Published : 18 Sep 2026, 01:43 AM
কক্সবাজারের টেকনাফে সৈয়দ আমিনের ঠিকানা ২২ নম্বর রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প; ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার পর পাহাড়ঘেঁষে গড়ে ওঠা ওই ক্যাম্পের এক খুপড়ি ঘরে সাতজনের পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি।
জরুরি মানবিক সহায়তায় কোনোমতে সংসার চলে গেলেও পানির চিন্তা তাকে বেশি ভাবায়। বৃষ্টির মৌসুমে পরিবারের প্রত্যেকের জন্য দিনে সর্বোচ্চ ২০ লিটার পানি পান তিনি।
রান্না, গোসল আর শৌচকর্ম–সব কিছু সারতে হয় ওই পানিতে। ফলে পানি খরচ করতে হয় মেপে মেপে।
শুকনো মৌসুমে ওই পরিমাণ পানিও তারা পান না। সরবরাহ নেমে আসে ৫ থেকে ১৫ লিটারে।
“তখন রান্না হলে গোসল হয় না, গোসল হলে রান্না হয় না। বেশিরভাগ সময় গোসলই করতে পারি না আমরা,” বলছিলেন সৈয়দ আমিন।
২২ নম্বর ক্যাম্পে থাকা প্রায় ২৫ হাজার রোহিঙ্গার জন্য মেপে মেপে সরবরাহ করা ওই পানির পুরোটাই আসে পাশ্ববর্তী একটা খাল থেকে। শুকনো মৌসুমে সেই খালেও পানি আনতে হয় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের পাহাড়ি ছড়া থেকে।
একটিমাত্র সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ঘুরে সেই পানি যায় রোহিঙ্গাদের ঘরে, যা দিয়ে কেবল অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন মেটাতে পারেন তারা।
৯ সেপ্টেম্বর ক্যাম্প-২২ এর বাজার এলাকার একটি ট্যাপস্ট্যান্ড থেকে পাঁচ লিটারি বোতলে পানি ভরার সময় কথা হয় সৈয়দ আমিনের সঙ্গে। সেখান থেকে পাহাড়ি রাস্তায় ৭-৮ মিনিট হেঁটে ঘরে পানি নিয়ে যান তিনি।
প্রতিদিন সকাল-দুপুর দুবার পানি ছাড়া হয়। ওইদিন বেলা ২টা ৪০ মিনিটে পাম্প চালুর পর ভাদ্রের কড়া রোদের মধ্যে বোতলে পানি ভরছিলেন সৈয়দ আমিন। সঙ্গে এনেছিলেন কয়েকটি কলসি আর বালতি।
ক্যাম্পের বাজার এলাকা থেকে কিছুটা দূরে আরেকটা ট্যাপস্ট্যান্ড থেকে পানি সংগ্রহ করতে দেখা যায় ২৮ বছর বয়সি খালেদাকে। তার সঙ্গে ছিল এক শিশু সন্তান।
তিনি বলেন, এই পানি দিয়েই ৬ জনের পরিবারের রান্না, পান করা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ সারতে হয় তাদের। শুকনো মৌসুমে সরবরাহ অনেক কমে আসে। যা পান, তাই দিয়ে চলতে হয়।
ভূমির পাথুরে গঠনের কারণে গভীর নলকূপ বসানোর জটিলতায় পুরো টেকনাফ এলাকাতেই পানির সংকট রয়েছে।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলোর তথ্য বলছে, নব্বইয়ের দশক থেকেই মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের বসতি আছে টেকনাফে। অগভীর নলকূপ আর খালের পানি দিয়ে কোনোমতে প্রয়োজন মিটিয়ে যাচ্ছিলেন তারা।
এমন সংকটের মধ্যে ২০১৭ সালে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে কক্সবাজারে আসে। হাতে গোনা অগভীর নলকূপ আর খালের পানির ওপর তখন বড় রকমের চাপ পড়ে।
সেই সংকট কাটাতে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউনিসেফের অনুদানে ২২ নম্বর ক্যাম্পে সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট তৈরি করে দেয় অক্সফ্যাম। সহযোগী হিসাবে ওই প্ল্যান্ট নির্মাণ ও পরিচালনা করছে দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে)।
কিন্তু তাতে যে সংকট পুরো কাটেনি, সে কথা বললেন বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান।
