চা কি প্রতিদিনের পানির চাহিদা মেটায়?
চায়ের চাইতে চা’তে মেশানো উপাদান বেশি ক্ষতিকর হতে পারে।
পানিশূন্যতা থেকে হতে পারে বুকে ব্যথাসকালে ঘুম থেকে উঠে, বিকেলে বা কাজের ফাঁকে চায়ে চুমুক দেওয়া আর গরমের দিনে আইস টি পান করা সাধারণ পছন্দের মধ্যেই পড়ে।
তবে পানীয় হলেও চা কি শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ করে? বিশেষ করে চায়ে ক্যাফিন থাকায় অনেকে ধারণা করেন, এটি বরং শরীর থেকে পানি বের করে দিতে পারে।
তবে সাধারণ পরিমাণে চা পান করলে, এর বেশির ভাগ তরলই শরীরের পানির চাহিদা পূরণে সাহায্য করতে পারে।
মার্কিন পুষ্টিবিদ অ্যামি শাপিরো, রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “চা সাধারণভাবে শরীরকে পানিশূন্য করে না।”
তার কথায়, “ক্যাফিন প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়ায়। চায়ে ক্যাফিন আছে। তবে সাধারণ পরিমাণে চা পান করলে এতে শরীরের পানির ঘাটতি হয় না।”
চায়ের তরল কি শরীরে পানির মতোই কাজ করে?
চায়ের বড় একটি অংশই পানি। ফলে এক কাপ চা পান করলে শরীরে যে তরল প্রবেশ করে, এর একটি বড় অংশই শরীরের পানির চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়।
ক্যাফিনযুক্ত চা পান করলেই শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে গিয়ে পানিশূন্যতা তৈরি হবে— এমন ধারণা পুরানো গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল।
তাই এক কাপ চাকেও প্রতিদিনের তরল গ্রহণের হিসাবের মধ্যে রাখা যায়।
তবে সব চা একই রকম নয়। কোন চায়ে কতটা ক্যাফিন রয়েছে, এর ওপর কিছুটা পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
অ্যামি বলেন, “সাধারণ চায়ের তুলনায় কম ক্যাফিন যুক্ত বা বিহীন চা পান করলে পানির দিক থেকে আরও সুবিধা পাওয়া যায়।”
কোন চায়ে ক্যাফিন বেশি?
চায়ের ধরন অনুযায়ী ক্যাফিনের পরিমাণ আলাদা হয়। কালো চায়ে সাধারণত তুলনামূলক বেশি ক্যাফিন থাকে। এক কাপ কালো চায়ে প্রায় ৪০ থেকে ৭০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফিন থাকতে পারে।
গ্রিন টি ও সাদা চায়ে এর পরিমাণ সাধারণত কম, প্রায় ২০ থেকে ৪৫ মিলিগ্রামের মধ্যে হতে পারে।
অন্যদিকে ক্যামোমাইল, পুদিনা ও রুইবসের মতো ভেষজ চায়ে স্বাভাবিকভাবেই ক্যাফিন থাকে না।
ফলে ক্যাফিনের পরিমাণ কমাতে চাইলে, এ ধরনের চা ভালো বিকল্প হতে পারে। তবে পার্থক্য খুব বেশি নয়।
সাধারণ পরিমাণে ক্যাফিনযুক্ত চা পান করলেও, দেহের পানির চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখে। তাই শুধু চায়ে ক্যাফিন আছে বলে সেটিকে পানি গ্রহণের হিসাব থেকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
দৈনিক পানির হিসাবেও কি চা ধরা যাবে?
