তৌফিক ভাই, আপনার দেওয়া সাহসেই লিখছি এই বিদায়গাথা
একই শহরের আকাশে-বাতাসে শেষবারের মতো একনজর দেখার আকুল চেষ্টা, অথচ অসুস্থতা ও চিকিৎসার যাঁতাকলে হাত-পা বাঁধা। তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে হারানোর বেদনা ও আক্ষেপ নিয়ে বিদিশা এরশাদের স্মৃতিকথা।
কিছু মৃত্যুর বার্তা মানুষের কান্নাকেও থামিয়ে দেয়। স্তব্ধ করে দেয়। কেবল ভেতরে প্রগাঢ় শূন্যতা জমে ওঠে। কান্না আসে অনেক পরে, যখন বুকের ভেতরে ধীরে ধীরে কী হারিয়ে গেছে তা অনুভূত হয়।
তৌফিক ভাইয়ের হুট করে চলে যাওয়ার খবরটা যখন প্রথম কানে এলো, মুহূর্তে যেন পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। বাংলাদেশের ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের ভিত্তিপ্রস্তর যিনি গড়েছিলেন, অনলাইন সাংবাদিকতার সেই পথিকৃৎ—বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী লন্ডনের এক হাসপাতালে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে এভাবে নিঃশব্দে বিদায় নেবেন, তা আমার কল্পনারও অতীত ছিল। মন কোনোভাবেই এই নির্মম সত্যিটা মানতে পারছিল না। যে মানুষটি প্রতিটা মুহূর্তে জীবনের স্পন্দনে, সাহসে ও দীপ্তিতে ছিলেন উদ্ভাসিত—তিনি কীভাবে এত নিভৃতে, এমন অকালে আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে পারেন?
গত কয়েক সপ্তাহ আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময় গেছে। একটি হয়রানিমূলক মামলায় প্রায় দুই সপ্তাহের বেশি আমাকে অবর্ণনীয় এক পরিবেশে থাকতে হয়েছে। সেই দিনগুলোর কথা ভাষায় বলা যায় না। মুক্তি পাওয়ার পর শরীর আর মন, দুটোই ভেঙে পড়েছিল। তাই প্রিয় সন্তানদের কাছে লন্ডনে গেলাম, শারীরিক সুস্থতা ফিরে পেতে আর তাদের সান্নিধ্যে একটু শ্বাস নিতে।
ঠিক সেই শহরেই, চিকিৎসাধীন অবস্থায়, আমি পেলাম তৌফিক ভাইয়ের মৃত্যুর খবর।
একই শহর। একই আকাশের নিচে। হয়তো কয়েক মাইলের দূরত্ব। অথচ আমার হাত-পা বাঁধা ছিল। চিকিৎসার কঠিন যাঁতাকলে আটকে ছিল আমার শরীর, আটকে ছিল আমার জীবন। যে মানুষটি আমার লেখক-জীবনের প্রথম ভরসা, তাকে শেষবার একবার চোখের দেখা দেখতে যেতে পারলাম না। এর চেয়ে বড় অসহায়তা আর কী হতে পারে?
আমি তাকে দেখলাম সংবাদমাধ্যমে। কফিনে ঢাকা তার নিথর দেহ দেশে ফিরে যাচ্ছে। যাবেন তার প্রিয় কার্যালয়ে, যে প্রতিষ্ঠান তিনি নিজের হাতে গড়েছিলেন। অথচ এবারই প্রথম তিনি সেখানে নির্বাক হয়ে যাবেন। যে মানুষটির কণ্ঠ ছিল ওই অফিসের প্রাণ, আজ তার মুখ থেকে উচ্চারিত হবে না কোনো দিকনির্দেশনা। তার প্রিয় টিমের জন্য থাকবে না কোনো নির্দেশ, কোনো পরামর্শ, কোনো আশ্বাসের বাক্য। যে চেয়ারে বসে তিনি প্রতিদিন একটা সময়কে পথ দেখিয়েছেন, সেই চেয়ার আজ শূন্য। কত প্রশ্ন নিয়ে তার টিম আজ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবে, আর উত্তর দেওয়ার মানুষটি শুয়ে থাকবেন নিস্তব্ধ হয়ে।
আর আমি, হাজার মাইল দূরের এক হাসপাতালের ঘরে বসে, শুধু দোয়া করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারিনি।
এই ‘পারিনি’ কথাটা আমাকে ভেতরে ভেতরে পোড়াচ্ছে। আর একবার যদি দেখা হতো! আর একবার যদি তার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারতাম, “ভাইয়া, আপনি আমার জন্য কী ছিলেন।” সেই কথাটা আমার বুকের ভেতরেই রয়ে গেল, চিরকালের জন্য অকথিত।
প্রায় একুশ বছর আগে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। বেবী মওদুদ আপা আমাকে প্রথম তৌফিক ভাইয়ের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন জানতাম না, এই পরিচয় আমার জীবনের গতিপথ বদলে দেবে।
এরপর একদিন লেখক রাজু আলাউদ্দিন ভাই আমাকে লেখার প্রস্তাব দিলেন। আমি ঘাবড়ে গেলাম। সবাইকে একই কথা বলতাম, "আমাকে দিয়ে লেখালেখি হবে না।" বাংলায় লেখার অভ্যাস ছিল না, আমার লেখা হতো ইংরেজিতে। নিজের কলমটাকে আমার বড় ক্ষুদ্র মনে হতো।
ফোনে তৌফিক ভাইকে সে কথাই বললাম। তিনি কোমল গলায় বললেন, "বাংলা লিখতে হবে না, ইংরেজিতেই লেখো।" ওই এক বাক্যে আমার ভয়ের অর্ধেকটা গলে গিয়েছিল। পরে লেখক মাসুদ কামাল ভাই লেখায় আমাকে সাহায্য করেছেন, তার কাছেও আমি ঋণী। কিন্তু শুরুর সেই সাহসটুকু, যা ছাড়া কিছুই শুরু হতো না, তা এসেছিল তৌফিক ভাইয়ের কাছ থেকেই।
আমি যতবার বলতাম, লেখা আমাকে দিয়ে হবে না, তিনি ততবার সত্যিই অবাক হয়ে যেতেন। বিস্ময় নিয়ে বলতেন, "এটা অন্তত আমি বিশ্বাস করি না যে কবি আবু বকর সিদ্দিকের মেয়ে লিখতে পারে না!"
