Published : 25 Jul 2026, 09:03 PM
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সংরক্ষিত বনভূমিতে এক ব্যক্তির গড়ে তোলা বাগানের ছয় শতাধিক মাল্টা ও কমলা গাছ কেটে দিয়েছে বন বিভাগ।
গেল ১৬ জুলাই উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বন বিভাগের যৌথ অভিযানে বাগানটি উচ্ছেদ করা হয়।
উপজেলার আদমপুর বন বিটের কালিঞ্জি বস্তি এলাকায় বনভূমিতে বাগানটিকে গড়ে তুলেছিল বন এলাকার বাসিন্দা মুহিবুল্লাহর পরিবার।
পরিবারটির অভিযোগ, তারা দীর্ঘদিন ধরে বন কর্মকর্তাদের টাকা দিয়ে আসছেন। এবার টাকা দিতে না পারায় ফলবাগান কেটে ফেলা হয়েছে।
এছাড়া বন কর্মকর্তাদের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে লিখিত অভিযোগ করায় তাদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তারা দাবি করেছেন।

তবে বন বিভাগের দাবি, সংরক্ষিত বনভূমিতে বাণিজ্যিক ফলবাগান করার সুযোগ নেই। তাই বনবিভাগের জমি অবৈধ দখলমুক্ত করতেই আইন অনুযায়ী এ অভিযান চালানো হয়েছে।
বিএনপি সরকারের ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি চলার মধ্যে ফলবাগানটি উচ্ছেদের ঘট্নায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার মধ্যে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার তদন্ত করার জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি করে দিয়েছেন।
অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের এ কমিটি এরই মধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, বন বিভাগের কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের বক্তব্য নিয়েছে।
সরেজমিনে কালিঞ্জি বস্তি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ি ঢালে সারি সারি কাটা মাল্টা গাছ-কমলা গাছ পড়ে আছে। গাছে এখনও ফল ঝুলছে।
বন এলাকার বাসিন্দা মুহিবুল্লাহর স্ত্রী আলেকজান বিবি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বাগানটি ঘিরে তারা স্বপ্ন দেখছিলেন। বন বিভাগের লোকজন গাছ কাটার সময় অসহায়ভাবে তাদের দেখতে হয়েছে। তাদের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, বন বিভাগই তার স্বামীকে ‘বন ভিলেজার’ হিসেবে বসবাসের সুযোগ দিয়েছিল। বাড়ির পাশের খালি জায়গায় সাত থেকে আট বছর আগে পাঁচ শতাধিক মাল্টা ও অর্ধশতাধিক কমলার চারা রোপণ করেছিলেন তারা।

পরিবারের সব সঞ্চয় সেখানে বিনিয়োগ করে ছেলে আলিম উল্লাহ বাগান গড়ে তোলেন। এবারই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ফল সংগ্রহের আশা ছিল। সম্প্রতি গাছে ফল আসাও শুরু করে।
এর মধ্যেই যৌথ অভিযানে বাগানটি উচ্ছেদ করা হল।
ক্ষতিগ্রস্ত বন ভিলেজার মুহিবুল্লাহ অভিযোগ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বনের ভেতরে কোনো কাজ করতে গেলেই বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তাকে টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে বাধা কিংবা মামলার মুখে পড়তে হয়। এবার পাঁচ লাখ টাকা চেয়েছিলেন তারা। দিতে না পারায় ফলের বাগান কেটে ফেলা হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, আদমপুর বন বিটের আয়তন ১৩ হাজার ৮০ একর। এখানে একজন বিট কর্মকর্তা, চারজন বনপ্রহরী ও ৮৫ জন বন বাসিন্দা বা বন ভিলেজার রয়েছেন। সময়ের সঙ্গে বন বাসিন্দা পরিবারের সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে দুই শতাধিক পরিবার সেখানে বসবাস করছে। তারা বন পাহারা দেওয়ার পাশাপাশি সীমিত আকারে কৃষিকাজও করেন।
আদমপুর বিট কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মুহিবুল্লাহর ছেলে আলিম উল্লাহ সংরক্ষিত বনের প্রায় পাঁচ একর জমি অবৈধভাবে দখল করে মাল্টা ও কমলার বাগান করেন। পাশাপাশি পাহাড় কেটে সমতল করা, পুকুর খনন এবং টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়।

