দেখলাম উনি খুবই স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে গেছেন। আমাকে বাসায় বানানো স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে দিলেন। কীভাবে পুষ্টিযুক্ত খাবার বেছে বেছে খেতে হবে, তা নিয়ে অনেক উপদেশ দিলেন। দেখে মনে হলো, লোকটা অনেকদিন বাঁচবেন। ফিরে আসার সময় হাতে কিছু বই ধরিয়ে দিয়ে পহেলা বৈশাখের দাওয়াত দিলেন। সেই দাওয়াতেও যাওয়া হয়নি।

জীবন খুবই অদ্ভুত। সেই শেষ দেখার পর উনি এক বছরও টিকলেন না। হঠাৎই মাথার ওপর থেকে অদৃশ্য হাতটা সরে গেল। কদিন ধরে খালি মনে পড়ছে তৌফিক ভাইকে নিয়ে চাকরি জীবনের শুরুর দিককার মুগ্ধতার অনুভূতিগুলো। সময় থাকতে কিছুই শিখতে পারিনি ওনার কাছ থেকে। কত কিছু শেখার ছিল, কিন্তু এখন আর সময় বাকি নেই।

সায়ন্তনী ত্বিষা: শিক্ষক, ইইউ বিজনেস স্কুল।