Published : 25 Jul 2026, 06:26 PM
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা দেখে মাঝে মাঝে মনে হয়, এটি কোনো জাতীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি চিরস্থায়ী পরীক্ষাগার। পার্থক্য শুধু একটি। পৃথিবীর অন্য পরীক্ষাগারে বিজ্ঞানীরা ইঁদুর বা খরগোশের ওপর পরীক্ষা চালান। আর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পরীক্ষাগারে পরীক্ষার বিষয়বস্তু হয় কোটি কোটি শিক্ষার্থী। নতুন সরকার আসল, নতুন শিক্ষা উপদেষ্টা এলেন, নতুন বোর্ড এল, নতুন কমিটি বসল। তারপর শুরু হলো পুরোনো সিলেবাসকে বিদায় জানানোর মহোৎসব। যেন দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল পদার্থবিজ্ঞানের বইয়ের প্রচ্ছদ, বাংলা ব্যাকরণের অধ্যায় কিংবা পরীক্ষার নম্বর বণ্টন।
বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের ইতিহাস পড়লে মনে হয়, আমরা আসলে শিক্ষাব্যবস্থা নয়, যেন আইফোন চালাচ্ছি। কয়েকদিন বছর পরপর নতুন আপডেট আসে। ব্যবহারকারীরা চলতিটা আপডেট করতে না করতেই চলে আসে আরেকটি আপডেট। শিক্ষক বুঝে ওঠেন না কী পড়াবেন, অভিভাবক বুঝে ওঠেন না সন্তান কী শিখছে, শিক্ষার্থী বুঝে ওঠার আগেই আবার বলা হয়, ‘আগেরটা ভুলে যাও, এবার নতুন নিয়ম।’
এই দেশে শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে স্থায়ী বিষয়টি সম্ভবত অস্থিরতা। এ যেন সেই পাগলা রাজার কাণ্ড। যে রাজা প্রতিদিন প্রাসাদের রঙ বদলাতেন। একদিন লাল, পরদিন নীল, তার পরদিন সবুজ। একদিন তাকে বলা হলো, ‘মহারাজ, দেয়ালে তো ফাটল ধরেছে।’ রাজা বললেন, ‘সেটা পরে দেখা যাবে। আগে রঙটা বদলাই।’ বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের অনেকটা সেই দশা। আমরা রঙ বদলাতে ব্যস্ত, কিন্তু ভিত্তির ফাটল নিয়ে খুব একটা উদ্বিগ্ন নই।
নতুন করে ঘোষণা এসেছে। ২০২৭ সালে নতুন বই আসবে। চতুর্থ শ্রেণিতে খেলাধুলা ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে আনন্দময় শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা। ২০২৮ সালে আসবে নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম। শুনতে দারুণ লাগে। কাগজে পড়লে মনে হয়, এবার বুঝি শিক্ষা সত্যিই বদলে যাবে। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা একটু নির্মম। আমরা জানি, বাংলাদেশে সবচেয়ে দ্রুত বদলায় শিক্ষাক্রম। সবচেয়ে ধীরে বদলায় শ্রেণিকক্ষ।
নতুন বইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, মিডিয়া লিটারেসি, ক্লাউড কম্পিউটিং থাকবে। শুনে মনে হয়, গ্রামের স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রটি হয়তো আগামী বছর রোবট বানিয়ে ফেলবে।
কিন্তু একটু বাস্তবে আসা যাক।
যে স্কুলে এখনও কম্পিউটার ল্যাব নেই, বিদ্যুৎ নেই, যে স্কুলে বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো আইসিটি ক্লাস বাতিল হয়, যে স্কুলে একটি কম্পিউটারের সামনে দশজন শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে মাউস ধরার পালা কখন আসবে, তার অপেক্ষা করে, সেখানে রোবোটিক্স পড়ানোটা অনেকটা মাছকে গাছে চড়ার কৌশল শেখানোর মতোই উচ্চাভিলাষী শোনায়।
বইয়ে এআই থাকবে, কিন্তু ক্লাসে ওয়াইফাই থাকবে না। বইয়ে ক্লাউড কম্পিউটিং থাকবে, কিন্তু বর্ষায় স্কুলের ছাদ দিয়ে আসল ক্লাউডের পানি পড়বে। বইয়ে সাইবার নিরাপত্তা থাকবে, কিন্তু স্কুলের কম্পিউটারে অ্যান্টিভাইরাসের লাইসেন্স থাকবে না। এটিকে যদি উন্নয়নের নতুন দর্শন বলা হয়, তবে সেটি অনেকটা ছাতা ছাড়া মানুষকে আবহাওয়াবিজ্ঞানের বই উপহার দেওয়ার মতো।
