২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম: আত্মপরিচয়ের সংকট ও লিঙ্গভিত্তিক সংঘাত

অনলাইনের ছদ্ম-বাস্তবতা ও চরমপন্থি অ্যালগরিদম আমাদের তরুণ প্রজন্মকে নিজের দেশ, ভাষা এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি বিদ্বেষী করে তুলছে।

ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম: আত্মপরিচয়ের সংকট ও লিঙ্গভিত্তিক সংঘাত

পাশে বসেও যেন যোজন দূরে; অনলাইনের বিষাক্ত অ্যালগরিদম ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের প্রভাবে তরুণদের মাঝে আজ তৈরি হচ্ছে চরম অনাস্থা। প্রতীকী ছবি

ফজিলাতুন নেসা শাপলা ফজিলাতুন নেসা শাপলা

Published : 28 Sep 2026, 02:27 PM

Updated : 28 Sep 2026, 02:27 PM

করোনাকালীন টানা দুই বছর ঘরবন্দি সময়ে আমাদের সন্তানরা বাধ্য হয়ে আন্তর্জালের দুনিয়াকে বেছে নিয়েছিল। সেই অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল মিডিয়ার ব্যবহার এবং সাম্প্রতিক এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) সংস্কৃতি আজ কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মূল্যবোধ ও জীবনবোধের ভয়ঙ্কর রূপান্তর ঘটিয়ে দিয়েছে। স্ক্রিনে আটকে থাকা এই প্রজন্মের মগজে অবচেতনভাবে জায়গা করে নিয়েছে ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম, চরম আত্মবিচ্ছিন্নতা এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশৃঙ্খলা। আজকের গ্লোবালাইজড তরুণদের দিকে তাকালে দুটি মারাত্মক বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট চোখে পড়ে—প্রথমত, নিজের পরিচয়, দেশ ও ভাষা সম্পর্কে তীব্র ঘৃণা ও হীনমন্যতা এবং দ্বিতীয়ত, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আক্রোশ, অনাস্থা ও গভীর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।

অনলাইনের ছদ্ম-বাস্তবতা কিশোরদের আত্মধারণা গঠনে মারাত্মক ক্ষতি করছে। করোনাকালে তারা যেসব ওয়েবসাইট, রেডিট, টিকটক এবং পপ-কালচার কনটেন্ট গিলেছে, তার সিংহভাগই পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক। এর ফলে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক অবাস্তব অহংকার—‘ইলিউশন অব নলেজ’ বা জ্ঞানার্জনের বিভ্রম। গুগল, উইকিপিডিয়া ও রেডিট থেকে নেওয়া কিছু চটকদার তথ্য ও থিওরি মুখস্থ করে তারা নিজেদের চরম জ্ঞানী ভাবছে। তারা কাউকেই আর তাদের সমকক্ষ ভাবতে পারছে না।

কিন্তু এই মেকি অহংকারের নিচেই বাস করছে তাদের গভীর হীনমন্যতা। ওয়েস্টার্ন লাইফস্টাইল ও সোশ্যাল মিডিয়ার নিখুঁত রূপ দেখে তারা নিজেদের বাস্তবতাকে অবমূল্যায়ন করতে শিখছে। নিজের দেশ ও সমাজ একটি ‘ব্যর্থ’, ‘অনগ্রসর’ ও ‘অপ্রতিনিধিত্বশীল’ রাষ্ট্র—এই ধারণা ওদের মনে স্থায়ীভাবে ঠাঁই করে নিয়েছে। প্রবলভাবে জন্ম নিয়েছে ‘গেট-আউট সিন্ড্রোম’—যেকোনো মূল্যে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চরম প্রবণতা।

এই হীনমন্যতার সবচেয়ে করুণ শিকার বাংলা ভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতি। অনলাইনের প্রধান ভাষা ইংরেজি হওয়ায় গ্লোবাল কমিউনিটিতে টিকে থাকতে ইংরেজি শেখার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। এতে সমাজে এক মনস্তাত্ত্বিক শ্রেণি বৈষম্য দেখা দিয়েছে—ইংরেজি বলা মানেই স্মার্টনেস, আর বাংলা চর্চা মানেই অনগ্রসরতা। অল্পবয়সীরা পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে মাতৃভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে না। স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থা তাদের আকাঙ্ক্ষা মেটাতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা নিজের ভাষাকেই উন্নতির পথে বড় বাধা মনে করছে।

