০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী ছাড়াও ব্যক্তিত্বের রয়েছে আরও দুটি ধরন

নিজেকে কি ‘ইন্ট্রোভার্ট’ বা ‘অন্তর্মুখী’ কোনও দলেই মেলাতে পারেন না? তাহলে আপনি হতে পারেন ‘অ্যাম্বিভার্ট’ বা ‘ওট্রোভার্ট’।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 01 Nov 2026, 01:31 PM

Updated : 01 Nov 2026, 01:31 PM

মনোবিজ্ঞানের কিংবদন্তি সুইজারল্যান্ডের কার্ল ইয়ুং যখন প্রায় এক শতাব্দী আগে মানব চরিত্রের দুটি প্রধান দিক- ‘ইন্ট্রোভার্ট’ বা ‘অন্তর্মুখী’ এবং ‘এক্সট্রোভার্ট’ বা ‘বহির্মুখী’ সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, তখন থেকে মানুষের ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যকে এই দুটি ‘বাক্সে’ বন্দি করে ফেলেছিল।

তবে বাস্তব জীবনে অনেক মানুষই নিজেকে পুরোপুরি একা থাকতে পছন্দ করা বা ‘অন্তর্মুখী’ এবং সারাক্ষণ আড্ডায় মেতে থাকা সামাজিক প্রজাপতি বা ‘বহির্মুখী’ হিসেবে মেলাতে পারেন না।

অনেকেই সামাজিক অনুষ্ঠানে চমৎকারভাবে মিশে যেতে পারেন, আবার পরক্ষণেই নিজের জন্য কিছুটা একান্ত সময় খোঁজেন।

মনস্তত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের চরিত্র কেবল এই দুটি চরম প্রান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মাঝে রয়েছে ব্যক্তিত্বের আরও কয়েকটি আকর্ষণীয় ধূসর এলাকা।

জীবনধারা-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘রিয়েলসিম্পল’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ট্যাটাউনের ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট ডা. মাইকেল আলসি বলেন, মানুষ সবসময় অন্তর্মুখী বা বহির্মুখীর চরম সীমানায় বাস করে না। এর বাইরেও সমাজবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে কিছু নতুন ঘরানার ব্যক্তিত্বের সংযোজন ঘটেছে যা মানুষের সামাজিক আচরণকে আরও নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।”

অ্যাম্বিভার্ট: দুই জগতের চমৎকার ভারসাম্য

‘অ্যাম্বিভার্ট’ হল এমন এক ধরনের ব্যক্তিত্ব যা অন্তর্মুখী ও বহির্মুখীর মিশ্রণ।

ডা. মাইকেল আলসি বলেন, “একজন অ্যাম্বিভার্টের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, তারা খুব সুন্দরভাবে যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে আড্ডা দিতে বা মিশে যেতে পারেন, তবে অন্তর্মুখীদের মতোই তাদের ‘সামাজিক ব্যাটারি’ খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়।”

অর্থাৎ, তাদের যেমন গভীর সামাজিক যোগাযোগের প্রয়োজন হয়, তেমনি মনকে পুনরায় চাঙা করতে একটি নির্দিষ্ট সময় একা কাটানো বা অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনারও প্রয়োজন পড়ে।

তারা পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নিজেদের আচরণ খুব সহজে পরিবর্তন করতে পারেন।

অমনিভার্ট: চরম সীমানার দোলাচল

‘অমনিভার্ট’ এবং ‘অ্যাম্বিভার্ট’ শুনতে কিছুটা একই রকম মনে হলেও, এদের মধ্যে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য রয়েছে।

একজন অ্যাম্বিভার্ট যেখানে সবসময় মেজাজের ভারসাম্য বজায় রেখে মাঝামাঝি অবস্থানে থাকেন, সেখানে একজন অমনিভার্ট পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ব্যক্তিত্বের দুই চরম প্রান্তে দোল খান।

তারা কখনও নিখাদ অন্তর্মুখীর মতো সম্পূর্ণ গুটিয়ে যান, আবার কখনও চরম বহির্মুখীর মতো পুরো অনুষ্ঠানের প্রাণ কেন্দ্র হয়ে ওঠেন।