তিনি বলেন, পুরো উখিয়া ও টেকনাফে পানির সংকট রয়েছে। কিন্তু টেকনাফে সেই সংকট খুবই প্রকট।
“টেকনাফে যেহেতু গ্রাউন্ড ওয়াটার সাফিশিয়েন্ট নাই, এটা রকি গ্রাউন্ড, ফলে সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট করেই কিন্তু সরবরাহ করতে হচ্ছে। শীতকালে এই সমস্যা এত প্রকট হয় যে আমাদেরকে পানি রেশনিং করতে হয়, প্রতিদিন জনপ্রতি পাঁচ লিটার করে দিতে হয়।”
পানি নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার কথা তুলে ধরে মিজানুর রহমান বলেন, ২০১৭ সালে লাখ লাখ রোহিঙ্গা এসে বসবাস শুরু করার পর হাজার হাজার টিউবওয়েল বসানো হয়েছে। ফলে ভুগর্ভস্থ পানির পরিমাণ একেবারে কমে গেছে।
“আশপাশে যে কৃষকরা আছেন, শীতকালে তারা সেচের জন্য পানি পাচ্ছেন না। ফলে এটাও একটা সামাজিক টেনশন তৈরি করছে, কারণ সাধারণ মানুষ আর কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
‘পানির কষ্টে এই গ্রামে কেউ মেয়ে বিয়ে দিত না’
উনচিপ্রাং এলাকার রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে টেকনাফের হোয়াইকং ইউনিয়নের কানজর পাড়ায় স্থানীয় বাঙালি পরিবারের বসতি।
পাহাড়ের প্রান্তে কয়েকটি পরিবারের বাস আর বাকিদের ঘর পাহাড়ের কোল-ঘেঁষে। পাহাড় পেরিয়ে দেড় দুই কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনা লাগত তাদের।
এখন অক্সফ্যামের উদ্যোগে সমতলে থাকা এক বাড়ির উঠানে বসেছে সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্প; সেখান থেকে টানা পাইপে পানির চাহিদা মেটাচ্ছেন প্রায় সাড়ে চারশ বাসিন্দা।
নিজেদের এক সময়ের কষ্টের বর্ণনা দিয়ে ওই গ্রামের ৪৫ বছর বয়সি সেনোয়ারা বেগম বললেন, আগে এখান থেকে দেড়-দুই কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হত। গ্রামের মেয়েরা সূর্য ওঠার আগে দলবেঁধে পানি আনতে যেত।
“নারীদের হয়রানির ঘটনাও ছিল প্রায় দিনের ঘটনা। কষ্টের কোনো শেষ ছিল না। পানির এত কষ্ট ছিল যে এই গ্রামে মানুষ মেয়েও দিত না!”
পাম্প বসানোর পর এখন পাইপলাইনে পানি যায় দূর পাহাড়েও। সামাজিক ব্যবস্থাপনায় ওই পাম্প পরিচালনা করেন গ্রামবাসী।
পানির চাহিদা মেটানোর জন্য টেকনাফে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) থেকে বড় সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট তৈরি উদ্যোগ নেওয়ার কথা বললেন শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান।
তিনি বলেন, ডিপিএইচই পাইপলাইনের মাধ্যমে টেকনাফে পানি সরবরাহের প্রকল্প নিয়েছে। হয়ত আরো দুই-তিন বছর লাগবে এটা চালু হতে। গৃহস্থালীর ব্যবহারের জন্য এটা হবে দেশে এ ধরনের সবচেয়ে বড় প্রকল্প।
যেভাবে পানি পায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প
খাল থেকে পানি সংগ্রহ এবং ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে শোধন করে রোহিঙ্গাদের কাছে কীভাবে পৌঁছানো হয়, তার পুরো প্রক্রিয়া জানা গেল ডিএসকে-ইউনিসেফ ওয়াশ প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী ফজলুল করিমের কাছে।
তিনি বলেন, এ এলাকায় ২০-৩০ ফুট নিচে গেলেই পাথুরে মাটি পাওয়া যায়। ফলে নলকূপ বসালেও পানি পাওয়া যায় খুবই কম।
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের ওয়াটার, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) সেক্টর স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, প্রতিদিন যদি জনপ্রতি ২০ লিটার পানি দিতে হয়, তাহলে ২২ নম্বর ক্যাম্পে প্রতিদিন পানির চাহিদা হয় পাঁচ লাখ লিটার।