খেলাধুলাকে পাঠ্যক্রমে আনা হয়েছে। এটি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু খেলাধুলা কি বই পড়ে শেখা যায়? বাংলাদেশের বহু বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নেই। বিশজন ছাত্র একসঙ্গে দাঁড়ানোর মতো কোনো খোলা জায়গা নেই। মাঠ নেই, কোচ নেই, সরঞ্জাম নেই। তারপরও বইয়ে লেখা থাকবে, ‘শরীরচর্চা মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।’ শিশুরা মুখস্থ করে পরীক্ষায় লিখবে। নম্বরও পাবে। কিন্তু বলে পা ছোঁয়ানো বা ব্যাট ধরার সুযোগ হয়তো কোনো দিনই পাবে না।
সংস্কৃতির অবস্থাও একই। বইয়ে রবীন্দ্রনাথ থাকবে, নজরুল থাকবে, লালন থাকবে। কিন্তু বিদ্যালয়ে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার বাজেট থাকবে না। সংগীত শিক্ষক থাকবে না। নাটকের মহড়ার জায়গা থাকবে না। যেন সাঁতার শেখানোর জন্য বইয়ে নদীর ছবি ছাপিয়ে দায়িত্ব শেষ।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো কারিগরি শিক্ষা। দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে, দক্ষতা বাড়াতে হবে। হাতে কলমে শিক্ষা দিতে হবে। কিন্তু হাতে কলমে শিক্ষা দিতে হলে আগে হাতে যন্ত্রপাতি দিতে হয়। শুধু কলম দিয়ে কারিগরি শিক্ষা হয় না। একটি স্কুলে যদি কোনো ওয়ার্কশপই না থাকে, সেখানে বইয়ের পাতায় স্ক্রু ড্রাইভারের ছবি দেখে একজন দক্ষ কারিগর তৈরি হবে, এমন বিশ্বাস অলৌকিকতার কাছাকাছি।
বাংলাদেশে একটি অদ্ভুত রোগ আছে। আমরা ভাবি, বইয়ে লিখলেই বাস্তবে হয়ে যাবে। একসময় বইয়ে লেখা ছিল, ‘বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ।’ এখন হয়তো লেখা হবে, ‘বাংলাদেশ এআই নির্ভর অর্থনীতির পথে।’ বাস্তবের সঙ্গে মিল থাক বা না থাক, বাক্যটি পরীক্ষায় কমন আসতে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে ধারাবাহিকতার অভাব। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিক্ষাক্রম তৈরি করে বিশ বা ত্রিশ বছরের পরিকল্পনা মাথায় রেখে। ফিনল্যান্ডে সরকার বদলালেও শিক্ষাক্রম রাতারাতি বদলে যায় না। সিঙ্গাপুরে নতুন মন্ত্রী এসে প্রথম কাজ হিসেবে পুরোনো বই বাতিল করেন না। দক্ষিণ কোরিয়ায় শিক্ষানীতি রাজনৈতিক প্রতিশোধের ক্ষেত্র নয়।
আর বাংলাদেশ? এখানে মনে হয় শিক্ষামন্ত্রীর প্রধান কাজই হলো আগের সরকারের শিক্ষাক্রমে কোথায় কোথায় লাল কালি মারা যায়, সেই তালিকা তৈরি করা। যেন নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে জরুরি কাজ হচ্ছে নতুন বইয়ের গন্ধ ছড়ানো।
এটি শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়। এটি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক ধরনের অবিচার। একজন শিক্ষক একটি পদ্ধতি আয়ত্ত করতে তিন বছর সময় নিলেন। ঠিক তখনই বলা হলো, ‘এবার নতুন পদ্ধতি।’ অভিভাবক সন্তানকে নতুন মূল্যায়ন ব্যবস্থা বুঝতে বুঝতে শুনলেন, সেটিও বাতিল। শিক্ষার্থী বুঝতে পারল না সে আসলে কোন নিয়মে পড়ছে। শিক্ষা যেন ক্রিকেট ম্যাচ নয়, প্রতি ওভারে খেলার নিয়ম বদলে যাচ্ছে।
সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় ইতিহাস। বাংলাদেশে ইতিহাসের বই অনেক সময় ইতিহাসের চেয়ে রাজনীতির আয়না বেশি হয়ে যায়। সরকার বদলায়, ইতিহাসের ভাষাও বদলে যায়। কোনো চরিত্র বড় হয়, কোনো চরিত্র ছোট হয়। কোনো অধ্যায় মোটা হয়, কোনো অধ্যায় পাতলা হয়। অথচ ইতিহাসের কাজ হলো সত্যকে সংরক্ষণ করা, ক্ষমতাকে সন্তুষ্ট করা নয়। শিক্ষার্থীরা কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নয়। তারা ভবিষ্যতের নাগরিক। তাদের এমন ইতিহাস শেখানো উচিত, যা গবেষণার ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, নির্বাচনি ফলাফলের ওপর নয়।