তার দাবি, চলতি বছরের ২২ এপ্রিল বনপ্রহরীরা অবৈধভাবে মাটি কাটা ও সীমানা বেড়া স্থাপনে বাধা দিলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে বনপ্রহরী শাহীনুর আলম আহত হন। ওই ঘটনায় কমলগঞ্জ থানায় মামলাও করা হয়।
পরে পুরো বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বন বিভাগের উপস্থিতিতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অর্জুন কান্তি বলেন, “যেখানে ফলের বাগান করা হয়েছে সেখানে আগে বন বিভাগের রোপণ করা বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ছিল। ধীরে ধীরে সেসব গাছ কেটে জায়গাটি দখল করা হয়েছে। বন বিভাগের নথি অনুযায়ী মুহিবুল্লাহর বিরুদ্ধে ২০১৮ সালেও বনজ গাছ কাটার অভিযোগে তিনটি মামলা রয়েছে।”
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বন বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে বন বিভাগের সহযোগিতায় সেখানে বসবাস করছেন এবং ছোট পরিসরে কৃষিকাজও করেন। তবে বনের ভেতরে নতুন স্থাপনা বা আবাদ নিয়ে বন বিভাগের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে বিরোধের ঘটনাও ঘটে।
বন বাসিন্দা আনোয়ার মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তাদের নিয়মিত বন পাহারা ও নার্সারিসহ বিভিন্ন কাজে অংশ নিতে হয়। বিনিময়ে তাদের কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না।
তিনি বলেন, বন বাসিন্দারা বসবাস ও সীমিত আকারে চাষাবাদের জন্য জমি পেয়েছেন। তবে নতুন ঘর বা অন্য কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে গেলে বন বিভাগের অনুমতি নিতে হয়। কখনো কখনো এ জন্য কর্মকর্তাদের অনুরোধ করতে হয় এবং কিছু অর্থও দিতে হয় বলে তিনি দাবি করেন।
তবে তার নিজে ফল চাষের জন্য কোনো টাকা দিতে হয়নি, বলেন আনোয়ার মিয়া।

‘বন বিভাগের মৌখিক অনুমিত ছিল’
এদিকে ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, বন বিভাগের মৌখিক অনুমতি নিয়েই তারা কয়েক বছর আগে বাগান শুরু করেছিলেন। এরপর বিভিন্নভাবে বিনিয়োগ সংগ্রহ করে বাগানে লাগান। কিন্তু গাছগুলো যখন ফল দিয়েছি, তখনই বাগানটি উচ্ছেদ করা হয়েছে।
বাগান পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা ওয়াসিম মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এটি তার শ্বশুরের বন বাসিন্দা হিসেবে পাওয়া জমি। তার শ্যালক আলিম উল্লাহ ঢাকায় কাজ করে ও বিভিন্নজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে প্রায় সাত-আট বছর আগে বাগানটি গড়ে তোলেন।
এতে ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
পরিবারের নিজস্ব অর্থের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে এই বিনিয়োগ করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, এবারই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ফল সংগ্রহের আশা ছিল।
ওয়াসিম অভিযোগ করে বলেন, বাগানটি গড়ে তুলতে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময় টাকা দিতে হয়েছে। গত এপ্রিল মাসে বাগানে নেটের বেড়া দিতে গেলে বনপ্রহরীরা বাধা দেন এবং পরে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এরপর তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

ফলচাষি আলিম উল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঋণের টাকায় গড়া বহু বছরের স্বপ্ন মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, শুরু থেকেই বন বিট কর্মকর্তাদের নিয়মিত টাকা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এবার পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে সেই টাকা দিতে না পারায় তাদের পুরো বাগান কেটে ফেলা হয়েছে।
আলিম বলেন, এর আগেও তারা বন কর্মকর্তার বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ নানা দ্প্তরে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
তিনি বলেন, লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরই তাদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আলিম উল্লাহর স্ত্রী সালমা বেগম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এবার ঋণের টাকা শোধ করতে পারবেন, এমনটা আশা করেছিলেন তারা। গাছ কেটে দেওয়ায় এখন ঋণ পরিশোধ নিয়েই অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
অভিযোগ অস্বীকার বন কর্মকর্তাদের
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে বাণিজ্যিক ফলের বাগান গড়ে তোলায় আইন অনুযায়ী উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।
রাজকান্দি রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক প্রিতম বড়ুয়া বলেন, “চাঁদা দাবির অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষা এবং অবৈধ দখলমুক্ত করাই অভিযানের উদ্দেশ্য।
“সম্প্রতি একই এলাকায় একাধিক অবৈধ পানের বরজও উচ্ছেদ করা হয়েছে। মাল্টা বাগান উচ্ছেদও সেই ধারাবাহিক অভিযানের অংশ।”

