২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ২৪১ চা বাগানে চলছে কর্মবিরতি

শ্রমিকদের অভিযোগ, চুক্তির ১৯ মাসেও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করেনি মালিকপক্ষ

বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ২৪১ চা বাগানে চলছে কর্মবিরতি

মজুরি বাড়ানোর দাবিতে সারাদেশের ২৪১টি বাগানের মতো হবিগঞ্জেও চা শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করে।

হবিগঞ্জ ও সিলেট প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 09 Aug 2022, 03:31 PM

Updated : 09 Aug 2022, 06:42 PM

দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করছেন চা শ্রমিকরা।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ডাকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত হবিগঞ্জের ২৪টি, সিলেটের ২৩টি, মৌলভীবাজারের ৯২টি বাগানসহ সারাদেশের ২৪১টি বাগানের শ্রমিকরা এ কর্মসূচি পালন করেছেন।

Image

মজুরি বাড়ানোর দাবিতে সারাদেশের ২৪১টি বাগানের মতো হবিগঞ্জেও চা শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করে।

নেতারা জানান, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে শ্রমিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন এবং বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চা সংসদ নেতাদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

এ সময় শ্রমিকদের মজুরি বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু চুক্তির ১৯ মাস অতিবাহিত হলেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করেনি মালিকপক্ষ। তাই তারা আন্দোলনে নেমেছেন।

তিন দিনের মধ্যে তাদের দাবি না মানা হলে বাগানে অচলাবস্থা সৃষ্টি ও রাস্তায় নামার হুমকি দেন চা শ্রমিক নেতারা।

হবিগঞ্জ

হবিগঞ্জের চান্দপুর বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সাধন সাঁওতাল বলেন, “বাংলাদেশে অনেক চা শ্রমিক রয়েছে। এ দেশের ভোটার হয়েও আমরা অবহেলিত। মৌলিক অধিকারও আমাদের ভাগ্যে জুটে না। এ ছাড়া রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ১২০ টাকা মজুরি পাই। এভাবে আর আমরা চলতে পারছি না। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।”

Image

মজুরি বাড়ানোর দাবিতে সারাদেশের ২৪১টি বাগানের মতো সিলেট ভ্যালিতেও চা শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করে।

বাংলাদেশ চা কন্যা নারী সংগঠনের সভাপতি খায়রুন আক্তার বলেন, “বাংলাদেশে প্রতিটি দ্রব্যের মূল্য হু হু করে বাড়ছে। কিন্তু সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বাগানে কাজ করে ১২০ টাকা মজুরি পাই। অথচ এই টাকা দিয়ে এখন এক লিটার তেলও মিলে না। দুই কেজি সবজি কিনতেই এই টাকা চলে যায়। তাই শ্রমিকদের বাঁচানোর স্বার্থে মজুরি ৩০০ টাকা করতে হবে।”

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) নৃপেন পাল বলেন, “চুক্তির ১৯ মাস অতিবাহিত হলেও শ্রমিকদের বেতন বাড়ায়নি মালিকপক্ষ। এখন বলছে, তারা ১৪ টাকা বেতন বাড়াবেন। তাই, আমরা আজকে এই কর্মসূচি পালন করছি।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করছি। শুক্রবার পর্যন্ত আমাদের এই কর্মসূচি চলবে। এর মধ্যে দাবি মানা না হলে আমরা বাগান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেব। প্রয়োজনে আমরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হব।”

সিলেট

সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সিলেট ভ্যালির ২৩টি চা বাগানে কর্মবিরতি পালন করেন শ্রমিকরা।

এ সময় সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সড়কের লাক্কাতুরা চা বাগানের সামনে মিছিল-সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়।