আরেকটি বড় হাস্যকর বাস্তবতা হলো আমাদের মূল্যায়ন ব্যবস্থা। একদিকে বলা হচ্ছে সৃজনশীলতা বাড়াতে হবে। অন্যদিকে কোচিং সেন্টার সম্ভাব্য প্রশ্নের সেট বিক্রি করছে। বলা হচ্ছে বিশ্লেষণের ক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থী মুখস্থ উত্তর উগরে দিয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পাচ্ছে। এই দ্বিচারিতা বন্ধ না হলে নতুন বই পুরোনো পরীক্ষার কাছে আত্মসমর্পণ করবেই।
একটি শিশু যদি জানে, শেষ পর্যন্ত নম্বরই সবকিছু নির্ধারণ করবে, তাহলে সে সৃজনশীল হবে কেন? সে তো নম্বরের শর্টকাটই খুঁজবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা এমন এক জিমের মতো, যেখানে দেয়ালে স্বাস্থ্য সচেতনতার পোস্টার ঝুলছে, কিন্তু ভেতরে সব ব্যায়ামের যন্ত্র ভাঙা!
আসল সংস্কার কোথায় দরকার? শিক্ষকের প্রশিক্ষণে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামোতে। গবেষণায়। প্রযুক্তিতে। শিক্ষাকে রাজনৈতিক পালাবদলের হাত থেকে মুক্ত করার সংস্কৃতিতে। সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষাকে একটি জাতীয় ঐকমত্যের বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আমরা যদি সত্যিই এআই শেখাতে চাই, তাহলে আগে শিক্ষককে এআই জানতে হবে। যদি কারিগরি শিক্ষা চাই, তাহলে ল্যাবরেটরি গড়তে হবে। যদি খেলাধুলা চাই, তাহলে মাঠ ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি সংস্কৃতি চাই, তাহলে বিদ্যালয়ে গান, নাটক, বিতর্ক ও শিল্পচর্চার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ‘গান-বাজনা হারাম’-এই কূপমণ্ডুকতা থেকে সরে আসতে হবে।
শিক্ষাব্যবস্থা কোনো ফ্যাশন শো নয়, যেখানে প্রতি মৌসুমে নতুন ডিজাইন দেখালেই বাহবা পাওয়া যায়। এটি একটি বটগাছের মতো। শিকড় শক্ত না হলে নতুন পাতা লাগিয়ে কোনো লাভ নেই। আজকের শিশুরা পরীক্ষার খাতা নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তাদের নিয়ে প্রতি কয়েক বছর পরপর নীতিগত লুকোচুরি খেলা বন্ধ করতে হবে। কারণ শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে ভুলের মূল্য সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না। দশ বছর পরে বোঝা যায়। তখন একটি পুরো প্রজন্মের ক্ষতি হয়ে যায়।
তাই নতুন বই অবশ্যই আসুক। নতুন চিন্তাও আসুক। কিন্তু নতুনত্বের নেশায় পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। কারণ শিক্ষা সংস্কারের অর্থ প্রতি সরকারের নিজস্ব সিলেবাস চালু করা নয়। শিক্ষা সংস্কারের অর্থ এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সরকার বদলাবে, মন্ত্রী বদলাবেন, উপদেষ্টা বদলাবেন, কিন্তু শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বারবার পরীক্ষাগারের গিনিপিগ হয়ে উঠবে না।
নইলে কয়েক বছর পর আবার নতুন কমিটি বসবে। আবার বলা হবে, আগের শিক্ষাক্রমে সমস্যা ছিল। আবার নতুন বই ছাপা হবে। আবার শিক্ষক প্রশিক্ষণ হবে। আবার বিভ্রান্তি তৈরি হবে। আর আমরা গর্ব করে বলব, ‘বাংলাদেশের শিক্ষা এগিয়ে যাচ্ছে।’ কোথায় এগোচ্ছে, সেটি অবশ্য তখনও একটি সৃজনশীল প্রশ্ন হিসেবেই থেকে যাবে!
চিররঞ্জন সরকার লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: [email protected]