তিনি বলেন, “বন আইনে সংরক্ষিত বনভূমিতে বাণিজ্যিক ফলের বাগান করার কোনো সুযোগ নেই। আর ফলের গাছ রেখে দিলে জমিটি কার্যত ব্যক্তিগত দখলেই থেকে যেত। তাই বনভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য গাছ অপসারণ ছাড়া বিকল্প ছিল না।”
এতদিন কেন উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়নি, জানতে চাইলে প্রিতম বড়ুয়া বলেন, “আমি এখানে নতুন এসেছি। আসার পর বন বিভাগের জায়গা দখল হয়েছে দেখে অভিযানে নেমেছি।”
ঘটনাস্থল পরিদর্শন তদন্ত কমিটির
ঘটনা তদন্তে গঠিত তিন সদস্যের কমিটির প্রধান সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, বন বিভাগের কর্মকর্তা, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নিয়েছেন।
“প্রয়োজনীয় নথিপত্রও সংগ্রহ করা হয়েছে। সব তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই শেষে বাস্তবতার ভিত্তিতে তদন্ত প্রতিবেদন সরকার ও বিভাগীয় কমিশনারের কাছে জমা দেওয়া হবে।”
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করার কথা জানিয়েছেন সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুর রহমানও।
চাঁদা দাবির অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটি সংরক্ষিত বনভূমি উদ্ধার অভিযানের অংশ। যেখানে ফলের বাগান করা হয়েছে সেখানে আগে বন বিভাগের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ছিল। সেগুলো কেটে জমি দখল করে ফলের বাগান গড়ে তোলা হয়।”
আব্দুর রহমান বলেন, “বন ভিলেজার ব্যবস্থা চালুর সময় পরিবারগুলোকে নিচু জমিতে সীমিত আকারে ধান চাষের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পাহাড় বা টিলায় বাণিজ্যিক ফলের বাগান করার কোনো বিধান বন আইনে নেই। বনের জমি পুনরুদ্ধার করে সেখানে পুনরায় বনায়ন করাই বন বিভাগের নীতি।”
তবে কোনো বন কর্মকর্তা অনিয়মে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে, বলেন তিনি।
তদন্তের সময় উপস্থিত স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকর্মী মো. রুলু বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে ১ হাজার ২০০টি কমলাগাছ কাটার তথ্য প্রচার হলেও সরেজমিনে তদন্ত দলের সঙ্গে গাছ গণনা করে তিনি দেখেছেন, কাটা গাছের সংখ্যা ছয় শতাধিক। এর অধিকাংশই মাল্টা গাছ, কমলা গাছের সংখ্যা তুলনামূলক কম।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কমলগঞ্জের রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের মোট আয়তন ২০ হাজার ২৭০ একর। এর মধ্যে ছয় হাজার একরেরও বেশি বনভূমি বিভিন্নভাবে দখলের শিকার হয়েছে।
এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আদমপুরের ঘটনাটি তিনি শুনেছেন এবং তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রকৃত বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
তিনি বলেন, “বিগত বছরগুলোতে সংরক্ষিত বনের অনেক জমি দখল হয়েছে। বন রক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর এবং যেখানে খালি জমি রয়েছে সেখানে বনায়নের নির্দেশনা রয়েছে।
“তবে যদি কেউ অসাধু উপায়ে বা অর্থের বিনিময়ে বনভূমি দখলের সুযোগ দিয়ে থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
একই সঙ্গে যেসব ব্যক্তি সংরক্ষিত বনভূমি অতিরিক্ত দখল করে আছেন, তাদের স্বেচ্ছায় জমি ছেড়ে দিয়ে বনায়ন কার্যক্রমে সহযোগিতা করার আহ্বানও সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান।