Published : 25 Jul 2026, 08:55 PM
ঘটনাটা খানিকটা আকস্মিক।
আমরা দেখতে পেলাম শেখ হাসিনার শেষ আমল থেকে যিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন, তিনি ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেছেন। একই সঙ্গে, সংবিধান অনুযায়ী এই পদের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে বিদ্যমান জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
হঠাৎ করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার আগে পুরো বিষয়টি দেখে মনে হচ্ছিল, বর্তমান সংসদে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সংশোধনীগুলো গৃহীত হওয়ার পর বিএনপি নতুন রাষ্ট্রপতির ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করবে। তবে প্রক্রিয়াটি কিছুটা এগিয়ে এসেছে। রাজনৈতিক মহলের ধারণা যে, বিএনপির নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে সাবেক রাষ্ট্রপতির কাছে হয়তো তার পদ থেকে সরে যাওয়া সংক্রান্ত বার্তা দেওয়া হয়েছিল এবং সরকারের ইচ্ছা ব্যক্ত করা হয়েছিল। আর নানা কারণে তাকে পদে রেখে দেওয়াটা রাজনৈতিক দিক থেকেও হয়তো ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়েছিল। সম্ভবত এই প্রেক্ষিতেই তিনি বেশ তড়িঘড়ি করে পদত্যাগ করলেন এবং পরবর্তীতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।
প্রথমত আমি বলতে চাই যে, শেখ হাসিনার সবচেয়ে অনুগত একজন ব্যক্তি হিসেবে তিনি যেভাবে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন তা ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য। অবিশ্বাস্য এই অর্থে যে, আওয়ামী লীগের প্রথম সারির রাজনীতিবদদের সবাইকে বাইরে রেখে এমন একজনকে বেছে নেওয়া হয়েছিল, যা মানুষকে বেশ বিস্মিত করেছিল। বিষয়টি একদিকে যেমন হাসি-তামাশার খোরাক জোগায়, অন্যদিকে তেমনি বিস্ময় ও উদ্বেগেরও সৃষ্টি করেছিল। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই বোঝা গিয়েছিল যে, এসব পদের ক্ষেত্রে সরকারের নির্বাহী প্রধান বা সরকারি দল ১০০ ভাগ আনুগত্য দাবি করে; ৯৯ নম্বর পেলেও সেটাকে যথেষ্ট বিবেচনা করা হয় না। সম্ভবত মো. সাহাবুদ্দিন আনুগত্যের সেই পরীক্ষায় ১০০ তে ১০০ নম্বর পেয়ে পাস করেছিলেন। সে কারণে তিনি ওই পদে আসতে পেরেছিলেন।
আমাদের ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর এটা খুবই প্রত্যাশিত ছিল যে, তিনি একটি নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করবেন।
কিন্তু তিনি পদত্যাগ করেননি। বরঞ্চ একটি জটিল ও কঠিন সময়ে কিছুটা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তিনি দায়িত্ব পালন করে গেছেন। আর তাৎক্ষণিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে আমরাও তার পদত্যাগ দাবি করিনি। এই বিবেচনা থেকেই দাবি করা হয়নি যে, সে সময় একটা সহিংসতার আশঙ্কা ছিল, অভ্যন্তরীণ সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল এবং একটি সাংবিধানিক শূন্যতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। অভ্যুত্থানের পরপরই রাজনৈতিক নৈরাজ্যের সুযোগ নিয়ে অনেকেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে নেমে পড়েছিলেন। সেই জায়গা থেকে আমরা রাষ্ট্রপতির পদে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পরিবর্তন দেখতে চাইনি। তবে তার পক্ষ থেকে নিজের মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পদত্যাগ করার একটা দায়িত্ব ছিল।
পরবর্তীকালে অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা ছাত্ররা যখন তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন ও বিক্ষোভ করল, তখন বিএনপিসহ আমরা অধিকাংশ রাজনৈতিক দল তাতে একমত হইনি। এর কারণ ছিল, তখন দেখা যাচ্ছিল অন্তর্বর্তী সরকার তাদের ক্ষমতা প্রলম্বিত ও দীর্ঘায়িত করতে চায় এবং গোটা নির্বাচনকে অনিশ্চিত সময়ের জন্য ঝুলিয়ে দিতে চায়। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে তাকে কে প্রতিস্থাপন করবেন, সেখানে কে বসবেন—এ নিয়ে বহু ধরনের তৎপরতা চলছিল। এমনকি এটাকে কেন্দ্র করে আরেকটি কথিত দ্বিতীয় বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সমীকরণ তৈরির বহুমাত্রিক তৎপরতাও লক্ষ্য করা গেছে। সম্ভবত সেই আশঙ্কা থেকেই বিএনপি বা অধিকাংশ রাজনৈতিক দল তখন আর রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন দেখতে চায়নি।