সেই প্রেক্ষাপটে সাফরেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টটি স্থাপনের কথা তুলে ধরে ফজলুল করিম বলেন, “এখানেও চ্যালেঞ্জ ছিল, কাছাকাছি খালের যে উৎস আছে, সেখানে সর্বোচ্চ ডিসেম্বর পর্যন্ত পানি পাই। এরপর খাল শুকিয়ে যায়। কিছু পানি আশপাশের কৃষকদের জন্যও রেখে দিতে হয়।
“সে কারণে পাঁচ কিলোমিটার দূরের মির্জা ছড়া থেকে পাইপলাইন বসানো হয়। ওই জায়গায় কিছু কৃষক চাষাবাদ করে আর ডিএসকে বা অক্সফ্যামের কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরা যাওয়া আসা করে। ডিসেম্বর থেকে চার থেকে পাঁচ মাস মির্জা ছড়া থেকে পানি আনা হয়।”
পানি পরিশোধনের প্রক্রিয়া তুলে ধরে তিনি বলেন, “খালের পানি খুবই ঘোলা থাকে। এগুলোকে প্রথমে প্রাইমারি সেডিমেন্টশনে তিন ঘণ্টা রেখে ফিটকারি দিয়ে অ্যালাম কোয়াগুলেশন করি, তিন ঘণ্টা পরে এটা সেটল হয়ে যখন টার্পিডিটি-৫ এ চলে আসে, তখন আমরা সেকেন্ডারি সেডিমেন্টশনে নিয়ে যাই।
“ঘোলাটে ভাব কমার পরে সেকেন্ডারি ট্যাংকে নিয়ে যাই। সেখানে ক্লোরিন দিয়ে জীবাণু দূর করা হয়। এরপর চার ব্লকে চারটি ডিসট্রিবিউশন ট্যাংকে নেওয়া হয় পানি। এসব ট্যাংকের ক্যাপাসিটি ৯৫ হাজার লিটার করে।”
সকাল-বিকাল দুইবার পানি দেওয়ার কথা তুলে ধরে ফজলুল করিম বলেন, সকালে ৭টা থেকে এবং দুপুরে ২টা ৪০ মিনিট থেকে ৫টা পর্যন্ত পানি ছাড়া হয়।
ডিসট্রিবিউশন ট্যাংকের অধীনে ১০৭টা ট্যাপস্ট্যান্ড আছে। সেখান থেকে ২৫ হাজার মানুষ প্রতিদিন ২০ লিটার করে পানি পায়।
এর বাইরে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য তিনটি ট্যাপস্ট্যান্ড রাখা হয়েছে। সেখানে প্রায় সাতশ জন ক্যাম্পের প্ল্যান্ট থেকে পানি পেয়ে থাকেন।
বর্ষা মৌসুমে সময় অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি দেওয়া গেলেও শুকনো মৌসুমে জটিলতার মুখে পড়ার কথা তুলে ধরে ফজলুল করিম বলেন, “একটা চ্যালেঞ্জ হয়, তখন আমরা জনপ্রতি ২০ লিটার দিতে পারি না। যেহেতু খালগুলো শুকিয়ে যায়, তখন ১৫ লিটারে নেমে আসে।
“তবে, ওয়াশ সেক্টর থেকে বলা আছে, মিনিমাম ১০ লিটার নিশ্চিত করতে হবে। আমাদেরকে এখনও ১৫ লিটার পর্যন্ত নামতে হয়েছে। আমাদের বলা হয়েছে, ১০ লিটারের নিচে নামলে ট্রাকে করে পানি নিয়ে যেতে হবে। এটা ২০১৮-২০১৯ সালে করা হয়েছিল। ২০২০ সালের পরে আর করতে হয়নি।”
শুষ্ক মওসুমে ঝিরির পানি ব্যবহার ও পরিশোধন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার কথা তুলে ধরে ফজলুল করিম বলেন, “ঝিরির অল্প অল্প পানি পাম্প করে ড্যামে নিয়ে আসি। এখন আমরা পানিটা ব্যাকওয়াশ করার পরে ফেলে দিচ্ছি। খরা মৌসুমে সেটা ফেলে দিই না। ব্যাকওয়াশ গ্রে ওয়াটার ব্যবহার করার জন্য একটা প্রযুক্তি করা হয়েছে।
“আমরা যদি ৩০ হাজার লিটার ওয়েস্টওয়াটার ফেলি, সেখান থেকে নতুন করে ২৫ হাজার লিটার খাওয়ার পানি আমরা সংগ্রহ করতে পারি।”
প্ল্যান্টের পরিসর ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে পানি তোলার প্রাইমারি সেডিমেন্টশন ট্যাংক রয়েছে ছয়টি। প্রতিটির ৯৫ হাজার লিটার করে ক্যাপাসিটি। চার পাহাড়ে চারটা বিতরণ ট্যাংকেও পানি ধরে ৯৫ লিটার। প্ল্যান্ট থেকে সর্বোচ্চ তিন কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত পানি যায়।