Image

মজুরি বাড়ানোর দাবিতে সারাদেশের ২৪১টি বাগানের মতো মৌলভীবাজারেও চা শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালা জানান, চা শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নিম্ন মজুরি দিয়ে তাদের সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মজুরি বৃদ্ধির জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানানোর পরও কোনো সাড়া মিলছে না। দিনের পর দিন জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের মূল্য বাড়ছে। এতে পরিবার নিয়ে দৈনিক ১২০ টাকা মজুরি দিয়ে জীবিকা নির্বাহ একেবারেই অসম্ভব।

এ ছাড়া মালনিছড়া, খাদিমনগর, কেওয়াছড়া, দলদলি, জাফলং, লালাখালসহ সিলেটের প্রায় সব চা-বাগান এলাকায় মানববন্ধন হয়েছে।

এসব মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নেন চা শ্রমিক নেতা রাজু গোয়ালা, রতন গোয়ালা, মিন্টু দাস, সবুজ তাঁতী, সুশান্ত চাষা, রঘু মিয়া, মনোরঞ্জন নায়েক, রতিলাল, নিরঞ্জন গোয়ালা, মহরম আলী, নগেন্দ্র গোয়ালা, মৃত্যুঞ্জয়, ঋতেষ নায়েক, দিলীপ নায়েক, খলিল মিয়া।

নেতারা জানান, ১ আগস্ট চা শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যকরী কমিটি ও ভ্যালি কমিটিসমূহের যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা থেকে চা সংসদে স্মারকলিপি প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়।

৩ আগস্ট সেই স্মারকলিপি দেয় চা শ্রমিক ইউনিয়ন। সেখানে সাত দিনের মধ্যে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে ‘গ্রহণযোগ্য সুরাহার’ দাবি জানানো হয়। অন্যথায় আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

এর মধ্যে মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় মঙ্গলবার থেকে আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছেন চা শ্রমিকরা।

মৌলভীবাজার

কর্মসূচির অংশ হিসেবে মৌলভীবাজারের ৯২টি চা বাগানে দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালিত হয়।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দি জানান, একই ধারায় বুধ ও বৃহস্পতিবারও কর্মবিরতি চলবে। তবে কিছু চা বাগান মঙ্গলবার পবিত্র আশুরার বন্ধ থাকায় সে সকল চা বাগানে শুক্রবার পর্যন্ত কর্মসূচি হবে।

Image

মজুরি বাড়ানোর দাবিতে সারাদেশের ২৪১টি বাগানের মতো মৌলভীবাজারেও চা শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা বিজয় হাজরা বলেন, এই তিন দিনের কর্মসূচিতে মালিকপক্ষ আলোচনার সময় না দিলে নতুন করে আরও বড় কর্মসূচি দেওয়া হবে।

চা জনগোষ্ঠী থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি শ্রীমঙ্গল রাজঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চা শ্রমিক নেতা বিজয় বুনার্জী বলেন, চুক্তির মেয়াদ একটা শেষ হয়ে নতুন করে আরেকটি চুক্তির সময় চলে এসেছে। আইন অনুযায়ী চা শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর কথা ১৮ মাস আগেই। কিন্তু মালিকপক্ষের টালবাহানায় এক চুক্তির মেয়াদ অতিক্রম করে এখন পরবর্তী চুক্তির সময় চলে এসেছে।

চা শ্রমিক নেতা পরিমল সিং বারাইক জানান, নির্দিষ্ট সময়ে চুক্তি বাস্তবায়ন হলে দেড় বছর আগেই শ্রমিকদের বেতন বাড়তো। এ অবস্থায় বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে চা শ্রমিকরা কষ্ট করে জীবনযাপন করছেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট ব্রাঞ্চ চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্দ শিবলী জানান, এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে কর্মবিতরতি দিলে উৎপাদনে ঘাটতি হবে। তা ছাড়া শ্রমিকরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।

তিনি আরও জানান, প্রতি চুক্তিতেই শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করা হয়। এবারও করা হবে। কিন্তু চায়ের দাম বাড়েনি দীর্ঘদিন, এটাও বিবেচনার বিষয়।