ওট্রোভার্ট: মানুষের সঙ্গে মিশেও দলের অংশ নন

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দুনিয়ায় একদম নতুন সংযোজন হল ‘ওট্রোভার্ট’।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘আদারনেস ইনস্টিটিউট’-এর প্রতিষ্ঠাতা, মনোবিদ এবং ‘দ্য গিফট অফ নট বিলংগিং’ বইয়ের লেখক ডা. রামি কামিন্সকি এই পরিভাষাটি তৈরি করেছেন।

ওট্রোভার্ট মানে হল, একটি দলের মধ্যে জনপ্রিয় বা স্বাগত হওয়ার পরও, আবেগের দিক থেকে নিজেকে দলের অন্তর্ভুক্ত নন, বলে মনে করেন।

ওট্রোভার্টের লক্ষণ: ডা. কামিন্সকির মতে, ওট্রোভার্টরা মোটেও একাকী বা শান্ত স্বভাবের মানুষ নন; তারা সাধারণত অত্যন্ত মিশুক ও বন্ধুত্বপূর্ণ হন। তবে দলের সবার সঙ্গে চমৎকারভাবে মিশে গেলেও, তারা কখনই সেই দলের মতাদর্শ বা পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে পুরোপুরি বিলীন করে দেন না।

তারা কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য খুব একটা উত্তেজনা প্রকাশ করেন না এবং দলগত আড্ডার চেয়ে নির্দিষ্ট ‘ওয়ান-অন-ওয়ান’ বা দুজন মানুষের গভীর ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বেশি মূল্যায়ন করেন।”

তারা নিজেদের স্বাধীনতাকে, দলের অংশ হওয়ার চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন এবং সামাজিক রীতিনীতি অন্ধভাবে মেনে চলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

নিজের অবস্থান চেনার উপায়

এই বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে নিজের অবস্থান বুঝতে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্মুখিতা-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সুসান কেইনের তৈরি একটি ঘরোয়া মানদণ্ড ব্যবহার করা যেতে পারে।

যদি আপনি কোনও অনুষ্ঠানে যাওয়ার মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যে ঘরে ফিরে আসতে চান, তবে আপনি ‘অন্তর্মুখী’।

যদি আপনি সেখানে ১ থেকে ২ ঘণ্টা চমৎকার সময় কাটানোর পর ক্লান্ত বোধ করেন, তবে আপনি ‘অ্যাম্বিভার্ট’।

আর যদি টানা ৫ ঘণ্টা ধরে সেই অনুষ্ঠানে সমানভাবে আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, তবে আপনি একজন খাঁটি ‘বহির্মুখী’।

ভিন্ন ব্যক্তিত্বের প্রিয়জনদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উপায়

ডা. মাইকেল আলসি মনে করিয়ে দেন যে, “সামাজিক যোগাযোগ কেবল মনস্তাত্ত্বিক নয়, এটি একটি শারীরিক প্রক্রিয়াও বটে। অতিরিক্ত মেলামেশার কারণে স্নায়ুতন্ত্র বা নার্ভাস সিস্টেম ‘ওভার-স্টিমুলেটেড’ বা অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়তে পারে। তাই পরিবারের সদস্য বা জীবনসঙ্গী ভিন্ন ব্যক্তিত্বের হলে নিজের সীমানা স্পষ্ট করা জরুরি।”

সামাজিক অনুষ্ঠানে কোনও ক্লান্তি আসলে উপস্থিত অতিথিদের বা সঙ্গীকে আঘাত না করে কৌশলে কিছুটা বিরতি নেওয়া যেতে পারে।

যেমন, সামান্য হাঁটার বাহানা করা।

ডা. রামি কামিন্সকি স্পষ্ট করে বলেছেন, “গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হল— নিজেকে জোর করে কোনও দলে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করা ঠিক না। এটি কোনও রোগ বা মানসিক সমস্যা নয়। বাম-হাতি মানুষ যেমন ডান-হাতি পৃথিবীতে একটু ব্যতিক্রমী কিন্তু স্বাভাবিক, ওট্রোভার্ট বা অ্যাম্বিভার্ট হওয়াটাও প্রকৃতির এক চমৎকার উপহার।”

পুরনো খবর:

কীভাবে বুঝবেন ভালো আছেন?
অনিশ্চিত সম্পর্কে আছেন কি-না, বুঝবেন যেভাবে
কখন শারীরিক আকর্ষণ গুরুত্বপূর্ণ আর কখন নয়
বয়স বাড়ার সঙ্গে সুখে থাকার গোপন চাবিকাঠি