চা অবশ্যই তরল গ্রহণের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। শুধু পানি নয়, বিভিন্ন পানীয় এবং কিছু খাবারের মধ্যেও পানি থাকে।
অ্যামি বলেন, “যে কারণে দিনে কতটা তরল গ্রহণ করছেন, সেই হিসাব করার সময় চা-ও অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।”
তার মানে এই নয় যে, পানি বাদ দিয়ে শুধু চা পান করলেই শরীরের সব পানির চাহিদা পূরণ হয়ে যাবে। বিশুদ্ধ পানি শরীরের জন্য সহজ ও সরাসরি পানীয়। তাই নিয়মিত পানি পানের অভ্যাস জরুরি।
বিশেষ করে প্রচণ্ড গরমে, শরীরচর্চার সময় বা বেশি ঘাম হলে শুধু চায়ের ওপর নির্ভর না করে, পর্যাপ্ত পানি পান করা প্রয়োজন।
শরীরের পানির চাহিদা বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়া ও ব্যক্তিগত অবস্থার ওপরও নির্ভর করে।
আসল সমস্যা হতে পারে চায়ে মেশানো উপকরণে
চা নিজে যতটা সমস্যা নয়, অনেক সময় চায়ের সঙ্গে যোগ করা অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি উপাদান বা ঘন দুধই পানীয়টিকে অস্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারে।
অ্যামি শাপিরো বলেন, “কিছু ঠান্ডা চা ও চায়ের মিশ্র পানীয়তে কোমল পানীয়ের মতোই বেশি চিনি থাকতে পারে। তাই নিয়মিত চা পান করতে চাইলে বাড়িতে তৈরি চা তুলনামূলক ভালো বিকল্প হতে পারে। এতে নিজের পছন্দ অনুযায়ী চিনি কম রাখা সম্ভব।”
চায়ের সঙ্গে দুধ বা দুগ্ধজাত উপাদান যোগ করার ক্ষেত্রেও পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। অল্প পরিমাণে এসব উপাদান ব্যবহার সাধারণত বড় সমস্যা নয়। তবে সারাদিনে বারবার মিষ্টি দুধ বা সুগন্ধযুক্ত মিষ্টি উপাদান যোগ করলে, মোট চিনি ও ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
দিনে কতটা ক্যাফিন গ্রহণ করা হচ্ছে?
চা পান করার ক্ষেত্রে শুধু পানির পরিমাণ নয়, ক্যাফিনের মোট পরিমাণের দিকেও নজর রাখা দরকার।
দিনে একাধিক কাপ চা পান করলে বিভিন্ন কাপের ক্যাফিন যোগ হয়ে মোট পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হতে পারে।
সাধারণভাবে দিনে মোট ৪০০ মিলিগ্রামের কম ক্যাফিন গ্রহণের পরামর্শ দেন, অ্যামি শাপিরো।
তবে সবার শরীর ক্যাফিন একইভাবে গ্রহণ ও ভাঙতে পারে না। কেউ অল্প ক্যাফিনেই অস্থিরতা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা ঘুমের সমস্যা অনুভব করতে পারেন। আবার কেউ তুলনামূলক বেশি পরিমাণও সহ্য করতে পারেন।
বিশেষ করে বিকেল বা রাতে চা পান করার পর যদি ঘুমে সমস্যা হয়, তাহলে চায়ের সময় এগিয়ে আনা বা ক্যাফিনবিহীন চা বেছে নেওয়া যেতে পারে।
যাদের শরীরে লোহার ঘাটতি আছে, তারা কী করবেন?
চা পান করার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শরীরে লোহা বা আয়রনের শোষণ। বিশেষ করে উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে পাওয়া লোহার শোষণের ওপর চায়ের কিছুটা প্রভাব থাকতে পারে।
অ্যামি শাপিরো বলেন, “চায়ে থাকা ট্যানিন, খাবার থেকে পাওয়া উদ্ভিজ্জ উৎসের লোহার শোষণ কিছুটা কমাতে পারে। যাদের শরীরে লোহার ঘাটতি রয়েছে বা যারা নিরামিষভোজী, তাদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”
তাই খাবারের সঙ্গে চা পান না করে, খাবারের মাঝের সময়ে চা পান করা ভালো হতে পারে। এতে খাবার থেকে পাওয়া লোহার শোষণে চায়ের সম্ভাব্য প্রভাব কমানো সম্ভব।
বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই লোহার ঘাটতি ধরা পড়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী চা পানের সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে।
চা কি তাহলে পানির বিকল্প হতে পারে?
চা শরীরের পানির চাহিদা পূরণে সাহায্য করলেও, একে পুরোপুরি পানির বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
চায়ে যদি অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি উপাদান বা বেশি পরিমাণে দুধ যোগ করা হয়, তাহলে পানীয়টির পুষ্টিগত বৈশিষ্ট্যও বদলে যায়।
অন্যদিকে সাধারণ পানি কোনও অতিরিক্ত চিনি বা ক্যাফিন ছাড়াই শরীরকে তরল সরবরাহ করে।