পরে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। তিনি এমন এক বিরল সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যিনি পরপর তিনজন সরকার প্রধান বা নির্বাহী প্রধানকে শপথ পড়ালেন—শেখ হাসিনা, মুহাম্মদ ইউনুস এবং বর্তমানে বিএনপির চেয়ারপার্সন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এরপর এখন তিনি বিদায় নিয়েছেন। তবে আমি মনে করি, এই পদের যে একটি নৈতিক জায়গা রয়েছে, তা তিনি বহু আগেই হারিয়েছিলেন। তার কথাবার্তা ও আচরণের মধ্যেও কোনো সঙ্গতি ছিল না। শেখ হাসিনার সময়ে তার যে বক্তব্য ছিল, মুহাম্মদ ইউনূসের সময়ে তা পরিবর্তিত হয়েছে, আর শেষ কয়েকমাসে তিনি তো একেবারে ১৮০ ডিগ্রি উল্টো দিকে যেয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, সংসদে ভাষণ দিয়েছেন।
অবশ্য, সংসদে রাষ্ট্রপতি যে ভাষণ দেন, সেটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হতে হয়। যে ভাষণে সরকারের গুণকীর্তন এবং মন্ত্রণালয়গুলোর ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সারসংক্ষেপ থাকে। রাষ্ট্রপতি মূলত এটি দেখে দেখে পাঠ করেন মাত্র। ফলে তার ওই ভাষণটি আদৌ তার নিজের কি না, সেটি অন্য তর্ক। কিন্তু তারপরও যেহেতু এটি রাষ্ট্রপতির ভাষণ বলেই গৃহীত এবং স্বীকৃত, এটি সংসদের কার্যবিবরণিতে রাষ্ট্রপতির ভাষণ হিসেবেই উল্লেখিত থাকবে।
কিন্তু চাইলে তিনি তখনও পদত্যাগ করতে পারতেন। যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি পদত্যাগ করেছেন এবং এর ফলে বাংলাদেশের জন্য এখন একটি নতুন পর্যায় ও পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ বড় এক অস্বস্তি থেকেও বেরিয়ে এসেছে।
ভবিষ্যতের কথা বলতে গেলে, সংসদের আগামী অধিবেশন পর্যন্ত হয়তো পরবর্তী নির্বাচিত একজন স্থায়ী রাষ্ট্রপতির জন্য আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে। ইতিমধ্যে আমার ধারণা, জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত যে কমিটি গঠিত হয়েছে এবং ‘জুলাই সনদ’-এ যেখানে বিএনপিসহ আমরা অধিকাংশ দল একমত হয়েছি, সে সংক্রান্ত একটি সংবিধান সংশোধন বিল তারা উত্থাপন করবেন। এটি হয়তো সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী আকারে আসবে, যেখানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছুটা বৃদ্ধি বা তাকে ক্ষমতায়ন করার বেশ কিছু প্রস্তাবনা রয়েছে। এসব প্রস্তাবে বিএনপিসহ আমাদের অনেকেরই এক ধরনের সহমত রয়েছে। আমার ধারণা, রাষ্ট্রপতির কাজ এখনকার মতো কেবল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অভ্যর্থনা জানানো, মিলাদ মাহফিল করা এবং প্রধান বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তার আরও কিছু নতুন দায়িত্ব ও কর্তব্যের জায়গা তৈরি হবে।
আমি দেখতে চাইব এমন একজন রাষ্ট্রপতি, যার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন রয়েছে এবং জনগণের সঙ্গে যার একটি ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। যিনি গত কয়েক দশকের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে চিন্তার দিক থেকে ও শারীরিকভাবে ধারণ করবেন এবং দেশের মানুষের সঙ্গে যার একটি আত্মিক ও স্বাভাবিক সম্পর্ক রয়েছে। সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের পরীক্ষায় যিনি উত্তীর্ণ এবং ত্যাগী, সংগ্রামী ও আত্মনিবেদিত মানুষ হিসেবে যার সম্মান ও মর্যাদার জায়গায় বড় কোনো প্রশ্ন নেই—এমন ব্যক্তিকেই সেখানে প্রত্যাশা করি। আমি মনে করি, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এরকম যোগ্য ব্যক্তিবর্গ আছেন এবং সেখান থেকেই নীতিনির্ধারকরা প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা নিয়ে একজনকে নির্বাচিত করবেন।
কোনোভাবেই সামরিক বা বেসামরিক আমলাতন্ত্রের কাউকে আমি এই পদে দেখতে চাইব না। এটি একটি সর্বসাধারণের পদ এবং রাষ্ট্রের অভিভাবকের স্থান। এই পদটির ওপর আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত; পাশাপাশি তাদের অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। আশা করি, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরায় যুক্ত হবে এবং পরবর্তী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে।
ইতোমধ্যে আমি যেমনটি বলেছি, আমি দেখতে চাইব এমন একজন রাষ্ট্রপতি—যার শক্ত মেরুদণ্ড রয়েছে, সততা ও নিষ্ঠা রয়েছে এবং সকল রাজনৈতিক দল ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বিএনপি যদি বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারে, তবে এরকম যোগ্য, দেশপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ব্যক্তিত্বকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আশা করছি সেভাবেই হয়তো কাজ এগোবে। হাতে ৯০ দিন সময় আছে। সেপ্টেম্বরে যে সংসদ অধিবেশন শুরু হবে, আশা করি সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যে ৯০ দিন শেষ হওয়ার আগেই বর্তমান সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা একজন স্থায়ী রাষ্ট্রপতি পেয়ে যাব।
সাইফুল হক সাধারণ সম্পাদক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। ই-মেইল: [email protected]