কী আশ্চর্য! যে বিশ্বাস আমি নিজের মধ্যে খুঁজে পাইনি, তিনি তা আমার ওপর অনায়াসে রেখে দিয়েছিলেন। তার অনুপ্রেরণায় ছিল ভালোবাসা, সহমর্মিতা আর অবিচল আস্থা। একজন ভীরু, অনিশ্চিত লেখকের লেখা তিনি যত্ন করে ছেপেছেন। সেই ঋণ কখনো শোধ হয় না।
একটা শীতের সন্ধ্যার কথা আজও আমার চোখে ভাসে। রেডিসন হোটেলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জন্মদিনের অনুষ্ঠান। রাজু ভাই নিজে আমাকে দাওয়াত করেছিলেন। আমি হালকা সাজে, ভয়ে ভয়ে গিয়ে ঢুকলাম। চারপাশে বড় বড় লেখক, কলামনিস্ট, কন্ট্রিবিউটর। মনে হচ্ছিল, এই ভিড়ে আমি আসলে কেউ নই। তৌফিক ভাইকে দেখে ফুলের তোড়াটা তার হাতে তুলে দিলাম। তিনি বললেন, "তুমি এসেছ, আমি খুব খুশি হয়েছি। আমার সামনেই বসো।" রাজু ভাই স্টেজের সামনের টেবিলে আমার জায়গা করে দিলেন।
তারপর তারা একে একে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন সমাজের বিশিষ্ট মানুষদের সঙ্গে। বললেন, "ইনি বিদিশা। কবি আবুবকর সিদ্দিকের মেয়ে। আমাদের এখানে লেখেন।"
আমাদের এখানে লেখেন! এই কয়েকটা শব্দ আমার ভেতরটা কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আমার চোখ ভিজে এসেছিল। আজ এত বছর পরে বুঝি, ওই পরিচয়টাই আমার কাছে সবচেয়ে বড়। তৌফিক ভাইয়ের লেখক।
তার গভীর ব্যক্তিত্ব আমাকে সবচেয়ে টানত। পোশাক-আশাকে ছিলেন রুচিশীল, পরিপাটি। মানুষের সঙ্গে একটা মার্জিত দূরত্ব রাখতেন, কিন্তু সেই দূরত্ব কখনো শীতলতা ছিল না। তার দরাজ, গুরুগম্ভীর কণ্ঠে যখন কথা বলতেন, অন্যজন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতেন। আজ স্মৃতি হাতড়ে দেখছি, কত অসংখ্য ফোনালাপ জমা হয়ে আছে। তখন ভাবিনি, সেগুলো একদিন এত দামি হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় এমন ব্যক্তিত্ব বিরল। তিনি শুধু একটি সংবাদমাধ্যম গড়েননি, একটা সময়কে গড়েছেন। অনলাইন সাংবাদিকতা যখন এ দেশে প্রায় অচেনা, তিনি তখন পথ কেটেছেন। তার শূন্যতা আমাদের সাম্প্রতিক সময়কে দীর্ঘদিন ভোগাবে।
তৌফিক ভাই, আপনি বলতেন, আপনি বিশ্বাস করেন না যে আমি লিখতে পারি না। আজ আমি লিখছি। কিন্তু এমন একটা লেখা যে লিখতে হবে, তা কোনোদিন ভাবিনি। এই লেখার প্রতিটি শব্দ আপনারই দেওয়া সাহস, আপনারই রেখে যাওয়া বিশ্বাস। আপনাকে শেষবার দেখতে না পারার কষ্ট নিয়ে আমি বেঁচে থাকব। আর যতদিন লিখব, আপনার সেই কথাটা সঙ্গে নিয়ে লিখব।
দূর থেকে বসে দোয়া করা ছাড়া আমার আর কিছুই ছিল না। তাই আজ সেই দোয়াই করছি: শান্তিতে ঘুমান, তৌফিক ভাই।
আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আপনার পরিবার ও স্বজনদের এই অপূরণীয় ক্ষতি সইবার শক্তি দিন। আমিন।
বিদিশা এরশাদ: মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ।