বাস্তব জীবনে মেলামেশা ও সুস্থ সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার অভিজ্ঞতা অর্জনের আগেই ডিজিটাল এই প্রজন্ম অনলাইনে বড় হয়ে উঠছে। ফলে প্রত্যাখ্যান, ব্যর্থতা ও সমালোচনা সামলানোর আবেগীয় দৃঢ়তা এদের তৈরি হয়নি। আর এই মানসিক নিঃসঙ্গতার সুযোগ নিয়েই ডার্ক ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাবকালচার ও চরমপন্থি অ্যালগরিদম তাদের গ্রাস করতে শুরু করেছে।

ছেলেরা যখন সুস্থ সম্পর্ক তৈরি করতে ব্যর্থ হয় বা প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হয়, তখন তাদের ক্ষতকে পুঁজি করে ব্যবসা শুরু করে অনলাইন ‘ম্যানোস্ফিয়ার’ (Andrew Tate, Incel forums, Red Pill culture)। এগুলো শেখায়: ‘নারীরা কেবল অর্থ, ক্ষমতা ও সৌন্দর্য দেখে প্রেম করে।’ রিজেকশন সামলাতে না পেরে ইনসেল (Incel - Involuntary Celibate) ফোরামে আশ্রয় নেওয়া কিশোরেরা নিজেদের সামাজিক অন্যায়ের শিকার মনে করে নারীবিদ্বেষী ও আক্রোশপরায়ণ হয়ে উঠছে।

অন্য প্রান্তে মেয়েদের জন্য তৈরি করা হয়েছে সমান্তরাল বিষাক্ত কালচার। ‘ফেমসেল’ (Femcel) প্ল্যাটফর্মে রিজেকশনের শিকার তরুণীরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও পুরুষের প্রতি আক্রোশ উগরে দিচ্ছে। পপ-ফেমিনিজমের নামে ছড়ানো চরমপন্থি বার্তা গিলে ‘সব পুরুষই বিপজ্জনক’ বা ‘All men are trash’ ভেবে মেয়েদের মনে তৈরি হচ্ছে অবিশ্বাসের দেয়াল। ফলে সমাজে আবির্ভূত হয়েছে এক নীরব ‘জেন্ডার ওয়ার’—যেখানে ছেলেরা ভাবছে সব মেয়ে ধোঁকাবাজ, আর মেয়েরা ভাবছে সব ছেলে নিপীড়ক।

আজকের কিশোর-কিশোরীরা মারাত্মক সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় নিমজ্জিত। ভার্চুয়াল জগতে শত শত 'অনলাইন ফ্রেন্ড' থাকলেও বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো প্রকৃত বন্ধু নেই। শর্ট-ফর্ম কনটেন্টের (Reels/TikTok) প্রভাবে মনোযোগের ক্ষমতা কমে জন্ম নিচ্ছে ইমোশনাল বার্নআউট। পরিবার ও সমাজের সঙ্গে এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের কারণে তারা মানসিকভাবে ‘অপাংক্তেয়’ হয়ে এক গভীর শূন্যতাবোধে (Nihilism) ভুগছে।

আর ঠিক এই জায়গাটিতেই সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ছে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক আতঙ্ক—কিশোর গ্যাং।

কিশোর গ্যাং শক্তিশালী হয়ে ওঠার মূল রসদ যোগাচ্ছে অনলাইনের এই হীনমন্যতা, বিচ্ছিন্নতা ও ইমোশনাল ভ্যাকুয়াম। পরিবারে অবহেলিত, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বৈষম্যের শিকার এবং অনলাইনে ‘পাওয়ারলেস’ বোধ করা কিশোরটি যখন ভাবছে, বাস্তবে তার কোনো সামাজিক স্বীকৃতি নেই, তখন সে গ্যাং কালচারের মাঝে নিজের ‘পাওয়ার’ ও ‘আইডেন্টিটি’ খুঁজে নিচ্ছে। অ্যালগরিদমের শেখানো সহিংসতা, ক্ষমতার দাপট এবং ইনসেল/ম্যানোস্ফিয়ার থেকে পাওয়া আক্রোশ তারা বাস্তবে প্রয়োগ করছে কিশোর গ্যাংয়ের হিংস্রতার মাধ্যমে।

ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডে সামাজিক দক্ষতাশূন্য, হতাশ ও নিঃসঙ্গ কিশোরদের গ্যাং লিডাররা খুব সহজেই শিকার বানাচ্ছে। আর গ্যাংয়ের সহিংসতা ও অপরাধের মাধ্যমে তারা এক ধরনের ছদ্ম-বীরত্ব ও দলগত ‘বিলংগিং’ অনুভব করে, যা তাদের সামাজিক হীনমন্যতাকে সাময়িকভাবে ভুলিয়ে রাখছে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অ্যালগরিদমের ছড়ানো এই ভার্চুয়াল হিংস্রতা আজ আমাদের আইনশৃঙ্খলাসহ পুরো সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে এক চরম ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

ডিজিটাল রূপান্তরের আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো তরুণদের বই পড়ার গতিপথ বদলে যাওয়া। ক্লাসিক সাহিত্য, গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস ও দর্শনকে বাদ দিয়ে তাদের পড়ার টেবিল দখল করেছে ‘অ্যাটমিক হ্যাবিটস’, ‘রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড’, ‘দ্য সেভেন হ্যাবিটস অব হাইলি ইফেক্টিভ পিপল’ ও ‘দ্য সাইকোলজি অব মানি’র মতো বই। সাফল্য আর অর্থ উপার্জনের এই ‘প্রেসক্রিপশন’ মার্কা পপ-সাইকোলজি নান্দনিক অভ্যাস ধ্বংস করে তরুণ সমাজকে বানিয়ে তুলেছে চরম যান্ত্রিক, সুযোগসন্ধানী ও আত্মকেন্দ্রিক।

বই পড়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল মনের পরিধি বাড়ানো, সমবেদনা বা ‘এমপ্যাথি’ তৈরি করা এবং কল্পনাশক্তি বাড়ানো। কিন্তু আজকের তরুণদের কাছে বই পড়া কেবল একটি ‘প্রোডাক্টিভিটি টুল’ বা ‘পারফর্মেন্স হ্যাকিং’য়ের উপায়। কীভাবে কম পরিশ্রমে বেশি সম্পদ পাওয়া যায়—এই ব্যবসায়িক সূত্র গিলতে গিয়ে মানবিক সংবেদনশীলতার জায়গা দখল করে নিয়েছে হিসেবি মানসিকতা।

এসব বই অবচেতন মনে ঢোকিয়ে দিচ্ছে যে, লাভ-ক্ষতি হিসাব করাই বুদ্ধিমত্তা; আবেগ প্রকাশ মানেই দুর্বলতা আর অনুভূতির পেছনে সময় দেওয়া মানে অপচয় বা ‘Bad Investment’। তরুণদের কাছে ‘ইমোশনাল ইনভেস্টমেন্ট’ নয়, ‘মানি ইনভেস্টমেন্ট’ অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রতিটি সম্পর্ককে তারা দেখছে একটি লেনদেন বা ‘ট্রানজেকশন’ হিসেবে।

যে তরুণ প্রতিটি সেকেন্ডকে টাকায় রূপান্তরের হিসাব কষে, তার কাছে দেশাত্মবোধ একটি ‘অলাভজনক’ ধারণা। ‘রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড’ বা ‘থিঙ্ক অ্যান্ড গ্রো রিচ’ জাতীয় বই তাদের আত্মকেন্দ্রিক গ্লোবালিজম শেখায়, যেখানে দেশ কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান আর ভাষা যোগাযোগের মাধ্যম। ইতিহাস ও সাহিত্য পাঠের চেয়ে ফিন্যান্সিয়াল মার্কেটে ঢোকা তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সামাজিক দায়বদ্ধতায় আবেগে না জড়িয়ে তারা ভাবে—কীভাবে স্বার্থ গুটিয়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়া যায়।

ভালোবাসার চিরন্তন রূপ—যেখানে ত্যাগ, ধৈর্য ও আস্থা থাকে—তাও আজ সূক্ষ্ম হিসাবের ফাঁদে পড়ে ধসে পড়েছে। ছেলেরা শিখছে, টাকা আর ক্ষমতা না থাকলে প্রেম পাওয়া যায় না; ফলে ভালোবাসা হয়ে উঠেছে স্রেফ ‘সম্পদ প্রদর্শনী’। মেয়েরাও সম্পর্কের মধ্যে আবেগের চেয়ে আর্থিক সুবিধা খুঁজছে।

এর চূড়ান্ত পরিণতি দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ—এরা আবেগ প্রকাশে ভয় পেতে শিখছে, দায়িত্ব নিতে শিখছে না এবং সামান্য জটিলতাতেই যেকোনো সম্পর্ক ভেঙে ফেলছে। অনলাইনে এবং বাস্তবে নিজেদের ভয়ংকর ক্ষতি করে ফেলছে।

যে হৃদয়ে মানবিক আবেগ ও অনুভূতির বিনিয়োগ নেই, সেই হৃদয়ের কাছে দেশ, ভাষা, পারিবারিক বা রোমান্টিক সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই। দিনশেষে সেই হৃদয়গুলো রোবটের মতো ঠাণ্ডা ও নিষ্প্রাণ হতে বাধ্য। এআই ও ডিজিটাল কলোনিয়ালিজমের পথ ধরে আমাদের একটা পুরো প্রজন্ম আজ ঠিক সেই ভয়াবহ, অন্ধকার গন্তব্যের দিকেই হেঁটে চলেছে।

ফজিলাতুন নেসা শাপলা: কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: nessa7421@gmail.com